বিরল খনিজ সম্পর্কিত বহুবিচিত্র তথ্য গেল চার পর্বে তুলে ধরা হয়েছে। একটা বেশ ‘চমৎকার’ বিন্যাস আমাদের চোখের সামনে হাজির। একদিকে মুদ্রা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবোত্তর যুগের হাতছানি, নিজ নিজ আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও সভ্যতার একরোখা বয়ানকে সামনে এনে একটা নয়া সংঘাতের ছক, অন্যদিকে আছে সম্পদের বিলিবণ্টন সম্পর্কিত জটিল এক অংক, যার সাথে আবার জড়িয়ে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর বিচিত্র সব সমীকরণ। এই সমীকরণে আবার এশিয়ার দেশগুলো রয়েছে এক বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থায়। এই সুবিধা তাকে অন্যদের আগ্রহের কেন্দ্র এবং কিছুটা গাত্রদাহের কারণও করে তুলেছে। ফলে এশিয়ার সম্ভাবনা এর ভবিষ্যৎ অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতায় অনূদিত হওয়ার জোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রথম পর্বেই এ সম্পর্কিত বিস্তৃত হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। আরেকবার চোখ বোলানো যেতে পারে সেখানে। এশিয়ার তিন দেশ চীন, ভারত ও ভিয়েতনামে যথাক্রমে বিরল খনিজের মজুত আছে ৪ কোটি ৪০ লাখ, ৬৯ লাখ ও ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, এই তিন দেশের সম্মিলিত মজুতের পরিমাণ ৫ কোটি ৪৪ লাখ মেট্রিক টন। আফ্রিকার দুই দেশ তানজানিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় মজুত আছে যথাক্রমে ৮ লাখ ৯০ হাজার ও ৭ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টনের। দুই দেশের সম্মিলিত মজুতের পরিমাণ ১৬ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। রাশিয়াকে যুক্ত করে ইউরোপে প্রমাণিত মজুতের পরিমাণ ৫৩ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে রাশিয়াতেই ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। এর সাথে সুইডেনের মজুত নিশ্চিত হলে তা দাঁড়াবে ৬৩ লাখ মেট্রিক টন। উত্তর আমেরিকার কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে মজুতের পরিমাণ যথাক্রমে ৮ লাখ ৩০ হাজার ও ১৯ লাখ মেট্রিক টন। অঞ্চলটিতে সম্মিলিত মজুত রয়েছে ২৭ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলে রয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। আর অস্ট্রেলিয়াতে রয়েছে ৫৭ লাখ মেট্রিক টন।
এবার এর সাথে ভূরাজনৈতিক নানা হিসাবকে আমলে নিলে হিসাবটা আরও জটিল হয়ে উঠবে। প্রথমেই দুই জোটের তৎপরতাকে আমলে নেওয়া যাক। লেখকের ‘নয়া বিশ্ব’ শীর্ষক ধারাবাহিকে বিস্তারিত এ নিয়ে আলোচনা আছে। এই দুই জোট হলো–পঞ্চশক্তির ব্রিকস এবং শক্তি চতুষ্টয়ের কোয়াড। ব্রিকসে আছে–ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। আর শক্তি চতুষ্টয়ে আছে–যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান।
ব্রিকসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই জোটের আওতাধীন অঞ্চলে রয়েছে মোট ৯ কোটি ১৮ লাখ মেট্রিক টনের মজুতের ৮৪ শতাংশ। আর কোয়াডের অধীনে আছে মোট মজুতের ১৬ শতাংশ। মনে রাখা দরকার যে, উভয় জোটেই ভারত আছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে থাকা দেশগুলোর মজুতের হিসাব নিলে তা মোট মজুতের মাত্র ১৫ শতাংশ হয়। বিপরীতে চীন একাই মোট মজুতের অর্ধেকের বেশি মালিকানা নিয়ে বসে আছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান ভয়েসেসে গত বছরের অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, চীন বিশ্বের মোট বিরল খনিজ উৎপাদনের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রক্রিয়াকরণ ধাপের ৮৫ শতাংশ এবং চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনের ৯০ শতাংশই চীনের দখলে। যুক্তরাষ্ট্র বিরল খনিজ সম্পর্কিত পণ্যের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ চীনের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের ক্ষেত্রে এই নির্ভরশীলতা শতভাগ।
এই নির্ভরশীলতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিরাপত্তা থেকে বাণিজ্য–প্রতি ক্ষেত্রেই ভয়াবহ শঙ্কার কারণ। তাই তারা এটি কাটিয়ে উঠতে জেরবার হয়ে গেছে। সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল গেছে। আলোচনা চাউর হয়েছে যে, ট্রাম্প হয়তো সত্যি সত্যিই গ্রিনল্যান্ড কিনে নেবেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ চীনের বলয় থেকে কোনোভাবেই এই ইস্যুতে বের হতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে এশিয়ায় তাদের আঞ্চলিক মিত্র দেশ–জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া তেমন সহায়তা করতে পারছে না।
যদিও আরেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র–অর্ধপরিবাহী (সেমিকন্ডাক্টর) প্রশ্নে এই দেশগুলোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহায়ক। কিন্তু বিরল খনিজের মজুত, প্রক্রিয়াকরণ ও এ সম্পর্কিত প্রযুক্তি প্রশ্নে তারা চীন থেকে যোজন যোজন দূরে।
আগেই বলা হয়েছে বিরল খনিজের উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে পরিবেশগত বহু বিষয় যুক্ত। এ কারণে এমনকি চীন নিজ দেশের বেশ কিছু খনি থেকে খনিজ উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রেখেছে। এই ঘাটতি পোষাতে তাদের পাঁচটি কোম্পানি মিয়ানমারে বিপুল উৎপাদনে সম্পৃক্ত হয়েছে। মিয়ানমার ২০২৪ সালে ৫০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি বিরল খনিজ চীনে রপ্তানি করেছে। এটা বৈধ পথের হিসাব, যা চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়। চীনের ইউনান ও মিয়ানমারের কাচিন করিডোরের সঙ্গে থাকা সড়ক পথ এতটাই সরব যে, এই পথে বিপুল পরিমাণ অবৈধ রপ্তানি হয়, যার পুরো নিয়ন্ত্রণ মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো করে।
মিয়ানমারের উৎপাদনের দিকে তাকালে এবং এ সম্পর্কিত আগের পর্বের আলোচনাকে আমলে নিলে দেশটিতে বিরল খনিজের মজুত যে ভালো পরিমাণেই আছে, তাতে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। আর এই মজুত এখন পর্যন্ত চীনের নিয়ন্ত্রণে। চীনের এই একচেটিয়া অবস্থান ভারতকে ভীত করছে। যুক্তরাষ্ট্রকে তো বটেই। এ কারণেই ভারত ব্রিকসের বাইরে কোয়াডেও যুক্ত হয়েছে।
ফলে মোটাদাগে সেই পুরোনো হিসাবই সামনে আসছে–চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। হ্যাঁ, এই চার দেশই মিয়ানমারে খেলতে নেমেছে।
তাকানো যেতে পারে মহাশূন্যেও। কী, একটু অবাক লাগছে? নড়েচড়ে বসুন। ধাতব খনিজে কৌশলগত বিনিয়োগ সম্পর্কিত ওয়েবসাইট স্ট্র্যাটেজিকমেটালইনভেস্ট ডটকমে ২০২২ সালের ৯ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, ১৯৭০ সাল থেকেই মহাশূন্যে খনিজ খোঁজার প্রকল্প চালুর ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সে সময় এ সম্পর্কিত প্রযুক্তি ছিল না। এখন আছে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা অ্যাস্টেরয়েডস বা গ্রহাণুকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি। এসব গ্রাহণুতে বিরল খনিজের পাশাপাশি নিকেল, কপার ও সোনারও দেখা মিলবে বলে ধারণা ছিল বিজ্ঞানীদের। এই ধারণা থেকেই এসব গ্রহাণু পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু কী পাওয়া গেল?
