আন্তর্জাতিক নারী দিবস

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও সমসাময়িক ভাবনা

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৫, ০৯:৩১ এএম

যেকোনো বিবেচনায় নারী দিবস অন্য দিবস থেকে আলাদা এবং বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিশ্বব্যাপী নারী দিবস সৃষ্টির পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী নারীর অধিকারহীনতা, বৈষম্য-বঞ্চনা, মুনাফাসর্বস্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শ্রম শোষণের করুণ ইতিহাস। পৃথিবীর দেশে দেশে ভোটের অধিকার থেকে শুরু করে সম্পত্তির অধিকার, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার অধিকার, সমান কাজের জন্য মজুরির অধিকার থেকে নাগরিক অধিকারের জন্যও নারীকে লড়াই করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। পরিবার-রাষ্ট্র-সমাজে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকা পুঁজিতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে সহযাত্রী পুরুষকে সাথে নিয়ে এসব লড়াই নারীকে করতে হয়।

দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মবলিদানের মধ্যদিয়ে নারী অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতি বছর জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের জন্য একটি নতুন প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। এ বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘For All Women and Girls: Rights. Equlity. Empowerment’। আমাদের দেশে সরকারিভাবে যার বাংলা করা হয়েছে ‘অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন, নারী ও কন্যার উন্নয়ন।’ ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্লোগান ছিল ‘নারীর সমঅধিকার, সমসুযোগ এগিয়ে নিতে হোক বিনিয়োগ’ ২০২৩ সালের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, জেন্ডার বৈষম্য করবে নিরসন।’ বছর বছর এসব প্রতিপাদ্য শুনতে যতই মধুর ও মানবিক হোক না কেন এর বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ খুব কমই চোখে পড়ে। এসব প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে বাজেটে কিছু বরাদ্দ প্রয়োজন হয়। সরকারকে কখনো কখনো পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। সে ঝুঁকি অন্তত আমাদের মত বহুত্ববাদী দেশের ক্ষমতাসীনেরা নিতে চান না। ফলে যুগের পর যুগ বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য কেবল একদিনের আলোচনা, গালভরা বুলি আর কাগজ‑কলমেই বন্দী হয়ে আছে।

এ কথা ঠিক, আগের তুলনায় আজকের নারীরা চাইলে অনেক অধিকার ভোগ করতে পারছে এবং রাষ্ট্রসমূহ নারীর কিছু কিছু অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ও সমমর্যাদার প্রশ্নটির এখনো মীমাংসা হয়নি। তথ্য-প্রযুক্তি-জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের দুনিয়ায় এখনো কীভাবে এবং কেমন করে রাষ্ট্র ও সমাজে নারী-পুরুষ বৈষম্য অনায়াসে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্নহীনভাবে স্বচ্ছন্দে টিকে আছে, বিষয়ের গভীরে গিয়ে তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

আধিপত্যবাদী মানসিকতা ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুরুষতন্ত্র নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য জিইয়ে রাখতে সবসময়ই তৎপর থাকে। অন্যদিকে পুঁজিতন্ত্র নারীকে অধিক খাটুনি ও কম মজুরির চক্রে আটকে ফেলে। গৃহস্থালির সমস্ত দায়িত্বকে বিনা পারিশ্রমিকের কাতারে ফেলে নারীকে চার দেয়ালে আটকে রাখার প্রথা টিকিয়ে রাখে পুরুষতন্ত্র। পুঁজিতন্ত্র চটকদারী বিজ্ঞাপনের ফাঁদে নারীকে পণ্য ক্রয়ের বড় গ্রাহক করে ব্যবসায়ী মুনাফা লুটতে ব্যস্ত থাকে। পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিতন্ত্র মিলেমিশে সমাজে এমন এসেন্স ছড়িয়ে রাখে, যাতে নারী বিশ্বাস করে নিজেকে সাজিয়ে রাখা, পুরুষের মনোরঞ্জন করা আর সন্তান প্রতিপালনের মধ্যেই নারী জীবনের সার্থকতা। এটা এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে নারী নিজেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ ভাবতে পর্যন্ত ভুলে যায়। স্বামী-সন্তান-সংসারের ঘানি টানতেই নিজেকে উৎসর্গ করে। মানুষ হিসেবে তার যে আলাদা সত্তা আছে, সেটা বোঝার ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে নারী।

এ দেশের অগ্রবর্তী নারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হোক। সরকার যদি তা করে, তাহলে এই দিবসটি যেমন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তেমনি সমাজের সর্বস্তরে সমতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। যে বার্তা সবচেয়ে পশ্চাৎপদ বিপদগ্রস্ত ক্ষমতাহীন নারীটিকেও সাহসী হয়ে উঠতে প্রেরণা জোগাবে। নারী খুঁজে পাবে মুক্তির দিশা।

এসব বিষয় নিয়ে তখনই ভাবনার প্রয়োজন হয়, যখন অমানবিক পুরুষতান্ত্রিক এই ব্যবস্থা নারীর জীবনে নিয়ে এসেছে চরম নির্যাতন-বঞ্চনা-হতাশা-অধিকারহীনতা-পরিচয়হীনতা এবং সর্বোপরি নিরাপত্তহীনতা। পুরুষতন্ত্র তার প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে সমঅধিকারে বিশ্বাসী মানবিক মানুষদের। যে সকল মানুষেরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমঅধিকারের দাবি তোলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করে পুরুষতন্ত্র। আর পুঁজিতন্ত্র ব্যবসায়ী মুনাফার হিসাব কষে পুরুষতন্ত্রের সাথে হাত মেলায়।

