গণভোটের ৪ প্রশ্নে একটি উত্তর: বিভ্রান্তি নাকি কৌশল?

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ১০:১২ পিএম

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত গণভোট প্রস্তাবে চারটি মৌলিক প্রশ্ন থাকলেও ভোটারকে দেওয়া হচ্ছে একটি মাত্র উত্তর দেওয়ার সুযোগ—‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। আর এই কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক মহল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তাদের প্রশ্ন, ভিন্ন প্রকৃতির চারটি বিষয়ে জনগণ কীভাবে একটি মাত্র উত্তর দিয়ে মতামত জানাবে?

গণভোটের চারটি প্রশ্নই আলাদা। তবে উত্তর হবে একটি—‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। গণভোটের এই চার প্রশ্নের মর্মার্থ হচ্ছে—নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও এর গঠন প্রক্রিয়া, ক্ষমতার ভারসাম্য বা বিকেন্দ্রীকরণ, এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারে জনগণকে দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার। আর এসবই ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্ব ও পরিসরের বিষয়। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত প্রস্তাবে চারটি প্রশ্নের জন্য রাখা হয়েছে একটি মাত্র উত্তর: ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। আর এখানেই শুরু হয়েছে সমালোচনা। ভিন্ন প্রকৃতির চার প্রশ্নে একটি উত্তর দেওয়ায় ভোটদাতার প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হবে না; বরং ফলাফল হয়ে দাঁড়াবে অস্পষ্ট, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য।

প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাম্প্রতিক সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সুস্পষ্ট মতানৈক্য সামনে এসেছে, গণভোটকে তা আড়াল করার একটি কৌশল হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে না তো? সংলাপে দলগুলো যেসব বিষয়ে একমত হতে পারেনি, সেই জটিল পার্থক্যগুলোকে পাশ কাটিয়ে চারটি ভিন্ন প্রসঙ্গকে একত্রে নিয়ে একটি ‘হ্যাঁ-না’ ধরনের সীমিত বিকল্পের গণভোট জনগণের সামনে হাজির করা মূলত একটি কৃত্রিম ঐক্যমতের ছবি তুলে ধরারই প্রচেষ্টা।

সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি—এই চারটি ইস্যুর চরিত্র আলাদা, গুরুত্ব আলাদা এবং রাজনৈতিক অবস্থানও ভিন্ন। অথচ একটি ভোটে এর ওপর সিদ্ধান্ত নিতে বলা হলে বাস্তবে কোন প্রশ্নে জনসমর্থন পাওয়া গেল আর কোনটিতে পাওয়া গেল না, সে পার্থক্য স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ থাকে না। এই পদ্ধতি রাজনৈতিক অমিলকে সমাধান করে না; বরং তা আড়াল করে ‘ঐকমত্য’ আছে এমন একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।

যে ৩০টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে তার সবগুলোতেই সাধারণের মতও অভিন্ন। তবে যেগুলোতে মতভেদ আছে, তার অধিকাংশ বিষয়েই সাধারণের সমর্থন আছে। বিভিন্ন ফোরাম বা সাধারণের সঙ্গে কথা বলে এই ধারণা স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই জাতীয় সনদে সন্নিবেশিত বিষয়গুলোর সারাংশ করে যে চারটি প্রশ্নের অবতারণা, তার বেশিরভাগেই জনগণের ‘হ্যাঁ’ সূচক সমর্থন আছে। কিন্তু কিছু বিষয়ে অসম্মতি থাকলেও অধিকাংশ বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ থাকায় অপেক্ষাকৃত কম বিষয়ে ‘না’–কে উপেক্ষা করতে হবে। অনেকটাই সিক্সটি–ফাইভ, থার্টি–ফাইভ কাপড়ের মতো—৬৫ ভাগ সুতি কাপড় পড়ার জন্য ৩৫ ভাগ সিনথেটিক মেনে নিতে হয়।

চার প্রশ্নে এক উত্তর: ভোটারের অবস্থান কোথায়?

অধ্যাপক ইউনূস তাঁর ঘোষণায় যে চারটি প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন তা হলো:

১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন লাগবে।

৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তায়ন করা হবে।

এগুলো প্রত্যেকটিই নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তবে চরিত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু গণভোটে ভোটারকে বলা হচ্ছে, এই চারটি প্রশ্নের মোট প্যাকেজ নিয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলুন। এতে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—চারটি আলাদা বিষয়ে জনগণের চার রকম অবস্থান থাকার কথা। কিন্তু তারা পাবে একটি মাত্র বাক্সে ছাপ রাখার সুযোগ।

অতএব, চার প্রশ্নে এক উত্তর গণভোটের মান ও উদ্দেশ্যকে দুর্বল করবে। জনগণের মতামত স্পষ্টভাবে জানা যাবে না। ফলাফল হয়ে উঠবে অস্পষ্ট এবং ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও সৃষ্টি হবে।

ভোটারের বাস্তব সংকট

ধরা যাক, একজন ভোটার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিপক্ষে, ক্ষমতার ভারসাম্য বা বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে, কিন্তু জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়নের প্রস্তাবনার ভাষাকে অপর্যাপ্ত মনে করেন।

এখন তিনি কোন উত্তর দেবেন?

