আমরা কি একটু মিষ্টিমুখও করতে পারব না?

এ দেশে যে কোনো এলাকায় গেলে মিষ্টির দোকান পাওয়া যায়ই। আমাদের দেশে তো অঞ্চলভিত্তিক মিষ্টির ধরনও প্রচলিত আছে। একেক এলাকার একেক মিষ্টি। কেউ সন্তান জিপিএ ফাইভ পেলে মিষ্টি খাওয়ায়, তো কেউ বেতন বাড়লে। আবার অনেকে পছন্দের দল কোনো টুর্নামেন্টে কাপ জিতলেও খাওয়ায়। তো এমন মিষ্টিপ্রিয় দেশের মানুষের এখন মিষ্টি খেতেও নাকি খরচ বাড়বে!

শুধু মিষ্টি নয়। আরও বেশ কিছু পণ্য ও সেবার ওপর করহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, বিমান ভ্রমণ, সিগারেট, এলপিজি, পোশাক, রেস্তোরাঁর খাবার ও হোটেল খরচে বাড়তি টাকা গুণতে হতে পারে ভোক্তাদের। কারণ, এসব পণ্য ও পরিষেবার ওপর কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রেস্তোরাঁয় ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। নন-এসি হোটেলের ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ করে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে। পোশাক খাতে ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড উভয় ধরনের পণ্যের ওপর ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ট্রেডিং কার্যক্রমে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশ করা হতে পারে। এলপিজির ট্রেডিং পর্যায়ে ভ্যাটও ৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে আরও জানা গেছে, মোট ৪৩টি পণ্য ও পরিষেবার ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। মোবাইল টক-টাইমে সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং ওষুধের ওপর ভ্যাট ২.৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এমনকি এ ছাড়া মিষ্টি কিনতে গেলেও খরচ বাড়তে পারে ভোক্তাদের। কারণ, মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কেনার ক্ষেত্রে ভ্যাট হার সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ভিডিও দেখুন:এর অর্থ হচ্ছে, মিষ্টিমুখ করতে বা করাতে গেলেও এখন মানুষের খরচ বাড়বে। ওষুধ কিনতে গেলেও খরচ বাড়বে। এমনকি মোবাইলে কথা বলতে গেলেও বাড়তি খরচ গুণতে হবে। যদি আয় একই থাকে, তবে অবশ্যই প্রচণ্ড হবে ব্যয়ের বোঝা। এখন খরচের লাগাম ধরে রাখতে মানুষকে অবশ্যই ভোগ কমাতে হবে। নইলে যারা হিসাব করে খরচ করেন প্রতি মাসে, তাদের অবশ্যই ব্যয়ের অংক বড় হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমানে যে হারে মূলস্ফীতি জারি রয়েছে, তা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এ দেশের অর্থনীতি যেভাবে চলে, সেই হিসাবে করের বোঝা বেশির ভাগ সময়ই ভোক্তার ওপরই বর্তায় দিনশেষে। অন্তত বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাস তাই বলে। যদিও আমাদের সরকারের বর্তমান অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছেন যে, ভ্যাট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে না। অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, ‘আমাদের মূল্যস্ফীতির মূল ওয়েটের ইন্ডিকেটরগুলো হলো চাল, ডাল এগুলো। আমরা যেসব জিনিসের ওপর কর বাড়াচ্ছি, এগুলো মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে খুবই কম গুরুত্বপূর্ণ।’ অর্থ উপদেষ্টার মতে, ‘চিন্তা-ভাবনা করেই ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে।’ সরকারের এ সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের কষ্ট হবে কি না, এমন প্রশ্নে অর্থ উপদেষ্টার জবাব হলো, ‘মনে হয় না কষ্ট হবে।’

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। ফাইল ছবিঅর্থাৎ, ভ্যাট বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনগণের কষ্টের বিষয়টি নিয়ে ভাবার ক্ষেত্রে সরকারের একটি ‘মনে হয় না’ মনোভাব কাজ করেছে। আমরা বাঙালিরা এই ‘মনে হয় না’ তখনই ব্যবহার করি, যখন আসলে খুব একটা নিশ্চিত বোধ করি না। এর মধ্যে অনুমানের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার একটি ব্যাপার থাকে। উপদেষ্টার কথাতেই পরিষ্কার যে, ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন করের হার বাড়ানোর অভিঘাত কেমন হবে, তা নিয়ে তাঁরা ঠিক নিশ্চিত নন। ‘দেখি না কী হয়’, ‘মনে হয় না’ ধরনের ভাবনা নিয়ে কি এভাবে করের হার বাড়িয়ে দেওয়া খুব একটা যুক্তিযুক্ত?

