রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এক মহীরুহ, যিনি কেবল বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে নয়, ভারতীয় দর্শন ও মননচিন্তার পরিসরে রেখে গেছেন শাশ্বত দীপ্তি। ২২ শ্রাবণ তাঁর শারীরিক প্রস্থান, কিন্তু চেতনায় তিনি আজও অপরিহার্য। তাঁর শিক্ষা-ভাবনা ছিল সময়ের বহু ঊর্ধ্বে, যেখানে প্রথার গণ্ডি ভেঙে গড়ে উঠেছিল এক নান্দনিক ও মানবিক দর্শন। আধুনিক শিক্ষা যেখানে অধিকাংশ সময় তথ্যপ্রবাহে বিভোর, সেখানে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা-ব্যবস্থার কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন হৃদয়, সৃজনশীলতা ও আত্মার বিকাশ।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতি, জীবন, কল্পনা, অনুভব–সবকিছুর মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে একটি সার্থক শিক্ষা। এ বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় শান্তিনিকেতন। ছায়াময় বৃক্ষতলে, মুক্ত আকাশের নীচে, পাখির গান আর বাতাসের হিমস্পর্শে গড়ে ওঠে শিক্ষার সেই আশ্রম। এটি ছিল এক ‘ভাবজগত’, যেখানে শিক্ষা মানে ছিল অনুভবের সম্প্রসারণ, হৃদয়ের উন্মোচন এবং আত্মার আলোকপ্রাপ্তি।
রবীন্দ্রনাথ প্রথাগত শিক্ষাকে সংশয়ভরে দেখতেন। তাঁর মতে, কেবল বই মুখস্থ করে পাশ করাই শিক্ষার লক্ষ্য হতে পারে না। তিনি বলেন, “শিক্ষা সেই, যা মানুষকে আপন জীবনের উপযোগী করে তোলে।” এই উপযোগিতা মানে, জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আত্মাকে জাগানো। তাঁর দর্শনে ‘জ্ঞান’ কেবল এক ধ্যান নয়, তা ছিল চৈতন্যের প্রবাহ, যে চেতনা মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করে। সেজন্যই তিনি শিক্ষার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন সঙ্গীত, চিত্রকলা, নাট্যচর্চা–যেখানে শিশুরা আত্মপ্রকাশের সুযোগ পায়, অনুশাসনের ভয়ে নয়, ভালোবাসার আশ্রয়ে।
শান্তিনিকেতনের পাঠশালায় প্রতিদিনের পাঠ শুরু হতো সূর্যোদয়ের সঙ্গীত দিয়ে। এখানে শিশুরা প্রকৃতিকে পাঠ করতো চোখ দিয়ে, কান দিয়ে। জল, পাখি, পত্রপল্লব, আকাশ, মাটি–সবকিছুই ছিল পাঠ্য, সবই ছিল আত্মীয়। তাঁর মতে, প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে যে শিক্ষা, তা হয় নির্বোধের দীক্ষা। তাই শান্তিনিকেতন ছিল শিক্ষার এক ছায়াস্নাত বাগান, যেখানে শিশুদের আত্মা রোদ পোহাতো, গান গাইতো, ভাবতে শিখতো।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-ভাবনা রচিত হয়েছিল ভারতীয় দর্শনের ভিত্তির ওপর, বিশেষত উপনিষদের ধ্যান ও ব্রহ্মচেতনার আলোকে। তাঁর লেখায় ঘন ঘন ফিরে আসে আত্মার মুক্তির কথা, “মুক্তি যে আলোয় আলোয়”–এই উপলব্ধি শিক্ষারও এক তীব্র প্রকাশ। আবার পাশ্চাত্যের শিক্ষা-ব্যবস্থার মধ্যেও তিনি দেখেছিলেন চিন্তার স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার অধিকার এবং বিশ্লেষণের অনুশীলন। এই দুই ধারার সেতুবন্ধন করেই তিনি গড়েছিলেন তাঁর এক স্বতন্ত্র শিক্ষাতত্ত্ব, যা আজকের বৈশ্বিক শিক্ষা-চিন্তারও এক অনন্য উদাহরণ।
তাঁর সাহিত্যজগৎ–গান, কবিতা, নাটক, উপন্যাস প্রতিটিতেই শিক্ষার প্রতিফলন রয়েছে। ‘তোটোচাঁদ’, ‘দেবতার গ্রাস’, ‘ডাকঘর’, কিংবা ‘অচলায়তন’–সবখানেই শিক্ষার সঙ্গে সমাজ, ধর্ম, কর্তৃত্ব ও মানবিকতা নিয়ে এক তীক্ষ্ণ আলাপ চলে। তিনি সবসময় মনে করতেন, শিশু কেবল পঠন-পাঠনের বস্তু নয়, সে একটি স্বতন্ত্র সত্তা, তার চিন্তা ও কল্পনাকে সম্মান না দিলে সে কখনো পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে না।
এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “ছেলেদের মধ্যে ছেলে হয়ে মিলতে হবে, না হলে তার থেকে কিছুই শেখা যাবে না।” তিনি শিক্ষকের মধ্যে চাইতেন কবির হৃদয়, শিল্পীর দৃষ্টি এবং ঋষির সহনশীলতা। শিক্ষক যেন হয় এক বাল্যবন্ধু, এক আত্মার আলোকদাতা। এই সম্পর্কের উষ্ণতাই শিক্ষাকে পরিণত করে জীবনের এক আনন্দময় অভিজ্ঞতায়।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-চিন্তা আজও কতটা প্রাসঙ্গিক, তা উপলব্ধি করি যখন দেখি–আজকের শিক্ষা কতটা প্রতিযোগিতা নির্ভর, কতটা চাপগ্রস্ত। শিশুর হাতে বই আছে, মুখে কবিতা আছে, কিন্তু তার চোখে নেই বিস্ময়ের দীপ্তি। এই অনাবিষ্কৃত শৈশবের প্রান্তে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ যেন হাত বাড়িয়ে বলেন–“প্রশ্ন করো, ভাবো, অনুভব করো–কারণ শিক্ষা কেবল অর্জন নয়, এটি আত্মার পরিশুদ্ধি।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন চির প্রেমিক। মানবতাকে ভালোবেসেছেন, শিশুকে ভালোবেসেছেন, জ্ঞানকে ভালোবেসেছেন। তাই ২২ শ্রাবণ আমাদের কাছে কোনো এক শোকগ্রস্ত দিন নয়, বরং এটি এক চিরভাসমান উপলব্ধির দিন। যেখানে আমরা গভীরভাবে ফিরে পাই তাঁকে, তাঁর অমৃতবাক্যে, তাঁর গানে, তাঁর দৃষ্টিতে। আজও যেন বাতাসে শুনি তাঁর গাওয়া সেই চিরন্তন প্রার্থনা–
“আমার মুক্তি আলোয় আলোয়”
আর আমরা বুঝে নিই—এই মুক্তিই তো প্রকৃত শিক্ষা। এই আলোয়ই তো বেঁচে থাকা।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]