অনেকেই পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্র শব্দ দুটিকে এক অর্থে ব্যবহার করে বাস্তব পরিস্থিতি গুলিয়ে ফেলেন এবং অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা সামনে এনে নারী দিবসকেই প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দেন। যেমন তাঁরা প্রশ্ন তোলেন নারী দিবস হলে পুরুষ দিবস নয় কেন? ইত্যাদি। পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্র শব্দ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করে। পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা কাঠামোর সমস্ত কিছুই নির্মিত ও পরিচালিত হয় পুরুষকে কেন্দ্র করে, পুরুষের জন্য এবং পুরুষের স্বার্থ রক্ষায়। এই ব্যবস্থা কিছু বিশ্বাস, কিছু দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নারী-পুরুষ উভয়ের মনোজগতকে এমনভাবে প্রভাবিত করে, যার ফলে পরিবার-রাষ্ট্র-সমাজে নারী-পুরুষ বৈষম্য দিনের পর দিন সদম্ভে টিকে থাকে। পুরুষতন্ত্র এমন এক অন্ধবিশ্বাসী মন গঠন করে, যেখানে নারীর অবস্থান পুরুষের নিচে প্রমাণ করার জন্য নানা উদাহরণ সামনে আনা হয়। এ সকল বিষয় নিয়ে এমনভাবে প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানো হয়, যেন নারীরাও পুরুষের স্বার্থেই নিজেকে নিবেদন করে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো মানুষ পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারক-বাহক হতে পারে। 

বহু আগে থেকেই স্বল্প পরিসরে হলেও কিছু কিছু প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নারী শাখার আয়োজনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন হয়ে আসছে। এর সাথে বেশ কিছু বছর যাবৎ যুক্ত হয়েছে সরকারি-বেসরকারি আয়োজনে দিবস পালন। যা নারীর সমঅধিকারের প্রশ্নটি পরিণতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য খুবই ইতিবাচক। তা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো এখানো পর্যন্ত শহরের গুটিকয় সুবিধাভোগী নারীদের নিয়ে র‌্যালি-সম্বর্ধনা-আলোচনার মধ্যে নারী দিবস পালনের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রয়েছে। আয়োজকদের নারী দিবসের পোশাকের রং, শোভাযাত্রার বর্ণাঢ্যতা তুলে ধরতে যতটা আগ্রহ দেখা যায়, সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষাণ, মজুর, শ্রমজীবী নারীর বাস্তব জীবনের রং পাল্টাতে ততটা উৎসাহী বা সোচ্চার হতে দেখা যায় না। হয়তো সে কারণেই এখনো এ দেশে নারী দিবস প্রান্তিক শ্রমজীবী নারীদের যাপিত জীবনে বিশেষ কোনো বার্তা বহন করে না।

এ দেশের অগ্রবর্তী নারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হোক। সরকার যদি তা করে, তাহলে এই দিবসটি যেমন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তেমনি সমাজের সর্বস্তরে সমতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। যে বার্তা সবচেয়ে পশ্চাৎপদ বিপদগ্রস্ত ক্ষমতাহীন নারীটিকেও সাহসী হয়ে উঠতে প্রেরণা জোগাবে। নারী খুঁজে পাবে মুক্তির দিশা।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন সামাজিক বন্দোবস্তের আওয়াজ উঠেছে। সেই বন্দোবস্তে নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদার প্রশ্নটি বিশেষ গুরত্বের সাথে অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। যদি তা করা হয়, তাহলেই কেবল নারী-পুরুষের সমঅধিকারের অমীমাংসিত প্রশ্নের সমাধান করা সম্ভব হবে।

লেখক: নারী অধিকার কর্মী ও লেখক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

বাঙালি নারীর অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শ আর বিপ্লবের কথা যখন লেখা হয় সবার আগে আসে প্রীতিলতার নাম। শিল্পী, শিক্ষিকা, দার্শনিক, এবং নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক প্রীতিলকার জীবন গল্প আমাদের শেখায়,...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
যে কমিশনের উদ্দেশ্যই ছিল ‘সমাজের সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা’, সেখানে শুরু থেকেই নারীর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে কেবল উপেক্ষা নয়, বরং কাঠামোগত অবহেলার স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। প্রস্তাবটি...
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনায় পুরুষ ও নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট পোশাক পরার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এই নির্দেশনায় নারীদের জন্য শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ওড়না এবং অন্যান্য...
প্রায় আট বছর পর ভারতীয় সিনেমায় ফিরছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। আর সেই প্রত্যাবর্তন হচ্ছে এস এস রাজামৌলির বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘বারাণসী’ দিয়ে। নায়িকার জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে...
ইউএনডিপি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ই-পার্লামেন্ট, সংসদীয় ফেলোশিপ, স্থায়ী কমিটি শক্তিশালীকরণ...
আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক গেলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের আইনি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গতকাল শনিবার নিউইয়র্ক...
জামালপুরের মেলান্দহে সিএনজি অটোরিকশা ও ভটভটির মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই নারী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও তিনজন। রোববার দুপুর ৩টায় উপজেলার চরবানী পাকুরিয়া ইউনিয়নের বেতমারী এলাকায়...
লোডিং...

এলাকার খবর