‘হ্যাঁ’ দিলে তাঁর মতের অর্ধেকের সঙ্গে আপস করতে হবে; আর ‘না’ দিলে নিজের পছন্দের বিষয়গুলোও অস্বীকার করতে হবে।

এভাবে একটি উত্তর চারটি প্রশ্নকে এক প্যাকেজে বেঁধে ফেলায় ভোটারের মতামত হয়ে যাচ্ছে অপরিবর্তনীয় ও একরৈখিক—যা গণভোটের প্রচলিত নীতির পরিপন্থী। গণভোটে সাধারণত এক প্রশ্ন, এক সিদ্ধান্ত প্রথা চালু। চার প্রশ্নে এক সিদ্ধান্তকে অনেকেই বলছেন ম্যান্ডেট মিক্সিং।

প্রশ্নের ধরনেই সমস্যা

সাধারণত গণভোটে এক প্রশ্ন–এক উত্তর নীতি অনুসৃত হয়। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট গণভোট কিংবা স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রশ্নেও একটি প্রশ্ন নিয়ে ভোট নেওয়া হয়েছে। কারণ গণভোটের উদ্দেশ্যই জনগণের মতামতকে যতটা সম্ভব স্পষ্টভাবে বের করে আনা।

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত কাঠামোতে তা হচ্ছে না। বরং চার প্রশ্নকে একত্রে জুড়ে দেওয়ায় এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের নীতিগত বাধ্যবাধকতার প্যাকেজ, যেখানে ভোটার বাধ্য হচ্ছেন সমর্থন বা বিরোধিতায় সার্বিক সিদ্ধান্ত দিতে।

রাজনৈতিক তীব্র প্রতিক্রিয়া

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি সচেতনভাবে ‘ম্যান্ডেট ক্লাবিং’? অর্থাৎ নানা বিষয়ের সমর্থন বা বিরোধিতাকে একই বন্ধনীতে ফেলে এমন একটি জনমত তৈরি করা, যা পরে রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে?

কয়েকটি দল মন্তব্য করেছে, “ভোটার যদি ‘হ্যাঁ’ বলে দেয়, সরকার বলবে জনগণ চারটি বিষয়ে একযোগে সম্মতি দিয়েছে—যা বাস্তবে সত্য নয়। আর ‘না’ বললে বলা হবে, জনগণ সংস্কারের বিপক্ষে।” ফলে ফলাফল যেদিকেই ঝুঁকুক, তা রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করবে।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

গণভোট স্বচ্ছ হলে জনমত পরিষ্কার হয়; অস্পষ্ট হলে বিভাজন তৈরি হয়। বর্তমান কাঠামোতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি সত্যিকার অর্থে জনমত যাচাই, নাকি একটি প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতা, যা পরে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করা হবে?

“একে কি জনমত জরিপ বলা যায়, নাকি এটি একটি সম্মিলিত চুক্তি স্বাক্ষরের মতো?”

অধ্যাপক ইউনূসের প্রস্তাব গণতন্ত্র নিয়ে জাতীয় আলোচনার শুরু হলেও ভোট কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন আরও বড় হয়েছে। জনগণ আলাদা আলাদা বিষয়ের ওপর স্পষ্ট মত দেওয়ার সুযোগ না পেলে গণভোটের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। প্রস্তাবের রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও এর কারিগরি কাঠামো গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে এখনো অসম্পূর্ণ।

অতএব, চার প্রশ্নে এক উত্তর—এটি কোনো গণভোট নয়; বরং একটি সম্মিলিত রাজনৈতিক ঘোষণা, যা প্রচলিত না হলেও রাজনীতিতে অস্বাভাবিকও নয়।

লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রায় দুই বছর ভারতে অবস্থানের পর দেশে ফিরে তাঁর আত্মসমর্পণের...
চীনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ–সম্পৃক্ততা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সীমা ছাড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল...
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে এবার আপনিও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন—এটি মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত এবং পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। জীবনের...
প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকল্পনা নেই— বাস্তবায়ন তো দূরের কথা! জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান,...
মশার উপদ্রব, অবৈধ স্থাপনা ও জলাবদ্ধতাসহ ১০টি বিষয়ে অভিযোগ জানাতে ও নাগরিক সুবিধা দিতে চালু হয়েছে আমাদের চট্টগ্রাম নামের অ্যাপস। শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আনুষ্ঠানিকভাবে...
মৌলভীবাজারে ৯৯৬ কোটি টাকার মনু নদী সংরক্ষণ প্রকল্প চললেও রাজনগরে অব্যাহত নদীভাঙন। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত ২০ গ্রাম, দুর্ভোগে ৫০ হাজার মানুষ।
মানুষের প্রত্যাশা পুরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। শনিবার বিকেলে সরকারের পাঁচ মাস পূর্তি...
রাজধানীতে অতিরিক্ত হর্ন নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চালু হবে নতুন ট্রাফিক লাইট ও দূষণবিরোধী ব্যবস্থা।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর