বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ কৃষিশুমারি অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১.৬৯ কোটি পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং এই খাতের অবদান মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৪ শতাংশ। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা ও গ্রামীণ আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কৃষি খাত অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
এই বাস্তবতায় ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ কেবল স্লোগান নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির এটিই বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— সমাজ বা রাষ্ট্র কি কৃষকের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতে পেরেছে? কৃষি ঋণ বিতরণ ও প্রয়োজনে ঋণ মওকুফ করাই কি তাঁদের জন্য যথেষ্ট?
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর কৃষি ও পল্লী ঋণের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণের জন্য মোট ৩৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এ বছর বরাদ্দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৬০.৩৩ শতাংশ) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে, যা টাকার অংকে ২৩ হাজার ৫২৭ কোটি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬.২১% (১০,২২৩ কোটি টাকা) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে।
এছাড়া সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংককে ৯.৩৮% এবং বিদেশি ব্যাংককে ৪.০৮% বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে ৩৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৯৮.২২% অর্থাৎ ৩৭,৩২৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হয়েছিল। তখনও প্রায় ৬৩% বরাদ্দ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান সরকারের কৃষি খাতে চলমান সংস্কার ও সহায়তা কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে, পাইলটিং পদ্ধতিতে উদ্যোগ গ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় পাইলটিং একটি পরীক্ষিত কৌশল, কেননা সীমিত পরিসরে বাস্তবায়ন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন, সমস্যা ও ঘাটতি চিহ্নিতকরণ এবং প্রভাব মূল্যায়নের মাধ্যমে নীতিকে পরিমার্জন করে তবেই তা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, মোট ঋণের ৫৫% শস্য-ফসল খাতে, ১৩% মৎস্য খাতে, ২০% প্রাণিসম্পদ খাতে, ২% সেচ ও কৃষিযন্ত্রপাতিতে এবং বাকি ১০% কৃষি উপকরণ ও পল্লী অঞ্চলের অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিতরণ করার নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া মসলা, ডাল ও তৈলবীজ জাতীয় ও ভুট্টা ফসলের উৎপাদন বাড়াতে ৪% সুদে বিশেষ প্রণোদনা ঋণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নীতিমালায় মাঠপর্যায়ের ফসল উৎপাদন মৌসুম, প্রকৃত চাহিদা যাচাই এবং খাতভিত্তিক অর্থায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া নির্দেশনামতে, বেসরকারি ব্যাংকের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের অন্তত ৫০% ব্যাংকগুলোকে তাদের নিজস্ব শাখা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিতরণ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো– গ্রামীণ এলাকায় বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের শাখার সংখ্যা খুব কম। তারা সাধারণত এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করে, যা ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষী ও নারী কৃষকদের জন্য সহজলভ্য নয়। এছাড়া কাগজপত্র, ভূমির মালিকানা ও জামানতের শর্তের কারণে তারা অযোগ্য হয়ে পড়েন। ফলে নীতিগত অগ্রাধিকার থাকা সত্ত্বেও অনেক কৃষক বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। তারা বাধ্য হয়ে বেসরকারি সংস্থা বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন, যেখানে সুদের হার তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পরিমাণ ২০২৪ সালের জুনে ছিল ২.১১ লাখ কোটি টাকা, যা বেড়ে এখন ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা হয়েছে। একই সময়ে এই হার ১৭.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৬.৩ শতাংশ হয়েছে। এই ঋণের খেলাপি হার ব্যাংকভেদে ভিন্ন। সাধারণত রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলক বেশি, আর বেসরকারি ব্যাংকে তুলনামূলক কম থাকে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ৪৬.৪% ও ৩৮.৯ %।
অপরদিকে, বেসরকারি ব্যাংকের গড় হার ৩৪.৭% হলেও ইসলামী ব্যাংকের হার ৫৮%। অথচ বিদেশি ব্যাংকের নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) অনুপাত ৬.৪%। এনপিএল–এর অনুপাত বেশি হওয়ার অর্থ হচ্ছে ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, ঋণগ্রহীতার পরিশোধ অপারগতা বা সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি।
প্রশ্ন হলো– এই ঋণগ্রহীতা কারা? অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে ভাগ করলে দেখা যায়, শিল্প (৪৪%), ব্যবসা ও বাণিজ্য (৩৩%), ভোক্তা (৯%), নির্মাণ খাত (৭%), কৃষি সংশ্লিষ্ট (৪%) ও অন্যান্য (৩%)। এ থেকে বুঝা যায় কাদের খেলাপি ঋণের হার বেশি? আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, প্রায় ৬১ লাখ গ্রাহক কৃষি-সংশ্লিষ্ট খাতে ঋণগ্রহণ করেছেন। কিন্তু এ সকল ঋণগ্রহীতা যে প্রকৃতপক্ষে কৃষির সঙ্গে জড়িত, তা কিন্তু নিশ্চিত নয়। তাদের অনেকে হয়তো শুধু ঋণ পাওয়ার জন্য কৃষক হিসেবে নিজেদের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। কাজেই খেলাপি ঋণের অনুপাত বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদুপরি, কৃষিখাতে খেলাপি ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা বাড়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো––
১. অতীতে বিভিন্ন সময়ে কৃষি ঋণ মওকুফের নজির রয়েছে। ফলে কিছু কৃষকের মধ্যে ‘ঋণ পরিশোধ না করলেও একসময় মওকুফ হবে’— এমন মানসিকতা কাজ করে থাকে।
২. অনেক সময় ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে পুরোপুরি ব্যয় হয় না, অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উৎপাদন ব্যর্থতার কারণে প্রত্যাশিত মুনাফা আসে না। ফলে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়।
৩. উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকের নগদ-প্রবাহ সংকট তৈরি করে। ফলে ঋণ শোধের সক্ষমতা কমে যায়।
সার্বিক বিবেচনায়, বর্তমান সরকার ১২ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফের উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেবে। তবে যারা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে, বিশেষ করে প্রান্তিক, বর্গাচাষি ও নারী কৃষক— তারা এই সুবিধা না পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। আবার যারা কৃষক না হয়েও কৃষি ঋণের সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তারা দ্বিগুণ সুবিধা ভোগ করবেন। ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক লক্ষ্য অর্জনে, তথ্যভিত্তিক যাচাই করে পুনঃতালিকা প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটি করতে না পারলে ঋণ মওকুফের সুফল প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানো যাবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ঋণ মওকুফের পর কৃষকরা কি নতুন উদ্যমে বিনিয়োগ করবেন? আসলে কৃষিতে বিনিয়োগ করে লাভের নিশ্চয়তা না থাকলে নতুনভাবে বিনিয়োগে আগ্রহী হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে ‘কৃষক কার্ড’। এটি সঠিকভাবে বিতরণ ও কার্যকর করা হলে কৃষকের ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
প্রথমত, কৃষকের এই আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র তাকে দিবে সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মান। কৃষকেরা অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলেও সত্যিকার অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে যুগ-যুগ ধরে অবহেলিত। কাজেই সরকার প্রদত্ত এই কার্ড কৃষকের মর্যাদার প্রতীক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।
দ্বিতীয়ত, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি ও উৎপাদিত পণ্য বিপণন। কৃষকেরা কার্ড দেখিয়ে বাজার থেকে সরাসরি সার, বীজ, ডিজেল, কীটনাশক ইত্যাদি ভর্তুকিযুক্ত দামে কেনার সুযোগ পাবেন। এছাড়া ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন থাকার ফলে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সরকারি শস্য সংগ্রহ কার্যক্রমে ন্যায্যমূল্যে বিক্রয় করতে পারবেন। তবে এর সফলতা তখনই পাওয়া যাবে, যখন কার্ডটি প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছানো হবে।
একইসঙ্গে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষী ও নারী কৃষকদের কার্ড প্রদান ও বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষি ও নারী কৃষকদের বঞ্চনার বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই। বর্তমান আর্থ-সামাজিক বিবেচনায় সেচযন্ত্র, পাওয়ার টিলার অথবা ট্রাক্টরের মালিক হলো অপেক্ষাকৃত বড় কৃষক। কাজেই সরকারিভাবে প্রদত্ত ডিজেল ও বিদ্যুতের ভর্তুকি বড় কৃষকই পেয়ে থাকেন। কৃষক কার্ড সুষ্ঠুভাবে বিতরণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষি ও নারী কৃষকদের এই সুবিধার আওতায় নিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বর্তমান সরকারের কৃষি খাতে চলমান সংস্কার ও সহায়তা কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে, পাইলটিং পদ্ধতিতে উদ্যোগ গ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় পাইলটিং একটি পরীক্ষিত কৌশল, কেননা সীমিত পরিসরে বাস্তবায়ন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন, সমস্যা ও ঘাটতি চিহ্নিতকরণ এবং প্রভাব মূল্যায়নের মাধ্যমে নীতিকে পরিমার্জন করে তবেই তা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়।
কৃষি ঋণ মওকুফ ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। মাঠ থেকে প্রাপ্ত তথ্য— যেমন প্রকৃত কৃষকের নির্ভুল তালিকা, ফসলভিত্তিক উৎপাদন ব্যয়, বাজারসংযোগের বাস্তবতা, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা, দুর্যোগঝুঁকির মানচিত্র— এসব সমন্বিত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নীতিমালা চূড়ান্ত করা জরুরি।
বাস্তবতা হলো, কৃষি ঋণ মওকুফ তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ লাঘব করবে এবং সংকটাপন্ন কৃষককে নতুন করে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবে, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ, ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা।
কৃষক কার্ড যদি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যভিত্তিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি কৃষি খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারবে। চাহিদাভিত্তিক ভর্তুকি প্রদান, সরাসরি সহায়তা স্থানান্তর, সরকারি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার এবং একটি সমন্বিত কৃষক ডাটাবেস তৈরির মাধ্যমে কৃষক কার্ডটি নীতিগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে, ঋণ মওকুফ প্রয়োজনীয় হলেও এককভাবে যথেষ্ট নয়। কৃষক কার্ড স্বচ্ছতার সাথে বিতরণ, প্রয়োজনের নিরিখে ভর্তুকি, তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা, বাজারসংস্কার এবং মাঠভিত্তিক বাস্তবায়নের সমন্বিত প্রয়াস, সর্বোপরি সরকারের সদিচ্ছাই পারে বাংলাদেশের কৃষককে প্রকৃত অর্থে স্বাবলম্বী ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে।
লেখক: অধ্যাপক, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]