দ্রব্যমূল্যের বোঝার ওপর ভ্যাটের আঁটি, মানুষ যাবে কই?

ইশ্বরী পাটনী বর চেয়েছিলেন–আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। আর আমাদের বন্ধু এবং নিখোঁজ কবি অভিজিৎ দাশ লিখেছিলেন–তুমি খাবে দুধভাত/ আর আমরা কেবলই পাথর চিবোতে বাধ্য। বলা যেতেই পারে যে, মাঝে তো শত শত বছর চলে গেছে, এটুকু তো হতেই পারে। এও তো বদলই। তা ঠিক। তবে কোন দিকে?

খেয়াল করলে দেখা যাবে, সেই মঙ্গলকাব্য যুগের ইশ্বরী পাটনীর চাওয়া বর বলে দেয়, সে সময়ের সন্তানেরাও ঠিক দুধেভাতে ছিল না। ফলে এই দুধেভাতে থাকার আকাঙ্ক্ষাটা মওকা পেয়ে দেবীর সামনে তিনি তুলে ধরেছিলেন, যাতে নিজের জীবন যেমন গেছে, গেছে; সন্তানেরা যেন ভালো থাকে। সেই সময় থেকে এই সময়ে বদল শুধু এটুকুই যে, অভিজিৎকে আশা ছেড়ে দিয়ে দারুণ ক্ষোভে বলতে হচ্ছে–দুধভাত তোমার জন্যই, আমরা কেবল পাথর চিবোতে বাধ্য।

অর্থাৎ, এই গোটা সময়ে বদল শুধু–আশার মরণ। এই নৈরাশ্যের কারণ অবশ্য বহু আগেই ওল্ড মাস্টার সত্যজিৎ রায় তাঁর হীরক রাজার দেশে সিনেমায় দেখিয়ে গেছেন। নৈরাশ্যের পেছনে যে সমাজের ওপরতলার, বলা ভালো শাসকগোষ্ঠী ও তাদের ঘনিষ্ঠ এলিটবর্গের মনোভঙ্গিটিই দায়ী, তা শুধু হীরক রাজার এক শ্লোকেই পরিষ্কার হয়–ভরপেট নাও খাই/ রাজকর দেওয়া চাই।

আমাদেরও হয়েছে সেই দশাই। এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের বোঝা কাঁধে নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে মানুষ। তার ওপর আবার চাপানো হয়েছে ভ্যাটের আঁটি। এই আঁটি আবার কমসম নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ‑তিনগুণ। সাথে অবশ্য রেওয়াজ মেনে সরবরাহ করা হয়েছে ঐতিহাসিক ব্যাথানিবারণী শাসকবর্গীয় মলম–‘কিচ্ছুটি হবে না বাছা। ভ্যাট বাড়লেও তোমরা কোনো চাপে পড়বে না।’ কী চমৎকার অভয়বাণী! নয়া অর্থনীতি আরকি।

রাজধানীর ফলের একটি দোকান। ছবি: সংগৃহীতভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) নিয়ে গেল কয়েক দিন ধরেই বেশ আলোচনা চলছে। একদিকে ভোক্তা পর্যায় থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। সাথে সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। কিন্তু সরকার অনড়। তাদের এক ভাষ্য–কিচ্ছুটি হবে না।

আসলেই কি কিছু হবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে একটু ভ্যাট বৃদ্ধির হারটি দেখে আসা যাক। সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শতাধিক পণ্য ও সেবায় মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার রাতে এ‑সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।

কী কী আছে এ তালিকায়? মোবাইল ফোন সেবা, যা কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারে খরচ বাড়বে। রয়েছে পোশাক, রেস্তোরাঁ, মিষ্টি, ওষুধ, এলপি গ্যাস, টিস্যু, সিগারেট, বাদাম, আম, কমলালেবু, আঙুর, আপেল ও নাশপাতি, ফলের রস, যেকোনো ধরনের তাজা ফল, রং, ডিটারজেন্ট, রং, মদের বিল, পটেটো ফ্ল্যাকস, চশমার প্লাস্টিক ও মেটাল ফ্রেম, রিডিং গ্লাস, সানগ্লাস, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও তাতে ব্যবহৃত তেল, বিদ্যুতের খুঁটি, সিআর কয়েল, জিআই তার, ফলের রস, কোমল পানীয়, বিস্কুটসহ নানা পণ্য।

কেন বাড়ানো হলো? বাজেট ঘাটতি মেটাতে। মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ঋণের শর্ত পূরণ করতেই অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে এ উদ্যোগ। কিন্তু এটি গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। এক, ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে সত্যিই কি বিপুল বাজেট ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে? এতে কি ইতোমধ্যে উঁচুতে বসে থাকা মূল্যস্ফীতি আরও উঁচুতে উঠবে?

ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার‑এর অনলাইন সংস্করণে বলা হয়েছে, মুল্যস্ফীতির কারণে এমনিতেই মানুষের মধ্যে ক্রয়প্রবণতা কমে গেছে। আয় না বাড়লেও ক্রমাগত দাম বাড়তে থাকলে মানুষের আর উপায় কী। ফলে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, ভ্যাট বৃদ্ধির আছর যেহেতু খুচরা পর্যায়ে পণ্যের ওপর শেষতক পড়বে, সেহেতু মানুষের ক্রয়প্রবণতা আরও কমবে। তাদের বিক্রি যাবে কমে। আর বিক্রি নেই তো ভ্যাটও নেই। এতে আখেরে লোকসান হবে সরকারেরই। অর্থাৎ, ভ্যাট থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থের জোগান হবে না।

ভিডিও দেখুন:অর্থনীতিবিদেরাও বলছেন, এরই মধ্যে সাধারণ মানুষ দুই বছর ধরে ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির ধক সামলাতে ব্যস্ত। এর সঙ্গে এই বাড়তি মূসক তাকে ভয়াবহ এক পরিস্থিতিতে নিয়ে ফেলবে। রক্ষণ কৌশল হিসেবে সীমিত আয়ের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ব্যয় সংকোচন নীতি নেবে। অর্থাৎ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে আসবে।

তাহলে বাজেট ঘাটতি মেটানোর উপায় কী? অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, আইএমএফ কর রেয়াতের পরিসর ছোট করতে বলেছে। শর্ত হিসেবে তারা করনীতিতে বদল আনার কথাও বলেছে। কিন্তু সরকার সহজ পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। করের আওতা ও আদায় বৃদ্ধির বদলে বিদ্যমান করহার বৃদ্ধির পথে হাঁটছে তারা। তাও পরোক্ষ করহার, যা ব্যবহারিকভাবে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপে।

তাহলে অর্থ উপদেষ্টা কী বলছেন? তাঁর মতো প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ কী করে বলছেন যে, সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব পড়বে না, যখন ভ্যাট বৃদ্ধির তালিকায় এমনকি ওষুধও আছে। আছে তাজা ফল থেকে শুরু করে বহু কিছু। নাকি বর্ধিত ভ্যাট পরিশোধ করে উচ্চ মূল্যে তাজা ফল কেনার সামর্থ্য যাদের নেই, তাদের তিনি সাধারণ মানুষই মনে করছেন না। যে কারণে, উচ্চবর্গের অনাদায়ী কর আদায়ে, প্রত্যক্ষ করের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু না করে, পরোক্ষ করে পর্যুদস্ত মানুষকেই তাঁর মনে ধরেছে।

