নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন: শেকড়সন্ধানী এক মহীরুহ

কিছু মানুষের জন্ম হয় ইতিহাসকে নতুনভাবে লেখার জন্য। কালের সীমারেখা ডিঙিয়ে তাঁরা হয়ে ওঠেন প্রবহমান নক্ষত্র, যার আলোয় উদ্ভাসিত হয় সমগ্র একটি জাতির সাংস্কৃতিক চেতনা। আজ ১৮ আগস্ট, বাংলা নাটকের অনির্বাণ দীপশিখা সেলিম আল দীনের ৭৬তম জন্মজয়ন্তী। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ফেনীর সোনাগাজীতে জন্ম নেওয়া এই মহান নাট্যকার শুধু নাটকের ভাষা ও আঙ্গিকই পাল্টে দেননি, বাঙালির আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রবেশ করে আবিষ্কার করেছিলেন তার মৌলিক সত্তা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক শূন্যতাকে তিনি তাঁর সৃষ্টিশীলতায় এমনভাবে পূর্ণ করেছিলেন, যা আজও আমাদের আলোকিত করে চলেছে।

সেলিম আল দীনের নাট্য দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’–একটি অনন্য সৃষ্টিতত্ত্ব, যেখানে বাস্তব ও অতিবাস্তব, ইতিহাস ও পুরাণ, ব্যক্তি ও সমষ্টি একাকার হয়ে যায়। তাঁর এই তাত্ত্বিক কাঠামো নোবেলজয়ী গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘জাদুবাস্তবতা’র সাথে তুলনীয় হলেও তা ছিল সম্পূর্ণরূপে বাংলার মাটি ও মননে উদ্ভূত। ‘হরগজ’ নাটকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে মানুষের সংগ্রাম শুধু স্থানীয় নয়, হয়ে ওঠে সর্বজনীন। ১৯৮৬ সালে রচিত এই নাটকে তিনি যে অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

তাঁর সৃষ্টিকর্মের পরিধি বিস্ময়কর–‘চাকা’ (১৯৮৮) থেকে ‘শকুন্তলা’ (১৯৯১), ‘কিত্তনখোলা’ (১৯৯৪) থেকে ‘যৈবতী কন্যার মন’ (১৯৯৬) পর্যন্ত প্রতিটি নাটক বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘কিত্তনখোলা’ নাটকটি, যেখানে তিনি লোকজ সংস্কৃতি ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বকে এমন নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যা নাট্য ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আফসার আহমেদের মতে, ‘সেলিম আল দীন শুধু নাটক রচনা করেননি, তিনি তৈরি করেছিলেন এক নতুন নন্দনতত্ত্ব।’

১৯৭৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা তাঁর অন্যতম কীর্তি। এই বিভাগ থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য মেধাবী নাট্যকর্মী, যারা বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা থিয়েটার’ শুধু একটি নাট্যদল নয়, এটি হয়ে উঠেছিল বাংলা নাটকের নবজাগরণের সূতিকাগার। ২০০৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত এই মহান শিল্পী সম্পর্কে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, ‘সেলিম আল দীন ছিলেন আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মার প্রতিনিধি।’

তাঁর সৃষ্টিকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মাটি ও মানুষের সাথে গভীর সংযোগ। ‘যৈবতী কন্যার মন’ বা ‘শকুন্তলা’র মতো নাটকে তিনি পুরাণকে নতুনভাবে পাঠ করেছিলেন, যেখানে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে তৈরি হয় এক অনন্য সেতুবন্ধ। নাট্যকার আব্দুল্লাহ আল মামুনের ভাষায়, ‘তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, কীভাবে নিজস্ব ঐতিহ্যের মধ্যে থেকেও আধুনিক হওয়া যায়।’

সেলিম আল দীন শুধু একজন নাট্যকারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক, সমাজবিশ্লেষক এবং সাংস্কৃতিক নেতা। তাঁর রচনাবলি ও চিন্তাধারা বাংলা নাট্যকলাকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। তাঁর সৃষ্টি আমাদের শেখায় কীভাবে শিল্প হতে পারে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, কীভাবে শেকড়ের সন্ধানেই পাওয়া যায় বিশ্বজনীনতার চাবিকাঠি। তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন তাঁর অমর সৃষ্টির মাধ্যমে–এক সত্যিকারের প্রবহমান নক্ষত্র হিসেবে।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়