সিঙ্গাপুর, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও ধনী কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি। ৭২৮ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপ রাষ্ট্রটির জীবনমান থেকে শুরু করে পরিবেশ পরিস্থিতি সবকিছুতেই বিশ্বের প্রথম কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি। সিঙ্গাপুরকে বলা হয় এশিয়ার করপোরেট রাজধানী। বিশ্বের যত বড় বড় কোম্পানি আছে, তাদের আঞ্চলিক হেড অফিসের জন্য সব সময় বেছে নেয় সিঙ্গাপুরকে।
কিন্তু ৫০ বছর আগেও সিঙ্গাপুর ছিল পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র। ভাঙা ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন, রুগ্ণ, দরিদ্র মানুষে ভর্তি একটা দেশ। এ ছাড়া অপরাধ, অশিক্ষা ও দুর্নীতিগ্রস্ত একটি দেশ, যার নেই কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ। আর বর্তমানে ছোট্ট সেই দ্বীপটিই আধুনিক পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কীভাবে হলো, তা আমাদের সবারই জানা। এগুলোর পেছনে কতগুলো কারণ ছিল। এর একটা হলো উন্নয়নের ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল। আরও কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি দমন, মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ও সুষ্ঠু নগরোন্নয়ন পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো।
তবে যে বিষয়টা আমি আলোচনা করতে চাচ্ছিলাম তা হলো, সিঙ্গাপুরের বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতি। যে কারণে এটা এশিয়ার করপোরেট ক্যাপিটালের মর্যাদা লাভ করেছে। এখন কথা হলো, বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের প্রয়োজন আছে, কি নেই? আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত পোষণ করবে না যে, দেশে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার আছে। বিশ্বে খুব কম দেশই আছে যাদের বিদেশি বিনিয়োগ দরকার নেই। খোদ আমেরিকা তার গ্রিন কার্ড বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে চড়া দামে। সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশের বিদেশি বিনিয়োগ কত বেশি প্রয়োজন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সেই প্রসঙ্গেই আসি, সিঙ্গাপুরের নীতিগুলো যেভাবে নেওয়া হয়েছে, তা খুব সহজেই বিনিয়োগ আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে। এই নীতির বিশদ ব্যাখ্যা এই ক্ষুদ্র পরিসরে দেওয়া সম্ভব না। তবে এর ফলে সিঙ্গাপুরের উন্নতির পেছনে যে এই বিনিয়োগের অবদান আছে, তা স্পষ্টতই দৃশ্যমান। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের সেবার মান বিশ্বের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। সব দেশের এই সব বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকে না। আর অভিজ্ঞতা না থাকলে যেটা হয়, সেটা হলো অব্যবস্থাপনা। এই অব্যবস্থাপনার মাশুল দিতে হয় নানাভাবে। এমনকি একটা সম্ভাবনাময় দেশের অনেক সম্ভাবনার দুয়ার বন্ধ হয়ে যায় বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতার জন্য।
একটা সমুদ্র বন্দরে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য ওঠানো নামানো হয়। এ কাজ যত তাড়াতাড়ি ও দক্ষতার সাথে করা যায়, অর্থনৈতিকভাবে ততই লাভবান হওয়া যায়। এ জন্য জাহাজ কোম্পানি ও আমদানি-রপ্তানিকারকদের প্রধান লক্ষ্য থাকে কত দ্রুততার সাথে পণ্য খালাস করা যায়। বাংলাদেশে বন্দর ব্যবস্থাপনা কেমন–তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। আমি এখানে নতুন করে আলোচনার কিছু দেখি না।
কিন্তু ইদানীং একটা বিষয় রীতিমতো রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তা হচ্ছে, বন্দর বিক্রি করা বা বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। একটা দেশের বন্দর আরেকটা দেশের কাছে ছেড়ে দেওয়া অবশ্যই বিপজ্জনক। তাও যদি সেটা কোনো পরাশক্তির কাছে হয়, তা হবে আরও বেশি বিপজ্জনক। কিন্তু আমাদের দেশে চিলে কান নিয়ে গেছে বললেই নিজের কানে হাত না দিয়ে সবাই সোজা চিলের পেছনে ছোটে। সরকার চিটাগং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি এক কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিচ্ছে সংবাদটা এমনই। এটি ডিপি ওয়ার্ল্ড নামের দুবাইভিত্তিক একটা কোম্পানি, যার এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা দক্ষতা ও বিনিয়োগ করার সক্ষমতা রয়েছে। এর মাধ্যমে যদি আমাদের বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, তবে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। লোকবল নিশ্চিতভাবেই এখানকার হবে। কেননা, দুবাইয়ের শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। তাই সেখান থেকে লোক নিয়ে আসার প্রশ্নই ওঠে না।