প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয় নারীর অর্জন, সংগ্রাম ও সমঅধিকারের কথা স্মরণ করে। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই নারীরা এখনও তাদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। আমাদের দেশে নারীদের আর্থসামাজিক অবস্থান, মর্যাদা ও অধিকারের চিত্র দিন দিন যেন খারাপ হচ্ছে।
পৃথিবীর দিকে তাকালে আমরা দেখি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির হাত ধরে বেশির ভাগ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আজ বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সাধারণ মুদ্রার বদলে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রার ব্যবহার বাড়ছে। মানুষ তার স্বাধীনতার সীমাকে প্রতিনিয়ত প্রসারিত করছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, অনেকেই বিয়ে, সন্তান বা পরিবারকে ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী মনে করে সেগুলো ত্যাগ করছেন। কিন্তু আমরা? আমরা এখনও আটকে আছি মধ্যযুগের অন্ধকারে। নারী আন্দোলনের ঢেউ, সভ্যতার বিকাশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি–কিছুই আমাদের সমাজকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমরা এখনও ‘বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজছি’, নারীকে কীভাবে দাসী বানিয়ে রাখা যায়, সেই চিন্তা ছড়িয়ে দিচ্ছি।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উন্নয়ন-অগ্রগতি, স্বাধীনতা, অধিকার মানবিক মর্যাদা আমাদের দেশে ক্রমেই গৌণ হয়ে উঠছে। আমাদের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠছে ধর্ম। ধর্মের কল্যাণ ও মানবতার অংশগুলো বাদ দিয়ে আমরা কেবল আচার পালনকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আর শিখেছি ধর্মের নামে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছে নারী। তারা খেলতে পারবে না, ইচ্ছেমতো পোশাক পরতে পারবে না, বাইরে যেতে পারবে না, সংস্কৃতি চর্চা করতে পারবে না, রাজনীতি করতে পারবে না, একা চলতে ফিরতে পারবে না। নারী কেবল ঘরের কাজ করবে, পুরুষের কথায় উঠবে-বসবে, পর্দা করবে। নারীর ভূমিকাকে এভাবে বৃত্তবন্দী করে ফেলা হচ্ছে। এই কি আমাদের এগিয়ে চলা?
নারীরা সারা দেশে নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। যারা নারীদের ওপর হামলা করে, তাদের আসলে নারীদের স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেখতে ভালো লাগে না। নারীরা যদি স্বাধীনভাবে হাঁটে, দৌড়ায়, লেখাপড়া করে, পেশা গ্রহণ করে, প্রাণখোলা হাসি হাসে, গল্প করে, গান গায়, নাচে, খেলে বা অভিনয় করে–তাতেই এই গোষ্ঠীর রাগ জমে যায়। তাদের মগজ গালিতে ভরে যায়, মারার পথ খুঁজতে হাত নিশপিশ করে। আসলে নারীর কাছে নানাভাবে পরাজিত হওয়ার ক্ষোভ এদের মধ্যে জমে থাকে।
এসব নিয়ে কথা বলার মতো মানুষও দিন দিন কমে যাচ্ছে। নারীর অধিকার নিয়ে কথা বললেই তেড়েফুড়ে আসছে একদল হিংস্র লোক, যারা নারীর অধিকারকে পদদলিত করতে বদ্ধপরিকর। তাদের যুক্তি–ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য। কিন্তু এই ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কি নারীর অধিকার হরণের নামে পুরুষতন্ত্রের আধিপত্য কায়েমের হাতিয়ার নয়? বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, নারী-পুরুষের ভূমিকা দুই চাকার সাইকেলের মতো। একটি চাকা বাদ দিলে সাইকেল চলে না। নারীকে বাদ দিয়ে সমাজের প্রগতি অসম্ভব। কিন্তু আজ সেই যুক্তিও অচল হতে বসেছে।
নারীর এই অগ্রযাত্রাকে ঠেকানোর জন্য বের করা হয়েছে এক লাগসই হাতিয়ার, যার নাম সহিংসতা ও যৌন হয়রানি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তবে এমন বিশাল এক রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বরং খুন-ধর্ষণ-অপহরণ-অ্যাসিড নিক্ষেপ, পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানির পাশাপাশি মব-ভায়েলেন্স বেড়েছে। ধর্মীয় উগ্রপন্থী কিছু গোষ্ঠী মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা দিচ্ছে এবং নারী সেলিব্রেটিদের টার্গেট করছে। এ পরিস্থিতিতে স্কুটি চালানো বা চাকরি করার মতো সাধারণ বিষয়েও নারীদের নিরাপত্তাহীনতা উদ্বেগজনক।
এ ছাড়া একটি গোষ্ঠী মব সৃষ্টি করে মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকার এসব ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও কার্যত কিছুই করছে না। ফলে সম্প্রতি রাজধানীর লালমাটিয়ায় দুজন তরুণী প্রকাশ্যে ধুমপান করার অভিযোগে মব-ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছেন। সরকার এই দুই নারীর নিরাপত্তা হরণকারীদের প্রেপ্তার না করে উল্টো তাদেরই দোষারোপ করছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস, নারী দিবস–এসব বড় বেশি অবান্তর মনে হয়। নারীর অধিকারের কথা বলতে গেলেই একদল মানুষ বাধা হয়ে দাঁড়ান। নারীর শিক্ষা, নারীর কর্মক্ষেত্র, নারীর স্বাধীনতা–সবই আজ প্রশ্নের মুখে। নারীকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে রাখার অপচেষ্টা বর্তমানে নতুনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
আমাদের সংবিধান ও আইনে জাতি‑ধর্ম, নারী‑পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সমানাধিকারের কথা বলা হলেও শুধু নারী‑পুরুষের মধ্যেই নয়, নারীতে‑নারীতেও অধিকারগত পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বনির্ভরতা ও সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে। শিক্ষিত, সচ্ছল ও ছোট পরিবারের একমাত্র মেয়ের এগিয়ে চলার পথে বাধা এলেও তা কাটিয়ে ওঠার মতো। দুই ভাইবোনের ক্ষেত্রেও খুব বড় সমস্যা হয় না। এই সমস্ত পরিবারে মেয়ের বিয়ের চিন্তা থাকলেও বাবা‑মা মেয়েকেও স্বনির্ভর করার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারে সব ব্যাপারেই মেয়ের সুযোগ ছেলের পরে। মেয়েরা সংসারের দায়। দরিদ্র বাবা‑মা এই দায় থেকে যেকোনো উপায়ে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। এই সব পরিবারের মেয়েরা অনেক সময় বিয়ের নামে ভিনদেশে পাচার হয়ে যায়। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী পুরুষের একাধিক বিয়ের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোতে নারী‑পুরুষের অধিকারগত বৈষম্য আজও বিদ্যমান। বাবার অবর্তমানেও একজন মা সন্তানের অভিভাবকত্ব পান না। এ দায়িত্ব পালনের যোগ্য শুধু পুরুষ।
মনে রাখা দরকার যে, নারীর মুক্তি ছাড়া সমাজের মুক্তি অসম্ভব। নারীকে পিছিয়ে রেখে, বন্দী করে রেখে আমরা কখনও এগিয়ে যেতে পারব না। বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়তে হলে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই শুধু নারীর নয়, এই লড়াই নারী-পুরুষ উভয়ের। এই লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। নারী মুক্তি মানেই সমাজের মুক্তি, দেশের মুক্তি, মানবতার মুক্তি।
লেখক: লেখক ও গবেষক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]