‘সুলতানা’ বিদায় নিলেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বেঁচে থাকবে প্রজন্মের মাঝে 

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের ইতি ঘটল। মানুষের প্রতি তাঁর বিশ্বাস, ভালোবাসা বহু বছর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হবে। 

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম

নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৯০৫ সালে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে একটি কালজয়ী উপন্যাস লিখেছিলেন। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সেই গ্রন্থে পুরুষের সহায়তা ছাড়াই নারীদের দ্বারা শাসিত এক ভূখণ্ডের গল্প বলা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উপন্যাসটি প্রকাশের ৮৬ বছর পর বেগম রোকেয়ার (১৮৮০-১৯৩২) স্বদেশে একজন ‘সুলতানা’ বা নারী শাসকের অভিষেক ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হয়তো এভাবেই বাস্তবে রূপ নেয় বেগম রোকেয়ার সেই স্বপ্ন।

দেশপ্রেমিক এই ‘সুলতানা’র জন্ম ১৯৪৫ সালে। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনের অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ৮০ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোরে তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন। তিনি বিদায় নিলেও রেখে গেছেন তাঁর অসামান্য অবদান ও কীর্তি, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবে।

খালেদা জিয়ার এই সফলতা ভাগ্যনির্ধারিত ছিল না; বরং তা অর্জিত হয়েছে বহু বছরের সংগ্রাম এবং মাতৃভূমির মানুষের প্রতি অবিচল ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। তিনি ছিলেন এমন এক নারী, যাঁর দৃঢ়তা প্রতিটি পরীক্ষায় আরও শাণিত হয়েছে। যেখানে অন্যরা হোঁচট খেয়েছে, সেখানে তিনি মানিয়ে নিয়েছেন; যেখানে অন্যরা ভীত হয়েছে, সেখানে তিনি সাহসের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন।

স্বামী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া। ফাইল ছবিতাঁর পারিবারিক নাম খালেদা খানম, ডাকনাম পুতুল। ১৯৬০ সালে তরুণ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। জিয়াউর রহমান ১৯৬৫ সালের ভারতের বিপক্ষে যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সরাসরি লড়াইয়ে নামেন। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে খালেদা জিয়ার জীবনে এক বড় বিপর্যয় নেমে আসে।

যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যক্তিজীবনের এই গভীর বেদনা খালেদা জিয়াকে মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ় করে তোলে। এই দৃঢ়তাই তাঁকে পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন নেতৃত্ব দিতে ও কর্তৃত্ববাদকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সাহায্য করে। ১৯৮২ সালে দলের হাল ধরার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তাঁর অনড় নেতৃত্ব তাঁকে দেশবাসীর কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৯৬ (স্বল্প মেয়াদে) এবং ২০০১ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেসব আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তার একটিতেও কখনো পরাজিত হননি।

২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে পরবর্তী দীর্ঘ সময় তাঁকে চরম প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলায় কারাবরণ করতে হলেও তিনি মাথা নত করেননি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে এসব মামলা থেকে খালাস দেন এবং মামলাগুলোকে ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন।

খালেদা জিয়ার জানাজায় লাখো মানুষের ঢল। ছবি: বিএনপিবাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব ছিল এক বৈপ্লবিক অর্জন। তিনি দীর্ঘদিনের ‘অদৃশ্য দেয়াল’ ভেঙে নারীর ক্ষমতায়নকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর শাসনামলে নারী শিক্ষা প্রসারে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের উপবৃত্তি এবং ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’র মতো যুগান্তকারী কর্মসূচি চালু হয়।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে প্রথম ‘ভ্যাট’ বা মূল্য সংযোজন কর প্রবর্তিত হয় এবং উন্নয়ন বাজেটে দেশীয় সম্পদের অংশ ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং সার্ক-এর চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বিরূপ সমালোচনা কিংবা রাজনৈতিক অশালীন মন্তব্যের মুখেও খালেদা জিয়া সবসময় ধৈর্য ও মার্জিত আচরণ বজায় রেখেছেন। তাঁর সৌম্য ও শান্ত অবয়ব তাঁকে শালীনতার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি দলীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের এক অবিসংবাদিত প্রতীকে পরিণত হন।

তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্য দিয়ে আজ দেশবাসী তাঁকে স্মরণ করছে। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের ইতি টানল। তাঁর দেশপ্রেম ও আদর্শের প্রতিধ্বনি শোনা যাবে আগামীর বহু প্রজন্ম পর্যন্ত।

(নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

টাইমলাইন: খালেদা জিয়ার প্রয়াণ
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ২১:০৯
‘সুলতানা’ বিদায় নিলেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বেঁচে থাকবে প্রজন্মের মাঝে 
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:২৪
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:১৯
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে এবার আপনিও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন—এটি মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত এবং পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। জীবনের...
এটি শুধু একটি জানাজা ছিল না; এটি ছিল ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক নীরব অথচ বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা। খালেদা জিয়া শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি একটি সময়, একটি সংগ্রাম এবং একটি রাজনৈতিক দর্শন।...
তিনবার প্রধানমন্ত্রী। কখনও নির্বাচনে পরাজিত নন। দেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান। কিন্তু এই পরিচয়গুলোও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণতা প্রকাশ করে না। খালেদা জিয়া ছিলেন মূলত এক নীতির নাম, আপসহীনতার রাজনীতি।
১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে একটি বড় ও অভূতপূর্ব ঘটনা। তবে এই ফিরে আসাকে শুধু আবেগ, জনসমাগম কিংবা দলীয় উচ্ছ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে...
মশার উপদ্রব, অবৈধ স্থাপনা ও জলাবদ্ধতাসহ ১০টি বিষয়ে অভিযোগ জানাতে ও নাগরিক সুবিধা দিতে চালু হয়েছে আমাদের চট্টগ্রাম নামের অ্যাপস। শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আনুষ্ঠানিকভাবে...
মৌলভীবাজারে ৯৯৬ কোটি টাকার মনু নদী সংরক্ষণ প্রকল্প চললেও রাজনগরে অব্যাহত নদীভাঙন। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত ২০ গ্রাম, দুর্ভোগে ৫০ হাজার মানুষ।
মানুষের প্রত্যাশা পুরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। শনিবার বিকেলে সরকারের পাঁচ মাস পূর্তি...
রাজধানীতে অতিরিক্ত হর্ন নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চালু হবে নতুন ট্রাফিক লাইট ও দূষণবিরোধী ব্যবস্থা।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর