বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের 'জুলাই আন্দোলন' নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কিন্তু তাই বলে পাবনার সেই হলের নাম—যেটি কিংবদন্তি সুচিত্রা সেনের নামে উৎসর্গ করা—পরিবর্তন করে ’৩৬ জুলাই হল’-এর নামে রাখা কি আমাদের ইতিহাসচর্চার সঠিক পথ?
সুচিত্রা সেন—হ্যাঁ, সেই সুচিত্রা—যিনি সেলুলয়েডের সাদা-কালো পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন এক স্বপ্নময় নারী-চরিত্রদের। কখনো তিনি ‘সপ্তপদী’-র রিনা ব্রাউন হয়ে উত্তমকুমারের পাশে স্বপ্নময় প্রেমেরগল্প রচনা করেছেন, কখনো ‘সাগরিকা’-র নিঃশব্দ যন্ত্রণা, আবার কখনো ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবির রাধার মতো আলো ছড়িয়েছেন পর্দাজুড়ে। উত্তম-সুচিত্রা জুটি শুধু সিনেমা নয়, বাঙালির কল্পনায় গেঁথে গেছে এক চিরন্তন বসন্তের রূপকথা হয়ে—যার সৌরভ আজও মুছে যায়নি।
২৬ বছরের অভিনয়জীবনে প্রেম, বেদনা, প্রতীক্ষা, স্বপ্ন আর বিসর্জনের এক অনন্য ভাষ্য রচনা করেছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে হঠাৎ অন্তরালে চলে গিয়ে রচনা করেছিলেন নিজস্ব এক নীরব প্রতিমা। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি সেই নীরবতারই চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে। কিন্তু মৃত্যু কি তাঁকে থামাতে পেরেছে? স্মৃতির পাতায় তিনি আজও জীবন্ত, আজও আলো ছড়ান নিঃশব্দে। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যই তো পাবনার মানুষ গর্ব নিয়ে সেই হলের নাম রেখেছিলেন সুচিত্রা সেনের নামে। কারণ এখানেই তো তাঁর শৈশব—রমা দাশগুপ্ত নামে কাটানো সেই দিনগুলো। ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল পাবনার মাটি আলোকিত হয়েছিল করুণাময় ও ইন্দিরা দাশগুপ্ত দম্পতির কন্যা রমার জন্মে। ইছামতির হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো এক কিশোরী হয়ে যিনি একদিন হয়ে উঠেছেন সাদা পর্দার কালজয়ী নায়িকা।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’—সুচিত্রা যেন সেই কথাটিকেই সত্যি করেছিলেন। তিনি মরেননি, তিনি আছেন, পাবনার হেমসাগর লেনের সেই পুরোনো বাড়ির প্রতিটি ভাঙা দেয়ালে, প্রতিটি শিউলি-ঝরার সকালের মধ্যে।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের গৌরব উদযাপন করতে গিয়ে কি আমাদের এমন একটি সাংস্কৃতিক আইকনের স্মৃতিকে মুছে দেওয়া উচিত? ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক নয়, ইতিহাসের মেরুদণ্ড গড়ে ওঠে সংস্কৃতি, শিল্প আর মানুষকে ঘিরে। সুচিত্রা সেন শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি এক নিঃশব্দ বাতিঘর—যিনি আজও আমাদের কল্পনা আর স্মৃতির জগতে আলো ছড়ান। স্মৃতিকে ভুলে গিয়ে সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয় না—তা কেবল বিস্মৃতির অন্ধকারেই ধাক্কা খায়।
আজও যদি কেউ পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে একবার গিয়ে চুপচাপ দাঁড়ায়, তাহলে বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পাবে। সেটা কোনো ছাত্রীর না, কোনো দর্শকের না—সেটা সম্ভবত সুচিত্রা সেনের আত্মার। একটা সাদা শাড়ির খসখসে আওয়াজ, একটু রক্তকরবীর গন্ধ আর একটা প্রশ্ন, ‘আমার কী দোষ ছিল বলো?’
হ্যাঁ, তর্ক হোক, ইতিহাস চর্চা হোক—সবই চাই। কিন্তু তার মানে কি ইতিহাসকে মুছে দিয়ে নতুন চ্যাপ্টার লিখতে হবে? একথা তো কেউ বলেনি। সেটা তো ফ্যাসিস্টরাও করে না, তারা অন্তত পুরনো নাম মুছে ফেলার আগে কিছু ব্যাখ্যা দেয়। এখানে তো ব্যাখ্যার বালাই নেই। শুধু হঠাৎ একদিন ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে জানা যায়—সুচিত্রা চলে গেলেন, জুলাই এসে গেল।
সুচিত্রা সেন—যার নাম শুনলেই বাঙালি হৃদয়ে প্রেম আর ঐতিহ্যের এক অদ্ভুত গন্ধ আসে—তিনি তো শুধু নায়িকা ছিলেন না। তিনি ছিলেন স্বপ্ন, পর্দার সাহস, এবং নারী-অস্তিত্বের এক নিজস্ব সংজ্ঞা। তার নাম যদি মুছে ফেলতেই হয়, তাহলে আগে তার সেই হেঁটে যাওয়া দৃশ্যগুলো মুছে দিতে হবে, যেখানে তিনি নায়কের দিকে ফিরে তাকাননি, বরং হেঁটে চলে গেছেন নিজের সিদ্ধান্তে।
এই নাম পাল্টানো একটা অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। নাম পাল্টানো মানে অতীতকে ভুলে যেতে চাওয়া, কিংবা বর্তমানকে জোর করে গড়তে চাওয়া। কিন্তু এখানে তো অতীত কোনো অপরাধ করেনি। সুচিত্রা সেন তো কোনো রাজাকার ছিলেন না, কোনো সামরিক জান্তার মুখপাত্র ছিলেন না, কোনো বিতর্কিত দলীয় এমপি ছিলেন না—তিনি ছিলেন আমাদের স্বপ্নের প্রতিনিধি।
তাহলে?
যিদি ‘ঐতিহ্য’ শব্দটা পুরোনো হয়ে থাকে, যদি পুরনোকে মুছে ফেলে নতুন কিছু বসানোই লক্ষ্য হয়, তার পরও বলতে হয়, সুচিত্রা সেনের নামে হলের নামকরণ কেন বদলাতে হবে? এতে কার কী লাভ? এই যে মুছে ফেলার নেশা, এই যে প্রতিটি ইটের গায়ে নতুন পোস্টার সাঁটার তৃষ্ণা, এটা কি ঐতিহ্যকে পুনর্গঠনের নাম, না আত্মপরিচয়ের সস্তা গেরিলা সংস্করণ?
সুচিত্রা সেন হয়তো পর্দা থেকে সরে গিয়েছিলেন, চুপচাপ বেলভিউর এক কোনায় বাস করতেন। কিন্তু নামটা তো রয়ে গিয়েছিল, একটা চিহ্ন হয়ে, একটা গর্ব হয়ে। সেটাও যদি পাল্টে দিতে হয়, তাহলে বলতেই হয়—আমরা আর শুধু ইতিহাস ভুলে যাচ্ছি না, আমরা ইতিহাসকে রিএডিট করছি। যেন কোনো পুরনো সিনেমার মধ্যে ঢুকে ক্যামেরার এঙ্গেল বদলে দিচ্ছি, সংলাপ পাল্টে দিচ্ছি, যাতে আমাদের কাহিনিটা ঠিকঠাক ‘ম্যাচ’ করে যায়।
তবে মনে রেখো, ইতিহাস মানে শুধু ঘটনাপঞ্জি না। ইতিহাস মানে একেকটা মুখ, একেকটা নাম, একেকটা দীর্ঘশ্বাস। সুচিত্রা সেন নামটা মুছে ফেললে শুধু একটা ছাত্রীনিবাসের নাম পাল্টানো হয় না, একটা যুগের গন্ধ মুছে ফেলা হয়। একটা সাদা শাড়ির অভিমানের শব্দ স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। এটা কোনো বিপ্লব না, এটা একটা স্টিকারের ওপর আরেকটা স্টিকার সাঁটানো। খুবই আধুনিক, খুবই প্রগতিশীল, কিন্তু ঐতিহ্যবিরোধী এক ধরণের কুৎসিত কসটিউম বদল।
নাম পাল্টানো যায়, কিন্তু স্মৃতি?
যদি কেউ সত্যিই একদিন এডওয়ার্ড কলেজের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বলেন—’তোমার নাম ছিল সুচিত্রা, তাই তো?’ তখন কি উত্তর দেবে, জুলাই?
যদি কেউ পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে একদিন হেঁটে যায়, বাতাসে একটা অস্পষ্ট সুর শুনতে পাবে। খুব মন দিয়ে কান পাতলে বোঝা যাবে—সুচিত্রা সেনের কণ্ঠে নয়, ছাত্রীনিবাসের ইটগুলো গুনগুন করছে,’ওগো তুমি আমার, কানে কানে শুধু একবার বলো তুমি যে আমার..’’
কিন্তু সেই সুর এখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে কলেজ প্রশাসনের দিকে, যাঁরা সিনেমার জগতের নায়িকাকে ডিঙিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতার প্রেমে পড়েছেন। তারা বুঝেছেন, প্রেমে নয়, রাজনীতিতে বাঁচা যায়। অতএব, সুচিত্রা গেছেন, জুলাই এসেছে।
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করছে না—সুচিত্রা সেন কে ছিলেন? তিনি ছিলেন সেই অভিনেত্রী, যিনি কোনো দলের হয়ে মিছিল করেননি, বরং একার অভিনয়ে রচনা করেছেন ভালোবাসার সর্বনাম। তিনি ছিলেন ‘দেবদাস’-এর পার্বতী, ‘সাত পাকে বাঁধা’-র শ্রাবণী, ‘উত্তর ফাল্গুনী’-র বিভা, আর ‘আন্ধেরি’-র সাহসী নারী।
পর্দায় তিনি যখন মুচকি হাসেন, মনে হয় প্রেমটাই নতুন আবিষ্কার হলো। তিনি যখন চুপ করে তাকান, মনে হয় সেই চাহনির মানে খুঁজতে এক জীবনও কম। আর তিনি যখন কাঁদেন—পুরো জাতি তখন সাউন্ড বন্ধ করে চোখ ভেজায়।
‘তুমি যে আমার’,’ওগো নিরুপমা’,’তোমায় হৃদ মাঝে রাখব’—এসব গান কেবল গান নয়, এগুলো হলো বাঙালির ভালোবাসার অভিধান। আর এই সব গানের ভিজে পর্দায় তিনি ছিলেন এক চলন্ত কবিতা, যার প্রতিটি দৃশ্য আলতা মাখা পায়ের মতো নিঃশব্দ, তবু উচ্চারিত।
সুচিত্রা সেন ছিলেন একা, গম্ভীর, গুটিয়ে থাকা মানুষ। তার সৌন্দর্য ছিল শব্দহীন বিপ্লবের মতো—চিৎকার করতেন না, অথচ ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দিতেন। তিনি ছিলেন সংযমের রানি, পর্দার ‘আইকন’। একবার বেনারসী শাড়ি পরে যখন ‘সাত পাকে বাঁধা’য় অমিতাভ বচ্চনের বাবা (হ্যাঁ, হরিবংশ রাই বচ্চন) কবিতা লেখেন তার জন্য, তখন বোঝা যায় তিনি কোনো চরিত্র নয়—একটা চিন্তার নাম।
তাকে মুছে ফেলা যায়?
তবে এটা জেনে রাখা ভালো যে—সুচিত্রা সেন কোনো দিন হাঁসের মত হাঁটেননি, তিনি ছিলেন রাজহংসী। কেউ তার নাম মুছতে চাইলে তা হতে পারে, কিন্তু তার ছায়া মুছতে পারবে না। কারণ সুচিত্রা সেন কোনো ‘নাম’ ছিলেন না—তিনি ছিলেন বাঙালির এক অন্ধকার ঘরের আলো।
লেখক: গবেষক ও লেখক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]