এখন মিষ্টি খেতেও খরচ বাড়বে। ফাইল ছবিনাকি বিষয়টি নিয়ে অহেতুক হইচই হচ্ছে? বোঝার ভুলও তো হতে পারে, নাকি? দেখাই যাক। বিশ্বব্যাংক বলছে, ভ্যাট বৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর কেমন হবে, তা অনুমান করাটা একটু জটিল। কারণ পুরো বিষয়টাই নির্ভর করে বর্ধিত ভ্যাটের আওতায় থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী করে, তার ওপর। তবে, মোটাদাগে ভ্যাট বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব খুচরা পর্যায়ে পড়ে। ডেনমার্কের উদাহরণ দিয়ে এ সম্পর্কিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ভ্যাট বৃদ্ধির প্রাথমিক প্রভাব হিসেবে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে গেছে। ডেনমার্ক সেক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি কাজ করেছে–এক, মজুরি বৃদ্ধি এবং দুই, করকাঠামোর তলার দিকে থাকা নিম্নবিত্তের করযোগ্য আয়ের সীমা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং উচ্চবিত্তের ওপর করহার বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলে উঠতে পেরেছে সমাজের তলার দিকে থাকা মানুষ।

এখানে মনে রাখা দরকার যে, ডেনমার্ক বিশ্বের সেই সব দেশের একটি, যাদের সামাজিক নিরাপত্তাজাল ও তার কর্মপদ্ধতি বিশেষভাবে প্রশংসিত। আর বাংলাদেশে? সে আর কহতব্য নয়।

ভিডিও দেখুন:এবার তাকানো যাক উদাহরণের দিকে। না, না নিজেদের নয়। নিজেদের উদাহরণ আবার আমরা নিতে চাই না। তাই, বরং দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণের দিকে তাকানো যাক। দেশটিতে ২০১৮ সালে ভ্যাট বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তাও ১শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি করে তারা। আমাদের মতো দ্বিগুণ বা তিনগুণ নয়। সেই প্রেক্ষাপটে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা জেনি রসো মার্কিন অনলাইন পত্রিকা দ্য কনভারসেশনে একটি কলাম লেখেন। সেখানে তাঁর মূল উৎকণ্ঠা ছিল–সাধারণ মানুষ।

ইউনিভার্সিটি অব দ্য উইটওয়াটরস্র্যান্ডের ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস সায়েন্সেসের প্রধান জেনি রসোর মতে বর্ধিত ভ্যাটের ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো তিনটি কাজ করতে পারে–এই বর্ধিত ভ্যাটের পুরোটাই ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারে, কিছু অংশ চাপিয়ে দিতে পারে, অথবা এই ভ্যাটের অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত আইএমএফের কার্যালয়। ছবি: রয়টার্সজেনির মতে, ভ্যাট ১ শতাংশ বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি এমনকি ৫ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়। আর এই মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে হাঁটতে হয় সুদহার বৃদ্ধির পথে।

বাংলাদেশে এই যে উদ্যোগ নেওয়া হলো, তার সাথে কী ধরনের নীতি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে? প্রশ্নটি জরুরি এবং এর উত্তর তারচেয়ে বেশি জরুরি। মুশকিল হচ্ছে সাধারণ মানুষের তরফ থেকে ছোড়া এমন প্রশ্নের উত্তর সাধারণত মেলে না। তার হাঁড়ি, তার উদর ও অসুখ, সবকিছু থেকেই নিংড়ে রাষ্ট্র তার সঞ্জিবনী সুধা (পড়ুন ভ্যাট‑ট্যাক্স) আহরণ করবে ঠিকই, তবে তার প্রশ্নের উত্তর–নৈব নৈব চ। ফলে ঈশ্বরী পাটনীর আশা অভিজিৎ দাশে এসে পাথর চিবোনো দাঁতের নিচেই পিষে মরে। রাজকর ও চাবুক উচ্চবর্গের ওপর নয়, তলানিতে থাকা মানুষের ওপরই চাপে। উচ্চবর্গ? সে তো জন্মেছে হীরার খনির হীরা বুঝে নিতে উপঢৌকন হিসেবে। বাকি অগণিত হতভাগারা কই যাবে, সে প্রশ্ন আর কে করে?

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]