এই ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর আসলে কী? এ দেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) হচ্ছে কোনো পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে তার উৎপাদন ও বণ্টনের প্রতিটি পর্যায় শেষে সংযোজিত মূল্যের ওপর শতকরা হারের কর। মূসককে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়ে থাকে। এগুলো হলো—স্থূল জাতীয় উৎপাদন ধরন, আয় ধরন এবং ভোগ ধরন। মূসক পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ—দুই ধরনেরই হতে পারে। যেমন ভোগ ধরনের মূসক একটি পরোক্ষ কর, কিন্তু আয় বা উৎপাদন ধরনের মূসককে প্রত্যক্ষ কর মনে করা যেতে পারে।

 

অর্থাৎ, পণ্য বা সেবার উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে মূসক বসে। ভোক্তার ভোগ ঘটে সবার শেষ পর্যায়ে। তো এই যে নানা ধাপে মূসক বসল, ব্যবসায়ীরা কি পণ্য বা সেবার বিনিময় মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেটি মাথায় নেবেন না? ধরুন, আপনি একজন ব্যবসায়ী। আপনি একটি সেবা দিয়ে বা পণ্য উৎপাদন করে বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা করেন। এই সেবা বা পণ্যের বিক্রয়মূল্য আপনি কীভাবে নির্ধারণ করবেন? মোট খরচের ওপর লাভ ধরে তো? অন্তত আমাদের দেশে পণ্য বা সেবার এভাবেই প্রফিট মার্জিন নির্ধারিত হয়। অর্থ উপদেষ্টার কথা মানলে বলতেই হয় যে, প্রচলিত এই প্রক্রিয়াটিকে নিশ্চয়ই নীতিনির্ধারকেরা ধর্তব্যের মধ্যে রাখছেন না। অথবা স্রেফ ভুলে থাকতে চাইছেন!

ভিডিও দেখুন:কিন্তু নিজে চোখ বন্ধ করলেই যে আশপাশের সবাই চোখ বন্ধ করে অন্ধ সাজবে, তা তো নয়। বাংলাদেশে প্রফিট মার্জিন নির্ধারণের বাস্তব চিত্র আসলে কেমন? একটা টাটকা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেওয়া যাক। বাসার টিভির রিমোটটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল হুট করেই। শুক্রবারের দুপুরে এ দেশের আবাসিক এলাকাগুলো একটু নীরবই থাকে, দোকানপাটও বন্ধ থাকে বেশ। তো ওই সময়ে বাসার কাছে একটি দোকানই খোলা পাওয়া গেল। সেখানে গিয়ে ঠিক আগেরবারের মতো একটি রিমোট কন্ট্রোল মিলল। কিন্তু সেটির দাম শুনেই থমকে যেতে হলো। একই কোম্পানির নাম লেখা রিমোট কন্ট্রোল ১/২ মাস আগে কেনা হয়েছিল ১৮০ টাকায়। সেটি দোকানদার চেয়ে বসলেন ৩৭০ টাকা! আশপাশে চেয়ে দেখা গেল, অন্যান্য প্রতিযোগী দোকান তেমন নেই, একটা যা’ও আছে সেটিও বন্ধ। ওই সময়ই কিনতে হলে সেই ৩৭০ টাকাতেই রাজি হতে হবে। শেষে পণ্য কেনার সময়ের সঙ্গে আপোষ করার সিদ্ধান্ত নিতেই হলো। এবং একদিন পর প্রবল খোঁজাখুঁজির পুরস্কার হিসেবে ওই একই রুমোট কন্ট্রোল ২০০ টাকায় হলো পকেটস্থ। ওই দুই দোকানের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ২০০/৩০০ গজ হবে হয়তো।

যে দেশে পণ্য বা সেবার প্রফিট মার্জিন নির্ধারণের পদ্ধতি তৃণমূল পর্যায়ে এমন জবরদস্তি ঘরানার, সে দেশে তাহলে এই ৪৩টি পণ্য বা সেবার ভ্যাটের হার বৃদ্ধির বিষয়টিতে আদতে কার ঘাড়ে কাঁঠাল ভাঙা হবে? আপনার–আমার নয় কি? নাকি মধ্যস্বত্বভোগীরা উবে যাবে ম্যাজিকের মতো? নাকি ব্যবসায়ীদের লাভ করার ইচ্ছায় দেখা দেবে প্রবল ভাটার টান? কই, কিছুদিন আগের চালের বা তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিতে তো এমন চিত্র দেখা যায়নি!

সাধারণ জনগণের কষ্ট ‘মনে হয় হবে না’ ভেবে নেওয়া সিদ্ধান্ত অবশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রায় সময়ই প্রায় সব সরকার বাহাদুরেরাই এভাবেই সিদ্ধান্ত নেন এবং দিনশেষে তা আমজনতার ওপর চাপিয়ে দেন আদতে। বাজার ব্যবস্থার প্রচলিত চিত্রও নীতিনির্ধারকদের মাথায় যেন থাকে না। কারণ সরকারে যেই যান না কেন, যাওয়ার পর তারা সবাই ‘বাহাদুর’ বা ‘মাননীয়’ বা ‘জনাব’ হয়ে উঠতে থাকেন কেবল! সাধারণ মানুষের কষ্ট হওয়ার বিষয়টিতে তাদের যেন আর নিশ্চিত বোধ করার প্রয়োজন হয় না। আর তখনই বয়ান আসে—কষ্ট হবে না, কারণ চাল–ডালে তো আর ভ্যাট বসছে না!

ভিডিও দেখুন:

তা, মানুষ কি শুধু চালে–ডালে মাখিয়েই দিন গুজরান করবে? তার কি কখনোই মিষ্টিমুখ করার বা করানোর ইচ্ছে হবে না? মাসে একদিনের জন্য হলেও এসিওলা রেস্টুরেন্টে পরিবার নিয়ে বসে একটু আনন্দ করার খায়েশ জাগবে না? মোবাইল ফোন দিয়ে আপনজনের সঙ্গে একটু সুখ–দুঃখের আলাপ বেশি সময় ধরে করে মন হালকা করতে চাইবে না? জন্মদিনে ছেলে–মেয়েকে একটা নতুন পোশাক কিনে দিয়ে খানিকটা মানসিক শান্তি পাওয়ার স্বপ্ন দেখবে না? ওষুধ ঠিকঠাক পরিমাণে কিনে খেয়ে দ্রুত সুস্থ হওয়ার আশাও করবে না?

বর্তমানে যে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা সরকার করছে, তাতে ওপরের এই সবই সাধারণ মানুষের কাছে ব্যয়বৃদ্ধির উপকরণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। হয়ে যেতে পারে বিলাসিতা। যদি আশপাশে ছোট আকারের খোঁজখবরও নেওয়া যায়, দেখা যাবে যে, সবার জীবনে নতুন বছর এলেও আয় বৃদ্ধির নতুন খবর সবার আসেনি। ফলে অনেকের আয় আসলে একই, নির্দিষ্ট। তার ওপর আছে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি। এর ওপর যদি ভ্যাট আরও বাড়ে, তাহলে ব্যয় বাড়বেই। এসব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হয় ভোগ কমিয়ে আয়–ব্যয়ে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করবে, নইলে আরও গরিব হতে হবে। হয়তো অনেকের হাতও পাততে হতে পারে। আবার সার্বিকভাবে ভোগের পরিমাণ কমলে ব্যবসায়ীদের ব্যবসাতেও লাল–নীল–হলুদ প্রভৃতি নানা রঙের বাতি জ্বলতে দেখা যেতে পারে। আর সেই আশঙ্কাতেই হয়তো বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, আন্দোলন, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের সুদহার—সব মিলিয়ে এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত তারা। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো আলোচনাও করা হয়নি তাদের সঙ্গে। সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।  

অথচ এভাবে বিভিন্ন পক্ষকে ক্ষুব্ধ করে তোলার পরিবর্তে অন্য পথও হয়তো খোঁজা যেত। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে দেওয়া এ সংক্রান্ত সাক্ষাৎকারে যে প্রসঙ্গটি তুলেছেন অর্থনীতিবিদ আবু ইউসুফ। বিকল্প উপায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, যে ১০ শতাংশ মানুষের কাছে মোট সম্পদের ৮০ শতাংশ রয়েছে, তাদের কাছ থেকে কীভাবে কর বাড়ানো যেতে পারে অর্থাৎ সরাসরি কর আরোপ করা যেতে পারে, সে বিষয়ে ভাবা প্রয়োজন। অর্থাৎ, যার বেশি আয় তার বেশি কর, যার কম আয় তার কম কর। খুবই সহজ ভাবনা। কিন্তু এই সহজ ভাবনাই এ দেশে সহজে হয় না। না রাজনৈতিক সরকারের আমলে হয়, না হয় অরাজনৈতিক সরকারের আমলে। আর হবেই বা কী করে? সবাই যে দিনশেষে ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে আরও গরিব বানানোর মেশিন চালাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন!

চলুন, আমরা তবে সেই মেশিনেই পিষে ছোবড়া হতে আবার নিজেদের সঁপে দিই। মনে হয় আমাদের কষ্ট খুব একটা হবে না, কী বলেন!  

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন      

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]