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা বলছে, বৃহস্পতি ও মঙ্গল গ্রহের কাছাকাছি থাকা ‘সাইকি‑১৬’ নামের এক গ্রহাণুতে যে পরিমাণ খনিজ আছে, তার মূল্যমান ৭০০ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) মার্কিন ডলার। একই বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির গবেষকেরা জানাচ্ছেন, ১৯৮৬‑ডিএ নামের আরেকটি গ্রহাণুতে এ ধরনের খনিজ আছে ১১ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার মূল্যমানের।
ফলে মহাকাশ গবেষণায় বড় শক্তিগুলো যে একের পর এক বিনিয়োগ করে যাচ্ছে, তা শুধু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বা বিকল্প যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার কৌশল নয়। কিংবা ইলন মাস্কের স্পেস এক্স প্রজেক্ট শুধু ‘দেখব এবার জগৎটাকে’ মর্মে নিছক জ্ঞানপিপাসা থেকে নয়। এর আর্থিক মূল্যও বিপুল। এর সাথে যুক্ত মাস্কের মতো বিনিয়োগকারী ও শতকোটিপতি ফিউচারিস্টিক ব্যবসায়ীদের অন্য ব্যবসাগুলোও। বেশি নয় ইলন মাস্কের শুধু টেসলার দিকে তাকালেই তাঁর দুর্ভাবনার কারণটি বোঝা যাবে। বৈদ্যুতিক গাড়ির এই উদ্যোগটি কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিচ্ছে না, শুধু বিরল খনিজের জন্য চীনের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণে। বিপরীতে চীনের বিওয়াইডি কম দামে গাড়ি প্রস্তুত ও সরবরাহ করতে পারার কারণে বাজারে বড় প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছে অল্প দিনের মধ্যেই।
মহাশূন্যে তাকানোটা এমন মাত্রাতেই ঘটছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া চাঁদে মিশন পাঠানো নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। খেয়াল করলেই দেখবেন এসব মিশনের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে চাঁদের মাটি পরীক্ষা। ভারতও এই প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে। রুশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রসকসমস ও চীনের মহাকাশ প্রশাসন ২০২৭ সালের মধ্যে মহাকাশে একটি যৌথ গবেষণা স্টেশন স্থাপনে একমত হয়েছে। সেখানে এ সম্পর্কিত প্রযুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বসে নেই। তারাও এ ক্ষেত্রে একটি বহুজাতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে আর্টেমিস অ্যাকর্ডের কথা বলা যায়, যেখানে বিভিন্ন দেশের সরকার তো বটেই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানিও চাঁদসহ বিভিন্ন গ্রহাণু বা মহাকাশের বিভিন্ন বস্তুতে নিজস্ব সেফটি জোন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এই অ্যাকর্ডের অধীনে থাকা পক্ষগুলো সেই সব অঞ্চলে অন্য দেশ বা জোটকে প্রবেশে বাধা দিতে পারবে। একইসঙ্গে সেইসব অঞ্চলে খনিজ অনুসন্ধান করা যাবে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, এ সম্পর্কিত দ্বন্দ্ব মহাবিশ্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। পৃথিবীতে এই দ্বন্দ্বে এশিয়া ও রাশিয়া এগিয়ে। কিন্তু মহাকাশে? সেটি নির্ভর করছে এ সম্পর্কিত গবেষণা এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন ও মহাকাশে সাম্রাজ্য বিস্তারে কে এগিয়ে, তার ওপর। সেটি অর্জনের আগ পর্যন্ত এশিয়ার দিকে নজর থাকবে সবার। কিন্তু মিয়ানমারের ঘটনা ঈশান কোণে কালো মেঘের শঙ্কা জাগাচ্ছে। এই বিরল খনিজ অঞ্চল হিসেবে সবচেয়ে বেশি মজুত ৫ কোটি ৪৪ লাখ মেট্রিক টন রয়েছে শুধু এশিয়াতেই। বাকিটা ছড়ানো আছে আফ্রিকা, ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়। এশিয়ার বাইরে এখন পর্যন্ত প্রমাণিত মজুত আছে ৩ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ, এশিয়ার বিপরীতে বাকি বিশ্বের পুরো মজুত এক জায়গায় আনলেও এশিয়া এগিয়ে থাকবে ব্যাপক ব্যবধানে।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]