ডানপন্থা কী, বামপন্থা কী, দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কোন কোন জায়গায়?
কদিন ধরে ফেসবুক-ইউটিউব ভরে গেছে এমন অনেক কন্টেন্টে। গত বছরের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় থেকে রাজনৈতিক চর্চা ও বিতর্কের বড় ক্ষেত্র বনে গেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। সেখানে এমন পোস্ট একেবারে অর্থহীন ধরে নেওয়ার সুযোগ তো নেই! কন্টেন্টগুলো দেখা যাচ্ছেও কোন সময়ে? যখন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটে’র ভূমিধস বিজয়ের কারণ ও প্রভাব নিয়ে শুরু হয়েছে নানামূখী বিশ্লেষণ।
ডাকসুতে শিবির কখনো নির্বাচনে নামতে পারেনি–অন্তত নামধাম জানান দিয়ে নয়। নির্বাচন পরের কথা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গত বছর পর্যন্ত তাদের প্রকাশ্য রাজনীতিই নিষিদ্ধ ছিল। সেই শিবির প্রথমবার ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ নামের প্যানেলকে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে ডাকসুতে নির্বাচনে নামল, জিতেও গেল! জয়ের ব্যবধানও কী বিশাল! পদের সংখ্যায় যেমন, তেমনি ভোটের হিসাবেও।
ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ডাকসুতে কেন্দ্রীয় সংসদের ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিই শিবির সমর্থিত প্যানেলের। এক ভিপি পদেই দ্বিতীয় হওয়া ছাত্রদল প্রার্থীর চেয়ে শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীর ভোট প্রায় ৯ হাজার বেশি!
শুধু ডাকসু-ইবা কেন! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ জাকসুতেও চিত্রটা একই। ভিপি না পেলেও ২৫ পদের মধ্যে ২১টি শিবির সমর্থিত প্যানেলের দখলে।
চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। তার মধ্যে এখনো চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন বাকি। ম্যাচের ‘হাফটাইম’ আর কী! তা প্রথমার্ধেই ছাত্রদল, বামপন্থী সংগঠন কিংবা বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের (বাগছাস) মতো প্যানেলগুলোর বিপক্ষে শিবিরের প্যানেল যেভাবে দাপট দেখিয়ে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল, সেটা কী ইঙ্গিত দেয়?
এটাই যে, দেশের অন্যতম প্রধান দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধর্মভিত্তিক ডানপন্থার রাজনীতিতেই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে নিয়েছে। একইসঙ্গে এ প্রশ্নও তুলে দেয় যে, নির্বাচন যতটা স্বতস্ফূর্ত হয়েছে, অন্তত ডাকসুতে, তাকে গণতান্ত্রিক রায় মেনে নিয়ে বাকিরা এ থেকে কি শিক্ষা নেবে? হেরে যাওয়া দলগুলো কি উষ্মা প্রকাশ আর অভিযোগের অক্ষম আস্ফালনেই হারিয়ে যাবে, নাকি যে সত্যিকারের গণতন্ত্রের দাবি নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান এসেছিল, তাকে সম্মান জানিয়ে মেধাভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতির পথে হাঁটবে?
ডাকসুতে পাঁচ বছর আগেই সর্বশেষ নির্বাচন হলেও সেটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। অনেকের চোখে ১৯৯০-৯১ সালের পর এবারই প্রথম সবার অংশগ্রহণে হলো ডাকসু নির্বাচন। জাকসুতে তো ১৯৯২ সালের পর আর নির্বাচনই হয়নি! এত বছর পর ‘স্বতস্ফূর্ত’ নির্বাচনের ফল আরও গুরুত্ব পায়, যখন সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনার প্রশ্নও এর সঙ্গে জুড়ে যায়।
গত ১৫ বছরে যে তিনটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো জয়ী পক্ষের বাইরে সম্ভবত কারও কাছে নিরপেক্ষ, অবাধ বা স্বচ্ছ কোনোটিই মনে হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আরেকটি জাতীয় নির্বাচন যখন মাস পাঁচেকের দূরত্বে–অন্তত সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারিত সময়রেখার হিসেবে তা-ই, আগের তিন নির্বাচনকে ভিত ধরে কোনো সম্ভাবনার বিশ্লেষণে যাওয়ায় তাই বড় ঝুঁকি থাকে। জাতীয় পর্যায়ে ১৫ আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রায় ৩০ বছরের স্বতস্ফূর্ত নির্বাচনহীন এই ‘ভ্যাকুয়াম’ থেকে মানুষের চাহিদা বা ইচ্ছার ধারণা কী দেখেই-বা নেবেন! তার ওপর মাঝের এই দেড় থেকে তিন দশকে যেখানে স্মার্টফোন-ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আর ফেসবুক-ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের বাড়বাড়ন্ত দাপট আগের অনেক হিসাবনিকাশই বদলে দিয়েছে। আপনি শহরে বসে ইউটিউবে যাঁর ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত বা প্ররোচিত হচ্ছেন, সেই ভিডিও তো এখন গ্রামের কোনো ব্যক্তিরও হাতের মুঠোয়।

বিশ্লেষণের ক্ষেত্র যখন এমন ধোঁয়াশায় পূর্ণ, সেখানে জাতীয় রাজনীতির বর্তমান ও আগামী দিনের ধারণা পেতে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে ‘আগমণ-বার্তাবাহী’ হিসেবে ধরে নেওয়াই যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটার সংখ্যা একটা ওয়ার্ডের ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম হতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রায় তরুণদের ভাবনা, তাদের চিন্তার ধরনের অনুচ্চারিত প্রকাশ। আর সে উচ্চারণ ধর্মভিত্তিক ডানপন্থার উত্থানের আওয়াজ দেয়।
আওয়াজটাকে আরও জোরালো মনে হবে, যখন চোখে পড়বে, জামায়াতের ছাত্র-উইং শিবির সমর্থিত প্যানেলের এমন দাপটের বিপরীতে জনবলে এগিয়ে থাকা বিএনপির ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ডাকসু ও জাকসু মিলিয়েও কোনো পদ পায়নি। প্রগতিশীলতার রাজনীতিকে আদর্শ মেনে চলা বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো ডাকসুতে একটা পদ পেয়েছে। এমনকি জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া পরিচিত মুখগুলোর বেশির ভাগেরই ঠিকানা এনসিপির সহযোগী ছাত্রসংগঠন বাগছাসেরও সম্বল শুধু জাকসুতে একটি পদ।
হ্যাঁ, নির্বাচন কেমন হয়েছে, স্বচ্ছ হয়েছে কি না–সেটা একটা বড় প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসছে। আসা অযৌক্তিকও নয়। দুই নির্বাচনে দ্বিচারিতার প্রশ্নই তো সামনে চলে আসে সবার আগে। ডাকসুতে শিবির সমর্থিত প্যানেলের জিএস প্রার্থীর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আদালতে গড়ানোয় যেখানে ডাকসু নির্বাচন স্থগিত হওয়া-না হওয়া নিয়েই দুই দিনব্যাপী নাটক হলো, সেখানে জাকসুতে হলো উল্টো! বামপন্থী ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থীর বৈধতা হঠাৎ করে বাতিল করে দেওয়ার পর তিনি যখন হাইকোর্টে আপিল করে বৈধতা ফেরত পেলেন, ‘সময়ের স্বল্পতা’কে কারণ দেখিয়ে তাঁকে ভোটে অংশই নিতে দেওয়া হলো না! দ্বিচারিতার প্রশ্ন না উঠে পারে?
অসঙ্গতির অভিযোগ এনে ছাত্রদল-বাম সংগঠনসহ পাঁচটি প্যানেলের জাকসু নির্বাচন বর্জন, নির্বাচন কমিশনের এক সদস্যের পদত্যাগ, ‘একটি দলকে জিতিয়ে আনতে কারসাজি করা হয়েছে’ বলে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পর্যবেক্ষণ, আর সব শেষে ভোট গুণতেই ৪০ ঘণ্টা লাগিয়ে দেওয়া…সব মিলিয়ে জাকসু নির্বাচনকেই স্বচ্ছ বলার সুযোগ থাকে না।
কিন্তু ডাকসুর ক্ষেত্রে কি তেমন বলা যায়? ভোট নেওয়া ও গণনার প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ সেখানেও উঠেছে বটে। বিএনপির দিক থেকে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টরদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু সেখানে ছাত্রদল-বাম সংগঠন-স্বতন্ত্র প্যানেল রায় নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তারা নির্বাচন বর্জন করেনি। শিক্ষক নেটওয়ার্কের পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু বিচ্যুতির কথা এলেও তাদের রায়–মোটাদাগে অসঙ্গতি ছিল না। আর দিন শেষে এসব অভিযোগের উল্টো দিকে যখন ভিপি-জিএস-এজিএস পদে বিজয়ীর সঙ্গে দ্বিতীয় হওয়া প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান দেখা যায় কয়েক হাজার, এরপর প্রমাণহীন অভিযোগগুলো সাধারণের চোখে হয়ে ওঠে ভিত্তিহীন। অভিযোগকারীদের জন্য তখন ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ হয়ে সামনে আসে জুলাই আন্দোলনের সময়ে ভাইরাল হওয়া শব্দগুলো–রিয়েলিটি মাইনে নাও।
সেটাই হয়তো এখন জরুরি তাদের জন্য। বাস্তবতার পাঠ বরং তাঁদের নজরটা অভিযোগের ফিরিস্তি থেকে সরিয়ে বিশ্লেষণে ফেরাবে। শিবির সমর্থিত প্যানেল কেন জিতেছে, অন্যরা কেন পারলেন না–এই বিশ্লেষণ পক্ষপাতহীন না হলে যে ভবিষ্যতে কী করতে হবে, সেটাই বোঝা সম্ভব হবে না তাদের পক্ষে!

শিবির কেন জিতেছে? উত্তরটা নির্ভর করছে কে কোন পক্ষ থেকে দেখছেন তার ওপর। ছাত্রদল ও বামপন্থী শক্তিগুলো গত আগস্টের পর থেকে ‘ছাত্ররাজনীতিহীন’ ক্যাম্পাস শিবিরের নিয়ন্ত্রণে বলে অভিযোগ করেছে। ছাত্রদলের অভিযোগ, তারা ক্যাম্পাসেই ঢুকতে পারেনি। এর আগের ১৫ বছরেও ছাত্রদল যেখানে ক্যাম্পাসে ঢোকার সুযোগ পায়নি, বামপন্থীরা যেখানে সে সময়ের সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে ছাত্রলীগের কর্মীদের রোষের শিকার হয়েছে, সেখানে শিবির ছাত্রলীগের ভেতরে ঢুকে ‘গুপ্ত’ রাজনীতি চালিয়ে ক্যাম্পাস ও আশপাশের ছাত্রাবাস মিলিয়ে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম গুছিয়েছে বলে অভিযোগ বাকিদের। ফেসবুকে শিবিরের ‘বট’ অ্যাকাউন্ট থেকে আক্রমণের অভিযোগ এসেছে এন্তার। ভোটের পেছনে শিবির কত টাকা খরচ করেছে, এ নিয়ে নানা বয়ানও শোনা যায়, এবং কোনো বয়ানেই অঙ্কটা কয়েক কোটির নিচে নয়।
কিন্তু দিন শেষে সেসবও তো ঘুরেফিরে সেই অভিযোগই। সেসবের প্রমাণ কাগজে-কলমে পাওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা সীমিত। আর হেরে যাওয়া পক্ষের প্রমাণহীন অভিযোগে কান পাতার দায় কারও থাকে না, তা অভিযোগগুলো সত্যিই হোক বা মিথ্যা।
পরিপ্রেক্ষিত বাদ দিয়ে শুধু নির্বাচনের বিশ্লেষণে শিবিরের জয়ের পেছনের বড় কারণগুলো বরং ভিন্ন হয়ে দেখা দেয়। বিশ্লেষণ বলে, শিবির এ নির্বাচন নিয়ে পরিকল্পনা করেছে জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজও করেছে। তারা শিক্ষার্থীদের কাছে গেছে, তাদের সমস্যা শুনেছে, তাদের নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। শিবিরের প্রার্থী কারা হবেন, সেটাও ঠিক হয়ে ছিল এক বছর আগে থেকেই। অন্যদিকে ছাত্রদল বা বামপন্থী সংগঠনগুলোর প্রার্থী কে হবে, প্যানেল কেমন হবে, সে নিয়ে তোড়জোরই শুরু হয়েছে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর। প্রার্থী নির্বাচনেও অন্যদের বড় ব্যবধানে টেক্কা দিয়েছে শিবির। জুলাই আন্দোলনে পর্দার আড়ালে থাকলেও শেষ পর্যন্ত অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ স্বীকৃতি পাওয়া সাদিক কায়েম যখন হয়ে যান শিবিরের ভিপি প্রার্থী, আন্দোলনের আবেগ তো শিক্ষার্থীদের শিবিরের দিকেই টানবে!
তাহলে বাগছাসের দিকে কেন টানল না? প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। তারাও তো জুলাই আন্দোলনের মুখগুলোকে নিয়ে গড়া এনসিপির সহযোগী সংগঠন। তারা কেন কিছুই পেলেন না ডাকসুতে? উত্তরটা গত এক বছরের কার্যক্রমে চোখ রাখলেই পাওয়া যায়। নতুন দিনের রাজনীতির ডাক দিয়েও এনসিপি জাতীয় পর্যায়ে ঘুরেফিরে পুরোনো দিনের পেশি আর অর্থের শক্তির রাজনীতি করেছে। দুর্নীতি-মব-চাঁদাবাজিতে এনসিপি আর বাগছাসের নেতাদের নাম এসেছে। তার প্রভাব পড়েছে ডাকসুর ভোটে।
ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। একদিকে গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএনপির-ছাত্রদলের চাঁদাবাজির অভিযোগ এসেছে, অন্যদিকে গত ১৫ বছরে ছাত্রলীগ বা তার আগের কয়েক বছরে ছাত্রদলের সময়ে হলগুলোর পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তো ছিলই। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই দিন কেটেছে এবারের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রার্থীদের। বিপরীতে শিবিরের প্রার্থীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রচারণার সুর ছিল একই–তাঁরা মেধাবী, তাঁদের ফলাফল ভালো, আচার-আচরণ নিয়েও প্রশ্ন ছিল না।
প্রচারণার ধরনে তো বাকিরাই পুরোটা সময়ে শিবিরকে করে রেখেছে প্রাসঙ্গিক! ছাত্রদল, বামপন্থী সংগঠনগুলো মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্ন এনে শিবিরকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছে, বাগছাস তাদের প্রচারণায় সামনে এনেছে জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে। কিন্তু চেতনা তো ধারণ করার ব্যাপার, কাজে সেটা প্রমাণের দায় থাকে। কথার তুবড়ি ফোটানো বা অন্যকে ঘায়েল করা তো চেতনার কাজ নয়। শিবির যখন নিজেদের এত বছরের জুলুমের শিকার দাবি করে সহানুভূতি কুড়িয়েছে, তাদের প্রার্থীদের ‘গুড ইমেজ’ যখন সহানুভূতির মাত্রা বাড়িয়েছে, সে সময়ে বাকিদের দিক থেকে ‘নেগেটিভ মার্কেটিং’ আদতে শিবিরের ‘মার্কেটিং’ই করেছে।
নিজেদের প্যানেলে বেশ কজন নারী প্রার্থী, একজন আদিবাসী প্রার্থী রেখেও শিবির ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা প্রয়োজনে উদারপন্থাও দেখাতে পারে। সেটা শুধুই ভোটে জেতার উদ্দেশ্যে ‘ইমেজ’ তৈরির স্বার্থে সাময়িক প্রদর্শনী, নাকি তাদের আগামী দিনের রাজনীতিও এমনই হবে, সেটা সময় বলবে। এতদিন জুলুমের শিকার বলে পরিচয় দেওয়া শিবিরের চেহারা ক্ষমতা পাওয়ার পর কেমন হয়, সে দিকেও নজর থাকবে সবার। এরই মধ্যে ছাত্রীদের জন্য স্যানিটারি প্যাডের ভেন্ডিং মেশিন আর হলে পানি শোধনের যন্ত্র বসানোর মতো কিছু কাজ নিয়ে প্রশংসা-সমালোচনা দুটিই কুড়াচ্ছে তারা। কাজগুলো কত ভালো, কতটা প্রয়োজন–এ নিয়ে তো কারওই সন্দেহ নেই। কিন্তু ছাত্রপ্রতিনিধি হিসেবে তারা নিজেরাই এসব করে তদনগদ হাততালি পাওয়ার ‘পপুলিস্ট’ পথে হাঁটবে, প্রশাসনের বিপরীতে আরেকটি ‘প্যারালাল প্রশাসন’ চালু করবে, নাকি এসব কাজের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রশাসনকে এসব কাজে বাধ্য করবে, সে নিয়ে প্রশ্ন ওঠারই কথা।

প্রশ্ন উঠুক, বিতর্ক চলুক। সেসব গণতন্ত্রেরই প্রয়োজন। তার আগে আপাতত এটাই সত্যি যে, শিবির হাতের সামনে আসা সুযোগটা শতভাগ কাজে লাগিয়েছে, এবং সে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা তাদের ছিল।
কিন্তু ডাকসুর ইতিহাস বদলে দিয়ে শিবিরের বিজয়ে ধর্মভিত্তিক ডানপন্থার উত্থানের শঙ্কা দেখা ছাত্রদল বা প্রগতিশীলরা কী করবে? তারা শুধু শিবির কী করে সেটাই দেখবে, কোনো ভুল করলে তা নিয়ে বিতর্কেই ব্যস্ত থাকবে? নাকি তাদের মেধাভিত্তিক রাজনীতির যে শূন্যতা শিবির চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, সে অনুযায়ী করণীয় ঠিক করবে?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস পেশিশক্তির জোরের ইতিহাস, টাকার জোরের ইতিহাস। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ যুগে, ‘জেন-জি’র প্রশ্ন করার ক্ষমতা ও দক্ষতার প্রদর্শনী রাখা জুলাই আন্দোলনের পরের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুধু পেশি বা অর্থের জোরের রাজনীতিতে সুবিধাভোগী ছাড়া কাউকে চুপ রাখা সম্ভবত কঠিনই হবে। অর্থ বা পেশিশক্তির প্রয়োগ হয়ে থাকলেও সেটা পর্দার আড়ালে রেখে ডাকসুতে শিবির বাজিমাত করেছে মেধাবীদের সামনে রেখে, মেধার রাজনীতিকে বিজ্ঞাপন বানিয়ে। তাতে ধর্মভিত্তিক ডানপন্থার উত্থান ঘটে থাকলে ‘রিয়েলিটি’ এটাই যে, এটাই গণতান্ত্রিক রায়। বাকিরা এই রাজনীতির টেক্কা দিতে পারেনি, সেটা তাদের দায়।
সামনের দিনেও নিজেদের রাজনীতিতে শাণ দিতে না পারলে তাতে তাদেরই ক্ষতি–তাদের আওয়াজে বা যুক্তিতে জোর কিংবা সমর্থন কোনোটাই থাকবে না। শিক্ষার্থীদেরও ক্ষতি, শিবিরের বাইরে তাদের হয়ে কথা বলার মতো শক্তি থাকবে না। মজার ব্যাপার কী, এতে শিবিরেরও ক্ষতি! গত পনেরো বছরে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন আর এতে বিজয়ী দলের সর্বশেষ পরিণতিই সে ইঙ্গিত দেয়।
ক্ষমতাসীন পক্ষ–সে ডানপন্থীই হোক বা বামপন্থী কিংবা মধ্যপন্থী, তার সঙ্গে বিরোধীপক্ষের বিতর্ক শক্তিশালী না হলে আর গণতন্ত্র কীসের!
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



