শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমাজের দূরত্ব কি বাড়ছে?

উত্তপ্ত বলার মতো পরিস্থিতি হয়তো এখনো হয়নি, তবে এটা বলাই যায় যে, বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গণে উত্তেজনা বাড়ছে। গত কিছুদিনে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনা দেখে এতটুকু বুঝতে আইনস্টাইন হওয়ার দরকার পড়ে না। ডাকসু, রাকসু, চাকসু, জাকসু–কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরগরমই ছিল, সে নিয়েই নাটকীয়তার শেষ নেই। তবে সেসব রাজনৈতিক উত্তেজনা। এর মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতার উদাহরণ হয়ে যোগ হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা দুটি। দুই জায়গায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকার মানুষ।

পাশের এলাকার মানুষের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের ঝামেলার উদাহরণ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত না হলেও বিরল মোটেও নয়। কখনো লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি করা সংগঠনগুলোর নেতাদের চাঁদাবাজি নিয়ে, কখনো-বা শুধুই এলাকাভিত্তিক দাদাগিরি দেখাতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের নীলক্ষেত-নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় জড়ানোর ঘটনা কম দেখেনি মানুষ। রাজনীতিতে দাপটের হিসাব-নিকাশ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাশ্ববর্তী এলাকার মানুষের বিবাদও দেখা হয়েছে অনেক। জাহাঙ্গীরনগরে হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আশপাশের এলাকার মানুষের টানাপোড়েন দেখার অভিজ্ঞতাও এ দেশের মানুষের আছে। কিন্তু সেসব অভিজ্ঞতাই বলে, এবারের সংঘাতের ধরনটা ভিন্ন। অস্বাভাবিক।

গত শনিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ হয়। ছবি: ইনডিপেনডেন্টচট্টগ্রামে সংঘাতের শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এলাকায় বাস করা এক ছাত্রীর রাতে বাসায় ফেরাকে কেন্দ্র করে। বাসায় ফিরতে খানিকের দেরি হলো ওই ছাত্রীর, এ নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে বাসার দারোয়ান ওই ছাত্রীর গায়ে হাত তুলে বসলেন! সংঘাত সে রাতেই তীব্র হলো, গভীর রাতে সেনাবাহিনীর আগমণে সে সময় থামলেও পরের দিন দুপুরে আবার শুরু সংঘর্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য ও প্রক্টর তা ঠেকাতে গিয়ে উল্টো আহত হয়ে ফিরলেন! ফেসবুক ভরে গেল একদিকে গ্রামবাসীর হাতে শিক্ষার্থীদের কোপ খাওয়ার, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের হাতে গ্রামের কিছু কিছু জায়গায় আগুন দেওয়া আর ভাঙচুরের ভিডিওতে।

ময়মনসিংহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় পাশের এলাকার মানুষের ঢুকে পড়ার চিত্রটা তো আরও রহস্যজনক। ঝামেলাটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীণ। দুটি অনুষদের শিক্ষার্থীদের কম্বাইন্ড ডিগ্রির দাবি ছিল, তা অনেক দিনেও না মানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় বসা প্রায় দুই শ শিক্ষককে তালাবদ্ধ করে রাখলেন শিক্ষার্থীরা। জেলা প্রশাসক আর পুলিশ সুপার যাওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের মানানো গেল না। এরপর সন্ধ্যায় ভিসির বাসভবনের পাশ থেকে ২৫০-৩০০ বহিরাগত অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে ঢুকে গেলেন ‘সমস্যার সমাধানে!’ কার প্ররোচনায়, কার ডাকে এই বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে অস্ত্র নিয়ে ঢুকলেন, সে উত্তর এখনো মেলেনি।

চট্টগ্রামে যেমন উত্তর মেলেনি এই সংঘাতের সঙ্গে চাকসু নির্বাচনের যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্নের। হামলার মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ  গ্রামবাসীর ওপর হামলায় অন্য শিক্ষার্থীদের প্ররোচনা জুগিয়েছেন বলে অভিযোগ, এই হামলার মধ্যে কারও কারও নায়ক বনে চাকসুতে ভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন চাকসু নির্বাচনেই অংশ নিতে যাওয়া কয়েকজন।

এসব অভিযোগ রাজনৈতিক, এসব প্রশ্নের উত্তরও রাজনীতিই দেবে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে। কিন্তু অদূর কিংবা সুদূর–দুই ভবিষ্যতেই চোখ রাখলে এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংঘাতের পর অন্য একটা শঙ্কা আরও বড় হয়ে দেখা দেয়। শঙ্কাটা সমাজের চোখে শিক্ষার্থীদের অবস্থান নিয়ে–শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কি সমাজের একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে?

আদর্শ পরিস্থিতি চিন্তা করলে এই শিক্ষার্থীদের এখন পড়ার টেবিলে থাকার কথা। অনেকের গবেষণায় ব্যস্ত থাকার কথা। সংঘাতে যদি জড়ানোর প্রসঙ্গ আসেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সগর্ব অবস্থান বিবেচনায় সেটা হওয়ার কথা সাধারণের দাবির সঙ্গে এক হয়ে, সাধারণের কণ্ঠ হয়ে। শিক্ষার্থীদের দেখানো পথে সমাজ হাঁটার কথা, এক বছর আগেই জনতা ছাত্রসমাজের দেখানো পথে হেঁটেছে বলেই না সেটা রূপ নিয়েছে গণআন্দোলনে! কিন্তু এখানে ‘ছাত্র’ আর ‘জনতা’ই হয়ে যাচ্ছে দুই বিপরীত পক্ষ!

কেন?

উত্তরটা শুধু চট্টগ্রাম বা ময়মনসিংহে খুঁজলে হবে না। পায়ে পা মিলিয়ে ছাত্র-জনতার এক হয়ে হাঁটার সর্বশেষ উদাহরণ যে জুলাই-আগস্ট, তার পরের এক বছরে দুই পক্ষের পথ দুদিকে গেছে ঠিকই। তবে শুধু এই এক বছরেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়েছে, এমন ভাবতে যাওয়াও ভুলই হবে।

জুলাই বিপ্লবে ঢাকার রাস্তায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্সজুলাই-আগস্টে সব পক্ষই এক হয়েছিল একটা বড় স্বপ্নের ছাতার নিচে, তাদের প্রতিপক্ষ ছিল এক। বিভেদ তাই তখন আর দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের ভূমিকা বদলেছে, ছাত্র থেকে নেতা বনে গেছেন অনেকে। জনতার মনে ‘ছাত্রে’র ছবি পাল্টেছে। কিন্তু তখনো সে ছবিটা ছিল আশার প্রতিচ্ছবি। ছাত্র ছিলেন বলেই তাঁরা নেতা হওয়ায় বদলের আশা দেখেছিল সাধারণ জনতা–দশকের পর দশক ধরে চলমান ঘুনে ধরা রাজনীতির পরিবর্তনের সে আশাও তো সাধারণের রাস্তায় নেমে আসার একটা বড় কারণ ছিল! কিন্তু সে আশা পূরণ হয়েছে কি? হলেও কতটা?

নেতা বনে যাওয়া ছাত্রদের কিংবা তাঁদের নাগপাশে থাকা সুবিধাভোগীদের বিতর্কিত অনেক কর্মকাণ্ড, বিতর্কিত শব্দচয়ন, দুর্নীতি-মবে তাঁদেরই অনুসারী ছাত্রদের অংশগ্রহণ জনতার মনে ‘ছাত্র’দের ছবিটাতেই যে কালি লেপে দেয়নি, তা কে অস্বীকার করবে?

কিন্তু সেটা ছাত্র ও জনতার ক্রমেই বিপরীতমুখী হতে থাকা সম্পর্কটাতে বিষের মাত্রা বাড়িয়েছে শুধু। আবেগে বাঁধা এই সম্পর্কে তিক্ততার শুরুর বিন্দু তো আর সময়নির্দিষ্ট করে বলা যায় না, তবে তিক্ততার নেপথ্যের উৎস খুঁজতে কয়েক বছর বা দু-তিন দশক পেছনে ঘুরে আসতে হবে। সমাজের চোখে ‘শিক্ষার্থী’ নামের ছবিটার মানে কী, সেই ছবি বদলাল কেন–এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো সমাজ শিক্ষার্থীদের পেছনে বিনিয়োগ করে। এই বিনিয়োগকারী ‘সমাজে’র সঙ্গেই যদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্কটাতে আর জোর না থাকে, বুঝে নিতে হবে বিনিয়োগকারীরা আর ইনভেস্টমেন্টে ‘ভ্যালু’ দেখছেন না!

ছবি: সংগৃহীতকেন দেখছেন না? কারণ হয়তো এই যে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ পথপ্রদর্শক হওয়ার গুণ দেখে না সমাজ। সম্পদ না হয়ে শিক্ষার্থীরা দিনে দিনে বোঝা হচ্ছে কি না, সেই বিবেচনাও আসে এখানে।

বোঝা কেন, সেটা বুঝতে বেশি দূর যাওয়ার তো দরকার নেই। জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকা শিক্ষিত বেকারের সংখ্যায় চোখ রাখলেই হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩-এর যে চিত্র গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা গেল, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশই বেকার, আর এই বেকারদের ৮৭ শতাংশ শিক্ষিত। এই ৮৭-র মধ্যে ২১ শতাংশ বেকার হয়ে আছেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেও!

যে দেশে শিল্প বলতে মূলত শ্রমনির্ভর কারখানা বোঝায়, এত বছরেও নিজস্ব ব্র্যান্ড দাঁড়ানোর বদলে উল্টো মুক্ত অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর বিদেশমুখী হয়েছে শিল্প–এমনকি কৃষিও, যে দেশে বেসরকারি খাত মূলত দাঁড়িয়ে আছে পণ্য কেনা আর বেচার ওপর, সে দেশে বেকার সমস্যা–আরও নির্দিষ্ট করে বললে শিক্ষিত বেকারের সমস্যা না হওয়ার তো কোনো কারণও নেই। অত কঠিন করে ভাবার দরকার নেই, শুধু আপনার আশপাশেই ‘সায়েন্সে পড়ে বাংলাদেশে খুব গভীরে কিছু করার সুযোগ নেই’ ভেবে বিদেশে পাড়ি জমানো, ‘আর্টসে পড়ে আর কী চাকরি করবে’ শুনতে বাধ্য হওয়া শিক্ষার্থীর পরিমাণ চিন্তা করলেই সমস্যার কারণ খুঁজে পাওয়ার কথা।

ঝামেলা হলো, শিল্প তৈরি না হওয়া এই দারিদ্র্যপীড়িত সমাজ চলে বাকিদের দারিদ্র্যের মধ্যে যে যেভাবে পারে ধনী হওয়াকে ‘ক্যাপিটাল’ ভেবে। এই সমাজ দাঁড়িয়ে মূলত মধ্যবিত্ত আর নিম্ন-মধ্যবিত্তের ভিতের ওপর, যাদের কাছে চাকরিই শেষ কথা। কিংবা চাকরির বাইরে কিছু ভাবার বা করার সুযোগ তাদের জন্য অবারিত নয়। ফলে চাকরিই হয়ে পড়ে তাদের ধ্যানজ্ঞান। বেসরকারি খাতের অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি চাকরি বনে যায় তপস্যা। কিন্তু চাকরির সুযোগ কোথায়?

শনিবার শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বড় জমায়েত। ফাইল ছবিসুনির্দিষ্ট তথ্য তো পাওয়া যায় না, তবে কিছু কিছু প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গত এক দশকে দেশে বেসরকারি চাকরির সুযোগ গড়ে তৈরি হয়েছে বছরে ১০-১৫ লাখের মতো। সেটাও সম্ভব হয়েছে গার্মেন্টস, সিরামিকস, কৃষি, আইটি সেক্টরের পাশাপাশি গত দশকে ফিনটেক, ই-কর্মাস, লজিস্টিকসের মতো ‘ডিজিটাল স্টার্টআপে’র বাড়বাড়ন্তের কারণে। আর সরকারি খাতে চাকরি? বছরে গড়ে ১০-১৫ হাজার! কিন্তু চাকরির সুযোগ যেখানে পায়ে চালিত রিকশার গতিতে বেড়েছে, অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বেরোনো শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে এক্সপ্রেসওয়েতে ছোটা গাড়ির গতিতে! ফল? কিছু অংশ হয়তো ফ্রিল্যান্সিংয়ে ঝুঁকেছে, এর বাইরে চাকরিতে একটা আসনের বিপরীতে প্রার্থীর ভিড় জমেছে। সমান্তরালে ভিড় বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে একটা আসন পাওয়ার জন্য সকাল থেকেই এমপিথ্রি হাতে শিক্ষার্থীর। ‘অ্যাটেনডেন্স’ নিয়ে ঝামেলা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে এত ভিড় থাকত কি না–এই প্রশ্নটাকে যা আর অযৌক্তিক মনে করায় না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য তো লাইব্রেরিতে এমপিথ্রি কপচানো শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়!

এই অবস্থা হয়েছে কেন? মানতেই হবে, গত এক দশকে পাইকারি দরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা একটা বড় কারণ। বেকার সমস্যার সমাধানে চাকরির ক্ষেত্র তৈরির পথ না মাড়িয়ে রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে নিয়ে আসা হলো–প্রতি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয়! পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তুকি যেহেতু সমাজের করের টাকায়ই হয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবটাই দেখুন। এই শতাব্দীর প্রথম ১৫ বছরে দেশে নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি হয়েছিল ১৮টি, কিন্তু সর্বশেষ দশ বছরেই সংখ্যাটা ১৯। এবং সে হিসাবও এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের, প্রস্তাবিতগুলোর হিসাব এখানে আসেনি। এর বাইরে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তো ব্যাঙের ছাতার মতোই তৈরি হয়েছে!

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কি ভুল? তাত্ত্বিকভাবে নয়। অ্যাভেইলেবিলিটি অবশ্যই বড় অ্যাবিলিটি। কিন্তু সেই উপস্থিতি যদি হয় রাস্তায় সিটি করপোরেশনের এক্সকেভেটরে খননকাজ দেখতে ভিড় জমানো লোকের মতো, তা দিয়ে আর লাভ কী? চাকরির পাইপলাইন যেখানে ক্ষীণ, সেখানে কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ আরও না বাড়িয়ে গণহারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আর মদ খেয়ে প্রেমের ব্যর্থতা ভুলে থাকার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য তো নেই!

এখান থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সমাজ কী বার্তা পাচ্ছে?

যে সময়ে বাংলাদেশ ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সের; অর্থাৎ, কর্মক্ষম জনসংখ্যার বাড়বাড়ন্তের (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) সুবিধা নেওয়ার কথা, যে সুবিধা আবার আর এক দশক পর সেভাবে থাকবে না বলেই জানাচ্ছে সব বিশ্লেষণ… সে সময়ে সমাজ দেখল, শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে ঢোকার আগে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে করতেই বয়সের হিসেবে মধ্য বিশের ঘর পেরিয়ে যাচ্ছে। এবং সেটা পেরিয়েও অনেকে হয়ে থাকছে শিক্ষিত বেকার। একে সম্পদ আর কীভাবে বলবেন? আর বোঝা কাঁধে বইতে সমাজের ভালো লাগার তো কথা নয়!

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়াসমাজের ভালো লাগার কথা নয়, যখন সে দেখেছে, গণঅভ্যুত্থানের পর একের পর এক স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরাই অনেক শিক্ষককে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে গলাধাক্কা দিয়ে। এর মধ্যে অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা রাজনৈতিক দাপট খাটানোর অভিযোগ আসলেই সঠিক, কিন্তু সেসবের বিচার করার জন্য আইন-আদালতের ব্যবস্থা তো সমাজই করে রেখেছে। শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষকের অপমান সে সময়ের তাৎক্ষণিকতায় কিছু নব্য সুবিধাবাদী অংশের হাততালি পেলেও সমাজ বুঝেছে, শিক্ষার্থী তার শিক্ষককেই সম্মান দেখাতে জানে না। দেখেছে, প্রতিবাদ আর প্রতিহিংসার পার্থক্য এই শিক্ষার্থী সমাজ করতে শেখেনি। তার চেয়েও ভয়ংকর ইঙ্গিত হয়ে এসেছে তাদের কথিত আর লিখিত ভাষার ছিরি! আর সম্মান যে দিতে জানে না, তাকে তো সম্মানের চোখে সমাজ দেখবে না।

এর বাইরে সমাজ দেখেছে কিশোর গ্যাংয়ে শিক্ষার্থীদের শামিল হতে। স্কুল বা কলেজের ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের ছুরি-কাঁচি হাতে ‘দাদাগিরি’ দেখার জন্য তো সমাজ কখনোই প্রস্তুত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের অস্ত্র হাতে কোনো ভাই, কোনো নেতার ধামাধারী হতে দেখতেও প্রস্তুত ছিল না। সেটার প্রভাব দেখা গেছে সাধারণ মানুষের আবেগের প্রকাশে। এই কয়েক দশক আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বা কলেজের শিক্ষার্থী শুনলে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার যুগল অনুভূতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ যে গত কয়েক দশকে–বিশেষ করে এই শতাব্দীর শুরু থেকে এই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে, তার কারণ, সম্মানের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ভয়। কিংবা বিরক্তি। বা দুটির মিশেলে তৈরি কোনো অনুভূতি।

বিরক্তি নিয়ে সমাজ আরও দেখেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে শিক্ষার্থীদেরও সিংহভাগ এর সুবিধা নেওয়ার বদলে এতে বুঁদ হয়ে আছে। যে সমাজ একটা সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রীষ্মকালীন বা শীতকালীন ছুটিতে শিক্ষার্থীকেও ফসলের ক্ষেতে হাত লাগাতে দেখেছে, গ্রামে বা শহরের কোনো বস্তিতে ক্ষুদ্র উদ্যোগে স্বাক্ষরতা বাড়ানোর মতো কাজ করতে দেখেছে, নিদেনপক্ষে কোনো ক্রিকেট-ফুটবল টুর্নামেন্ট কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে ব্যস্ত দেখেছে… এখন সেই সমাজই দেখে, ‘সোশ্যাল ওয়ার্কে’র বদলে শিক্ষার্থী ব্যস্ত ‘সোশ্যাল মিডিয়া ওয়ার্কে!’ ওতে সমাজের দুই পয়সার লাভ হয় না।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান। ফাইল ছবিসোশ্যাল মিডিয়া ওয়ার্কই-বা কেমন? বিজ্ঞানকে দূরে রেখে ক্রমেই আরও বেশি কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হতে থাকা এই সমাজে শিক্ষার্থীর বড় অংশ যখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রপাগান্ডাকেই নিজের ‘জানাশোনা’র উৎস হিসেবে বেছে নেয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় একই প্রপাগান্ডার বৃত্তে থাকা আরেকজনের সঙ্গে তখন শিক্ষার্থীর আর পার্থক্য তো থাকে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী যখন তিস্তায় বাঁধের বিপরীতে বাংলাদেশ অংশে আরেকটি বাঁধ নির্মাণের প্রপাগাণ্ডায় উচ্চকণ্ঠ সমর্থন জানায়, সমাজের আর দশজন ভাবে, ওতে আর আমাতে ইতরবিশেষ পার্থক্য নেই। ওই পার্থক্যটুকু না থাকলে আর শিক্ষার্থীর পেছনে নিজেদের করের অর্থ বিনিয়োগে সমাজের মানুষের আগ্রহী হওয়ার কারণ কি থাকে?

এর পেছনে দায় কার? শুধুই শিক্ষার্থীর, না সমাজেরও–এই প্রশ্নে যাওয়াই অমূলক। শিক্ষার্থী তো সমাজেরই অংশ! কিন্তু শিক্ষার্থী সমাজকে বদলানোর বদলে শিক্ষার সুযোগ পেয়েও যদি ঘুণে ধরা সমাজেরই অংশ হয়ে যায়, সমাজ তাকে তো আর আদর-আপ্যায়ন করে মোড়া পেতে বসতে দেবে না। শিক্ষার্থীও তখন ততটুকুই সমাজের অংশ, যতটুকু শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া আর দশজন। যাকে আলাদা সম্মান দেখাতে হয় না, চাই কি বিচারহীন হয়ে ওঠা ব্যবস্থায় বাগে পেলে গায়ে হাতও তোলা যায়! 

এখানে দায় আলাদা করে নির্ধারণ করা আর ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা একই।

লেখক: সাংবাদিক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]