সারসংক্ষেপ
এই প্রতিবেদনটি সম্প্রতি কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই দাবির জবাব, যেখানে বলা হয়েছে যে, ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ভারত ও অন্যান্য দেশের মেট্রো প্রকল্পের তুলনায় অতিরিক্ত বেশি। এই প্রতিবেদনটি প্রকল্প ব্যয়ের প্রকৃত প্রযুক্তিগত, নগর ও আর্থিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে এবং প্রমাণ করে যে ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় নির্মিত পাতাল মেট্রো প্রকল্পগুলোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে ঢাকা এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয় সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রতি কিলোমিটার ব্যয় তুলনার মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা বিভ্রান্তিকর। কারণ এতে পাতাল অংশের অনুপাত, প্রকৌশলগত জটিলতা ও ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষা করা হয়। বর্তমান ব্যয় আন্তর্জাতিক নির্মাণ ব্যয় স্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং প্রকল্পটি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলা উচিত।
১. ভিন্ন প্রকল্পের ভুল ব্যয় তুলনা
প্রতিবেদনটি ভুলভাবে ঢাকা এমআরটি লাইন-১— যার একটি বড় অংশ পাতাল— এর সঙ্গে ভারতের বা উপসাগরীয় দেশের মূলত উড়াল বা স্থলভিত্তিক মেট্রোর তুলনা করেছে। বিশ্বব্যাপী পাতাল মেট্রো লাইনের ব্যয় উড়াল লাইনের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
উদাহরণস্বরূপ, দিল্লি মেট্রোর ফেজ-৩ এর পাতাল অংশের ব্যয় ছিল প্রতি কিলোমিটারে ১৮০–২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ঢাকার সঙ্গে তুলনীয়। তাই ‘পাঁচ গুণ বেশি’ এমন দাবি প্রকৌশলগতভাবে ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
২. অত্যন্ত জটিল নগর ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থা
ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরী (≈ ৪৭,০০০ জন/বর্গকিমি)। এমন পরিবেশে নির্মাণ কাজ পরিচালনা করতে জটিল যানবাহন ডাইভারশন, ইউটিলিটি স্থানান্তর, ভূমি পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। শহরটির নরম পলিমাটি এবং হাই ওয়াটার টেবিল (High Water Table) টানেল নির্মাণকে ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন করে তোলে। ফলে ধারাবাহিক মাটির উন্নয়ন ও জলরোধী ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা পাটনা বা পুনের মতো শহরে তেমনভাবে প্রযোজ্য নয়।
৩. উন্নত নকশা ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন
ঢাকা এমআরটি লাইন-১ (৩১ কিলোমিটার, ২১ স্টেশন) এর মধ্যে ১৬.৩২ কিলোমিটার পাতাল (এয়ারপোর্ট–কমলাপুর) এবং ১১.৪ কিলোমিটার উড়াল (নতুন বাজার–পূর্বাচল) অংশ অন্তর্ভুক্ত। এতে গভীর ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন, সরাসরি বিমানবন্দর সংযোগ, সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত সিবিটিসি (CBTC) সিগন্যালিং ব্যবস্থা রয়েছে, যা আঞ্চলিক মেট্রোগুলোর তুলনায় অধিক আধুনিক। নতুন বাজার স্টেশনটি ৬০০ মিটারেরও বেশি দীর্ঘ, যা পাতাল ও উড়াল লাইনের সংযোগ বিন্দু। এ ধরনের স্টেশনের নির্মাণ ব্যয় সাধারণ পাতাল স্টেশনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
৪. উপেক্ষিত আর্থিক ও ক্রয় প্রক্রিয়াগত প্রেক্ষাপট
ভারতের মেট্রো প্রকল্পগুলো প্রায়শই রাজ্য সরকার-সহায়িত ভূমি, দেশীয় ঠিকাদার ও কর-ছাড় সুবিধা পায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশে জাইকা (JICA)-অর্থায়িত প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক এফআইডিআইসি (FIDIC) মান, জাপানি শিল্পমান (JIS), এবং কঠোর নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করে। ফলে প্রাথমিক মূলধন ব্যয় বেশি হলেও প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হয়।
ভারতে অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ও পণ্য স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়, যেখানে ঢাকার এমআরটি প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক মান পূরণকারী দেশ থেকে এসব উপকরণ আমদানি করা হয়। তাই এই ব্যয়ের তুলনা করলেই বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয় না।
৫. জাইকা টেন্ডারিং প্রতিযোগিতামূলক, একচেটিয়া নয়
এটা ভুল ধারণা যে জাইকা-অর্থায়িত প্রকল্পে শুধু জাপানি ঠিকাদার অংশ নিতে পারে। জাইকা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র (ICB) বাধ্যতামূলক করে, যা বিশ্বব্যাপী যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উন্মুক্ত। ঢাকা এমআরটি প্রকল্পের প্রি-কোয়ালিফিকেশন (PQ) পর্যায়ে চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, ইতালি, তুরস্ক, কোরিয়া ও জাপানের বহু প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কঠোর প্রযুক্তিগত, নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞতা মানদণ্ডের কারণে ভূগর্ভস্থ অংশে কেবল অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা অর্জন করে— যাদের মধ্যে জাপানি কোম্পানিগুলো শীর্ষে ছিল। তবে উঁচু অংশে PQ ধাপে বিভিন্ন দেশের ঠিকাদার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই ‘শুধু জাপানি প্রতিষ্ঠানই অংশ নিতে পারে’ এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। জাইকা স্থানীয় সক্ষমতা গঠনে যৌথ উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
৬. দীর্ঘমেয়াদি মূল্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব
এমআরটি লাইন-১ এর নকশা আয়ু ১০০ বছর, যা নিরাপদ, নিম্ন-নিঃসরণ পরিবহন সুবিধা প্রদান করবে। প্রকল্পটি যানজট, বায়ুদূষণ ও যাতায়াত সময় কমিয়ে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখবে।
৭. বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কারণ ও ব্যয় বৃদ্ধি
২০১৯ সালে প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ৬.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৮ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। এটি কোনো স্থানীয় অদক্ষতা নয়— বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশ্বব্যাপী মহামারি-পরবর্তী মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্ন ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে অবকাঠামো ব্যয় ৩০–৬০% পর্যন্ত বেড়েছে (বিশ্বব্যাংক, ২০২৩; আইএমএফ, ২০২৪)। স্টিল, সিমেন্ট, তামা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে গেছে, এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ ২০২১–২২ সালে ৩০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় (UNCTAD, ২০২২; Bloomberg Index, ২০২৩)।
বাংলাদেশি টাকার মান ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ২৮% অবমূল্যায়িত হয়েছে (বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২৪)। একই সময়ে জাপানি ইয়েন ও ইউরোর অস্থিরতা আমদানিকৃত সরঞ্জামের খরচ ও অর্থায়ন ব্যয়কে প্রভাবিত করেছে। রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাত-পরবর্তী জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিও নির্মাণ উপকরণের খরচ বাড়িয়ে দেয় (IEA, ২০২৩)। ২০১৯ সালের পর বন্যা প্রতিরোধ, ভূমিকম্প সহনশীলতা, বায়ু চলাচল ও অগ্নি নিরাপত্তা উন্নয়নের মতো নকশা ও নিরাপত্তা উন্নতি যুক্ত হওয়ায় ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব আপডেট এফআইডিআইসি ২০১৭ (FIDIC 2017) ও জেআইএস (JIS) মানদণ্ড অনুযায়ী করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অনুরূপ প্রকল্পেও একই প্রবণতা দেখা গেছে: জাকার্তা এমআরটি ফেজ ২ (+২৩%), ব্যাংকক অরেঞ্জ লাইন (+১৮%), মুম্বাই মেট্রো লাইন ৩ (+২৫%), এবং লন্ডন ক্রসরেইল (+২৯%)। তাই ঢাকার ব্যয়বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী ধারা অনুযায়ীই হয়েছে।
৮. উপসংহার
ঢাকা এমআরটি লাইন-১ এশিয়ার অন্যতম চ্যালেঞ্জপূর্ণ নগর ও ভূতাত্ত্বিক পরিবেশে নির্মিত একটি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও নিরাপত্তা-সমৃদ্ধ প্রকল্প। এর ব্যয় কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। PQ ধাপে বিভিন্ন দেশের ঠিকাদার অংশগ্রহণ করেছে, যা এর উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া নির্দেশ করে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির ব্যয় যৌক্তিক ও ন্যায্য। তাই এটি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া অত্যাবশ্যক, যাতে বাংলাদেশের জনগণের জন্য টেকসই, আধুনিক ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়।
তথ্যসূত্র
১.বিশ্বব্যাংক, Global Economic Prospects, জুন ২০২৩
২. IMF, World Economic Outlook: Recovery Amid Inflation, এপ্রিল ২০২৪
৩. UNCTAD, Review of Maritime Transport 2022
৪. Bloomberg Commodity Index, Global Construction Material Price Index 2023
৫. বাংলাদেশ ব্যাংক, Annual Report 2024
৬. আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA), World Energy Outlook 2023
৭. FIDIC (2017), Conditions of Contract for Underground Works (Emerald Book)
৮. JISC, JIS A 5308 & A 5373
৯. Jakarta Post (2023), “Phase 2 MRT Costs Revised After Post-COVID Adjustments.”
১০. Bangkok Post (2023), “Orange Line Metro Contract Adjusted for Material Price Surge.”
১১. Times of India (2024), “Mumbai Metro Line 3 Sees 25% Cost Escalation.”
১২. UK National Audit Office (2023), Crossrail Cost Review Report.
লেখক: সাবেক প্রজেক্ট ডিরক্টর, ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট (এমআরটি লাইন–১)