এটি শুধু একটি জানাজা ছিল না; এটি ছিল ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক নীরব অথচ বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা। খালেদা জিয়া শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি একটি সময়, একটি সংগ্রাম এবং একটি রাজনৈতিক দর্শন। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা পরিণত হয়েছিল এক আবেগঘন জনপ্লাবনে। লাখো মানুষের স্মরণকালের সর্বোচ্চ সমাগম জানিয়ে দিয়েছে—ক্ষমতার শীর্ষে থাকুক বা কারাগারের নিঃসঙ্গ কক্ষে, এই নেত্রী কখনো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হননি।
জানাজার ময়দানেই লেখা হলো রাজনীতির অমোঘ পাঠ
জানাজার ময়দানে রাজনীতির অমোঘ পাঠ রাষ্ট্রীয় আয়োজনের চেয়েও বড় ছিল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। বৃদ্ধ, তরুণ, নারী এমনকি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা মানুষও এসেছিলেন শেষ বিদায় জানাতে। অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু। কারণ, এই বিদায় কেবল একজন ব্যক্তির নয়, এটি ছিল একটি আপসহীন রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। কোনো রাজনৈতিক আহ্বানে নয়, মানুষ এসেছে ভালোবাসার টানে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিরোধিতা, নিপীড়ন ও কারাবাস সয়েছেন, কিন্তু হারাননি মানুষের হৃদয়ের জায়গা।
আপস করেননি বলেই তিনি অপরাজিত
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের। যিনি ক্ষমতার মোহে নতি স্বীকার করেননি। ৮০-র দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার—সবখানেই তিনি ছিলেন অনমনীয়। দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা তাঁকে শারীরিকভাবে দুর্বল করলেও মানসিকভাবে নত করতে পারেনি। তাঁর জানাজায় মানুষের এই ঢল প্রমাণ করল—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা স্থায়ী।
জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রা এক গভীর প্রতীক
খালেদা জিয়ার চিরনিদ্রা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে—এটি কেবল পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর প্রতীক। একজন রাষ্ট্রনায়ক যিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি রেখেছিলেন, আর অন্যজন সেই গণতন্ত্র রক্ষায় লড়েছেন জীবনভর। এই পাশাপাশি শায়িত হওয়া যেন সংগ্রামের এক অবিচ্ছিন্ন উত্তরাধিকারের বার্তা দিয়ে গেল।
এই জানাজা কি কেবল বিদায়, নাকি ভবিষ্যতের ইশারা? খালেদা জিয়ার শূন্যতা কি শুধু বিএনপির, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতির? আপসনির্ভর, সুবিধাবাদী ও নীরব রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার মতো অদম্য নেতৃত্বের অভাব কি আরও প্রকট হয়ে উঠবে না?
শেষ সত্য
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে একজন মানুষ বিদায় নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর জানাজায় প্রমাণ হয়েছে তিনি হারিয়ে যাননি। লাখো মানুষের চোখের জল আর নিঃশব্দ প্রার্থনার ভিড়ে উচ্চারিত হয়েছে একটাই ধ্রুব সত্য—আপসহীন নেত্রী মরে না, তিনি ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকেন।
লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]