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার জন্য প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের এই মুহূর্তে নেই। এখন দেখা দরকার ছিল চুক্তিটা কেমন হয়েছে, আর আদৌ হয়েছে কিনা। যদি নিছক প্রস্তাব আকারে থাকে, তবে কোনো কথা নেই। আর যদি চুক্তি আকারে থাকে, তবে দেখতে হবে দেশের জন্য কোনো ক্ষতিকর বিষয় এতে সন্নিবেশিত হয়েছে কিনা। বর্তমান বিশ্বে দেশগুলো পরস্পর নির্ভরশীল। আবার উন্নয়নের জন্য একান্তভাবেই নির্ভর করতে হয় একে অপরের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রাথমিক অবস্থায় বিশেষজ্ঞ থেকে শ্রমিক পর্যন্ত সবকিছুর জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখনো এই উপসাগরীয় দেশগুলোর জনসংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক বিদেশি অভিবাসী সেখানে অবস্থান করছে। আয়তনে খুবই ছোট সেই দেশগুলো তো দখল হয়ে যায়নি বা তাদের অর্থনীতি অন্য দেশের কুক্ষিগত হয়ে যায়নি। বিশ্বের অন্যতম বড় বিমানসংস্থা এমিরেটস এয়ারলাইন্স একসময় শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের কাছে শেয়ার বিক্রি করেছিল। কিন্তু পরে আবার তা কিনে নিয়েছে। কিন্তু তাই বলে শ্রীলঙ্কার দখলে তাদের বিমানসংস্থা চলে যায়নি। বাংলাদেশের শাহজালাল বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালের কার্গো হান্ডলিংয়ের কাজ জাপানকে দেওয়া হচ্ছে। কারণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট অদক্ষতা আর দুর্নীতির অভিযোগ আছে বাংলাদেশ বিমানের ব্যবস্থাপনায়। আমরা যারা বিদেশে থাকি, আসা‑যাওয়া করি, তারা হাড়ে হাড়ে টের পাই প্রতিবার।
বিদেশের অন্যান্য বিমানবন্দরগুলোর সাথে তুলনা করলে এই পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। দীর্ঘ সফর শেষে অনেক সময় বসে থাকতে হয় যাত্রীদের লাগেজ পাওয়ার জন্য। আবার অনেক হতভাগ্য যাত্রীর লাগেজ কেটে জিনিসপত্র চুরি করা হয়। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কাজ করলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ে। আমাদের দেশে প্রথম মহাখালি ফ্লাইওভার তৈরি করে চীনা প্রতিষ্ঠান। পরে তারচেয়ে অনেকগুণ বড় হানিফ ফ্লাইওভার তৈরি করে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। কেননা ইতিমধ্যে সেই দক্ষতা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো অর্জন করেছে। তাই বিদেশিদের বন্দর ও বিমানবন্দরের কাজ দেওয়া যাবে না, এমন কোনো কথা নেই।
আমাদের পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রো রেল থেকে অনেক কিছুই বিদেশিরা করেছে। সব দেশেই করে, আমাদের দেশেও করছে। এক সময় দেখা যাবে পদ্মা সেতুর চেয়ে বড় সেতু বাংলাদেশ নিজেই তৈরি করছে বা অন্য দেশের জন্য তৈরি করবে। কিন্তু প্রাথমিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিদেশিদের হাত থেকেই পেতে হয়। তাই বিদেশিদের বন্দর পরিচালনা করতে দেওয়া আর দেশ বা বন্দর বিক্রি এক কথা না। আগে দেখতে হবে চুক্তিটা কেমন।
বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেটের প্রভাবের গুরুতর অভিযোগ আছে। বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে শত কোটি টাকার বাণিজ্য হাতছাড়া হওয়া। বন্দর ব্যবস্থাপনা চাই গোল্লায় যাক, তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। এতে দেশের অর্থনীতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা অনুধাবন করারই বা দরকার কি! এ ছাড়া দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা সিন্ডিকেটের হাতে থাকলে রাজনৈতিক ফায়দাও নেওয়া যায়। সরকারকে বন্দরকে অচল করার হুমকি দেওয়া যায়। তাই এসব ব্যাপারে কান কথায় নির্ভর না করে কে কী উদ্দেশ্যে এসব বলছে, তা জানা দরকার।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান (ব্যবসায় শিক্ষা), বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাস্কাট, ওমান
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]