মানুষটির জীবন-ভ্রমণ শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি। আজ ১৫ জানুয়ারি তাঁর চিরসমাপন হলো। আটাত্তর বছরের এই দীর্ঘ জীবনে তিনি আলো ছড়িয়ে নিজেকে উজ্জ্বল নক্ষত্রের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। মানুষটির নাম শুভাগত চৌধুরী। সবাই তাঁকে জানেন ডা. শুভাগত চৌধুরী নামে। তিনি সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস মানে ডাক্তারি পাশ করেন ১৯৬৯ সালে। সেই থেকেই তিনি ডা. শুভাগত নামে পরিচিতি পান।
সিলেটের বিশ্বনাথে ডা. শুভাগত চৌধুরীর পৈত্রিক নিবাস। বাবার নাম শৈলেন্দ্র কুমার চৌধুরী। তিনি বিশ্বনাথের আকিলপুরে এক সময়ের জমিদার ছিলেন। মা শিক্ষাবিদ ও লেখক ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী। ভাইবোন তিনজন। শুভাগত বড়, এরপর রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ও দন্তচিকিৎসক অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী এবং ছোটবোন অধ্যাপক ড. মধুশ্রী ভদ্র।
শৈশবে শুভাগত চৌধুরীর পড়াশোনা শুরু হয় সিলেটে, তারপর কিছুদিনের জন্য রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন, আবার চলে আসেন সিলেটে। শিক্ষাজীবনে তিনি এমবিবিএস পাশ করার পর এমফিল এবং এফসিপিএস সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যান। মেডিকেল কলেজে বায়োকেমিস্ট্রির শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে তিনি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক সার্ভিসের উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। এরপর বারডেম জেনারেল হাসপাতালের হেড অব ল্যাবরেটরি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত সফল ছিলেন ডা. শুভাগত চৌধুরী। তাঁর ক্লাসে শিক্ষার্থীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকর্ষিত হতেন। পরিশীলিত বাচনভঙ্গি, শুদ্ধ উচ্চারণ, শব্দচয়ন ও শব্দ প্রক্ষেপণের দক্ষতা, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা ইত্যাদি মিলে একটি চমৎকার পরিবেশ তৈরি করতেন। তিনি ভালো আবৃত্তি করতেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন আর নাটকে অভিনয় করতেন। এই সব গুণাবলীর মিশ্রণে শ্রেণিকক্ষে তাঁর ক্লাস হতো অতুলনীয়। তিনি যেসব মেডিকেল কলেজে কর্মরত ছিলেন, সেখানে নাটক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মূল অনুঘটক হিসেবে তিনি কাজ করতেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলনের একটি নবজোয়ার তৈরি হয়। তখন বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে পরিভাষা তৈরির গভীর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। তার মধ্যে অন্যতম একটি ক্ষেত্র হলো চিকিৎসাবিজ্ঞান। শুরুর সময় থেকেই এ দেশে চিকিৎসাবিজ্ঞান ইংরেজিতে পঠিত হতো। সমস্ত বইপত্র ইংরেজিতে লেখা। কোনো বিষয় বাংলায় বোঝাতে গেলে পরিভাষার অভাবে তা সম্ভব হতো না। এই সমস্যা দূর করতে বাংলা একাডেমি উদ্যোগী হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা তৈরিতে ডা. আহমদ রফিক, ডা. সাঈদ হায়দার প্রমুখ অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এদের সঙ্গে আর যাঁরা ছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন ডা. শুভাগত চৌধুরী।
ডা. আহমদ রফিক ও ডা. শুভাগত চৌধুরী মিলে রচনা করেন চিকিৎসাবিজ্ঞান পরিভাষা (২য় খণ্ড)। এ ছাড়া তিনি দৈনিক পত্রিকায় সাধারণ মানুষের বোঝার মতো করে সহজ ভাষায় স্বাস্থ্য বিষয়ে লেখেন। তিনি দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতায় শিশুকিশোরদের উপযোগী করে স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন। এই প্রসঙ্গে বলা যায় ড. আব্দুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দীন যেমন বিজ্ঞানবিষয়ক লেখাকে দুর্বোধ্যতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য এবং আকর্ষণীয় করে তুলেছেন, তেমনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একই কাজ করছেন ডা.শুভাগত চৌধুরী। এ জন্যই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ডা. চৌধুরীর নাম চিরদিন লেখা থাকবে।
ভিডিও দেখুন:ডা. শুভাগত চৌধুরী অনেক বই লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬৪টি। উল্লেখযোগ্য বই হলো—ভালোবাসার ধন, স্বাস্থ্যকথা, শিশুর জগৎ, আপনার কুশল, বিচিত্র স্বাস্থ্য প্রসঙ্গ, কুশল সমগ্র, সুস্থ থাকুন, ডাক্তারি আলাপ, বয়স্কদের স্বাস্থ্য, নারীর স্বাস্থ্য, সুখে অসুখে, শিশু যেভাবে বেড়ে ওঠে, সুস্থ হার্টের জন্য, শরীর নামের কারখানা, টিন এজ মন শরীর ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি। লেখালেখির জন্য ২০২১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ২০০৯ সালে শেরেবাংলা জাতীয় পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পান। দেশে বিদেশে তাঁর অর্ধশতাধিক চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
ডা. শুভাগত শিক্ষকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি মানব হিতকর বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রায় ৮ বছর যাবৎ ‘মাল্টিপল মায়োলোমা’ নামক ক্যানসারে ভুগছিলেন। আজ ১৫ জানুয়ারি সকাল ৭ টা ২০ মিনিটে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন সৃজনশীল মানবিক এই মানুষটি। তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, অফুরান ভালোবাসা।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক