জিএম বা জিএমও (জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড অর্গানিজম) কৃষিপণ্য নিয়ে আমেরিকা সরকারের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) তাদের বহুল প্রত্যাশিত খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে যাওয়ার আগে একটু জেনে নেওয়া যাক আমরা কানাডা বা আমেরিকায় বসে কী কী জিএমও পণ্য গ্রহণ করি। তাতে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের অধিকাংশই জিএমও। যেহেতু এখানে কোনো খাদ্যপণ্য জিএমও কিনা, তা ঘোষণা সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক নয়। এ দেশের সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী জিএমও কৃষিপণ্য ও প্রচলিত কৃষিপণ্যকে একই কাতারে গণ্য করা হয়। আর তাই সাধারণ মানুষ জেনে বা না জেনে খেয়ে যাচ্ছে জিএমও কৃষিপণ্য। এগুলোর গোটা কয়েকের নাম নিচে দিচ্ছি। তবে এর বাইরে আরও কৃষিপণ্য আছে, যা উল্লেখ করা হলো না।
সবজি তেল সয়াবিন, গম, কানাডার পেটেন্ট করা সরিষার তেল ক্যানোলা তেল (এশিয়ার সরিষার তেলে যে ইরুসিক ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, সেই ফ্যাটি অ্যাসিডবিহীন ক্যানোলা তেল), তুলাবীজ তেল, তুলা খইল (পশুখাদ্য), ভুট্টা তেল, সয়াবিন পাউডার, সয়া খইল (পশুখাদ্য), সয়া মিল্ক বা সিরাপ, ভুট্টার আটা, ভুট্টা খইল (পশুখাদ্য), ভুট্টার খইল ও খড় (পশুখাদ্য), ক্যানোলা খইল (পশুখাদ্য), বীট সবজি (চিনি উৎপাদনে), আপেল, পেপে, আলু, বিভিন্ন জাতের কুমড়ো (স্কোয়াশ), তিসি, আনারস, আলফা আলফা (সবজি ও পশু খাদ্য), সালাদ জাতীয় সবজি, স্যামন মাছ, মাংসের জন্য পালিত শুকর, ধান। এর মধ্যে গোটা কয়েক কানাডার বাজারে অনুমোদিত নয়।
এই সুপারিশমালা বহুল প্রত্যাশিত ছিল এ কারণে যে, ১৯৯২ সালের পর ২০২৪-এ এসে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ জিএম পণ্য সম্পর্কে তাদের নীতিমালা প্রকাশ করল। তবে এটি চূড়ান্তভাবে গৃহীত নয়, খসড়া হিসেবে প্রস্তাবিত। তদুপরি, এই খসড়া নীতিমালা আইন হিসেবে চালু হচ্ছে না। শুধু জিএম কৃষিপণ্য শিল্প খাতে কর্মরত সকল প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশাজীবীদের জন্য একটি খসড়া নীতিনির্দেশিকা বা গাইডলাইন হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছে। সাধারণ ভোক্তা শ্রেণি, যারা এই জিএম কৃষিপণ্যের চূড়ান্ত বা শেষ পর্যায়ের গ্রহীতা, তাদের জন্য এই নীতিমালায় কোনো নির্দেশনা নেই।
২০২৪ সালে প্রকাশিত খসড়া নীতিমালাকে এফডিএ তাদের ১৯৯২ সালে প্রস্তাবিত নিউ প্ল্যান্ট ভ্যারাইটিস পলিসি বা স্টেটমেন্ট অব পলিসি: ফুডস ডেরিভড ফ্রম নিউ প্ল্যান্ট ভ্যারাইটিস-এর মূলনীতিগুলোর সম্প্রসারিত বিশ্লেষণ বা অধিকতর ব্যাখা বলে অভিহিত করেছে। জিনোম সম্পাদনার মাধ্যমে উদ্ভাবিত গাছ বা উদ্ভিদ থেকে উৎপাদিত খাদ্য: শিল্পখাতের জন্য খসড়া নীতিমালা (ফুডস ডেরিভড ফ্রম প্লান্টস ইউজিং জিনোম এডিটিং: গাইডলাইনস্ ফর ইন্ডাস্ট্রি) নামক বর্তমান সুপারিশকৃত প্রস্তাবনাপত্রে জিএম উদ্ভিদ উদ্ভাবক সংস্থা বা ব্যক্তিদের জন্য স্বআরোপিত দায়-দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। উদ্ভাবক ব্যক্তি বা সংস্থার জন্য দুই পর্যায়ে স্বেচ্ছায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ-কে উদ্ভাবিত নতুন প্রজাতির উদ্ভিজ্জাত খাদ্যের জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিষয়ে তথ্য প্রদানে উৎসাহিত করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে এফডিএ-এর সাথে বাজারজাতপূর্ব স্বেচ্ছায় পরামর্শ গ্রহণ করা এবং আলোচনা করা। অর্থাৎ, উদ্ভাবক ব্যক্তি বা সংস্থার জন্য কোনো প্রকার আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি, কিংবা উদ্ভাবিত নতুন উদ্ভিদ থেকে খাদ্যপণ্য বাজারজাত করণের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে এফডিএ-এর কোনো প্রকার কতৃত্ব রাখা হয়নি। এফডিএ তাদের এই সুপারিশপত্রেই শুরুতেই বলেছে এটা জিএম কৃষিপণ্য সম্পর্কে সংস্থার বর্তমান চিন্তা-ভাবনা ও সুপারিশমালা।
প্রশ্ন উঠেছে, এফডিএ কি উদ্ভাবক সংস্থাসমূহের পূঁজির নিরাপত্তা বিধানেই জিএম কৃষিপণ্য সম্পর্কে এত উদার ও কোমল মনোভাব পোষণ করছে? যখন সারা বিশ্বব্যাপী জিএম কৃষিপণ্য সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ ও সন্দেহ বিদ্যমান, তার কোনো বহিঃপ্রকাশ এই সুপারিশমালায় নেই কেন! এই জিনোম সম্পাদনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ-এর এই আত্মসর্মপণকে কয়েকভাবে ব্যাখা করা যায়। তাদের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিকে সম্পূর্ণত গবেষণা ও উদ্ভাবক সংস্থার হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। প্রথমত বলা যায়, বিশ্বব্যাপী সরকারি ভূমিকা পালন নিরুসাহিত করা হচ্ছে, যার মূল কারণ করপোরেট পূঁজি বা অতি-ধনী চক্রের ভূমিকা জনগণের সামনে আরও পরিষ্ফুট করা। দ্বিতীয়ত বলা যায়, তাদের হাতে এই নতুন বিজ্ঞান খাতের জন্য কোনো তথ্য নেই। আবার তারা এই বিষয়ে নিজস্ব বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম বা সুবিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করতে অনিচ্ছুক বা অপারগ। কারণ হিসেবে এখানে উল্লেখিত প্রথম কথাটি ধরে নেওয়া যায়।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালের নিউ প্ল্যান্ট ভ্যারাইটিস পলিসিতে (এনপিভি পলিসি) এই জিএম কৃষিপণ্য সম্পর্কেও একই রকম নমনীয় মনোভাব ব্যক্ত করা হয়েছিল। সেই পলিসিতে জিএম কৃষিপণ্যের জন্য বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রণগত সুপারিশ ছিল। সেই পলিসি এ বিষয়ে বিস্তারিত ও ঝুঁকি নির্ধারণের নিয়ম-নীতি সম্বলিত ছিল। ২০২৪ সালের চিন্তা-ভাবনা-সুপারিশমালাতেও নতুন জাত উদ্ভাবনে উদ্ভাবক ব্যক্তি বা সংস্থার জন্য একই রকম নমনীয়তা রাখা হয়েছে। ২০১৭ সালে জিএম বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষ বা সকলের থেকে উন্মুক্ত প্রস্তাব আহ্বান করেছিল। ৫৪০টি উন্মুক্ত প্রস্তাব পেয়েছিল তারা। অন্যদিকে ১৯৯৪ সালের পর থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তারা ২০০টি বাজারজাতপূর্ব স্বপ্রণোদিত পরামর্শ সভায় অংশ নিতে পেরেছিল।
এফডিএ যে নয়টি প্রধান প্রধান খাদ্যকে মানবস্বাস্থ্যের জন্য এলার্জেন বা ঝুঁকিপূর্ণ সংক্রমণ প্রতিক্রিয়া আছে বলে চিহ্নিত করেছে, সেগুলো হলো–গম, দুধ, ডিম, মাছ, চিংড়ি-কাঁকড়া জাতীয়, চিনে বাদাম, কাঠবাদাম এবং তিল। অ্যালার্জি সংক্রমণ প্রতিরোধে এ যাবৎ কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। এসব খাবারের ক্ষেত্রে শুধু যার যার শরীরের জন্য অ্যালার্জি হয়, সেই খাবার চিনে নেওয়া ও সেই খাবার বর্জন করাই অ্যালার্জি প্রতিরোধের সর্বস্বীকৃত উপায়। এফডিএ যখন খাদ্যতালিকায় থাকা একেবারে প্রথম সারির খাবারগুলো সম্পর্কে অ্যালার্জি সতর্কতা জারি করতে পারে, তখন অজানা-অচেনা বিভিন্ন কৃষি খাদ্যপণ্য সম্পর্কে তাদের কি কিছুই করণীয় নেই! নাকি শুধু করপোরেট কোম্পানিগুলোর সুবিধার্থে এ রকম নমনীয় সুপারিশমালা নিয়ে আসছে? প্রসঙ্গ একটু ভিন্ন হলেও উদাহরণস্বরূপ একটা বিষয় উল্লেখ করা যায়, ২০২০ সালে আর্জেন্টিনার বিজ্ঞানীদের জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে সূর্যমুখী গাছের কোষ থেকে নেওয়া খরা মোকাবিলার জিনযুক্ত উদ্ভাবিত নতুন গমের চাষ কানাডায় অনুমোদিত নয়। কারণ কী? এটা কি প্রযুক্তিগত বা পূঁজিবাদী কর্তৃত্ববাদ, নাকি ‘অন্য’দের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে স্বীকৃতি না দেওয়া, নাকি সেই প্রযুক্তি কোনো না কোনো উপায়ে নিজেদের দখলে আনার মতো কিছু (যা আর্থ-সামাজিক কর্তৃত্ববাদেরই নামান্তর)?
প্রস্তুতকৃত খসড়া সুপারিশমালায় আলোচনা প্রসঙ্গে জিন প্রকৌশলের বিভিন্ন ত্রুটি ও ঝুঁকি সম্পর্কে বেশ বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। পুর্বোল্লেখিত জৈব প্রযুক্তির ওপর ও নতুন বংশবিস্তার করা জীব বা উদ্ভিদের ওপর বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকলেও তা যে টার্গেট জীবে সব সময় প্রত্যাশিত ফলাফল সঠিকভাবে প্রকাশ পায়, তা নাও হতে পারে। জৈব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই বিষয়টাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। খাস বাংলায় কথাটাকে ‘উটকো ঝামেলা’ বলা চলে। বহুল চর্চিত উদ্ভিদ বা জীবের সকল প্রকার শঙ্করায়ণের ক্ষেত্রে অবশ্য এই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রত্যাশিত ফলাফল’ ঘটে থাকে। জেনেটিক প্রকৌশলের ক্ষেত্রে এটি মোটেও নতুন কোনো বিষয় নয়। শঙ্কর প্রজাতি উদ্ভাবনে যেমন এই অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্য দূর করার কাজে যাচাই‑বাছাই করার প্রক্রিয়া রয়েছে, এফডিএ জেনেটিক প্রকৌশলে উদ্ভূত উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও অপ্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্য বা অগ্রহণযোগ্য বৈশিষ্ট্য দূর করার জন্য একই রকম যাচাই-বাছাই করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
জিএম খাদ্য উৎপাদনে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্যাবলীর মধ্যে আরও থাকে নতুন জিএম উদ্ভিদে মানুষ বা গবাদিপশুর জন্য, এলার্জেন সংশ্লেষী বংশকণিকার সমতুল্য কোনো বংশকণিকা সৃষ্টি, ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান যেমন বিষক্রিয়াকারী, এলার্জেন, পুষ্টিমান হ্রাসকারী ও অন্য কোনো প্রকার শারীরবৃত্তীয় উপাদানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পুষ্টিমানের হ্রাস হওয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। যেমন কোষে কোনো একটি এলার্জেন সঞ্চয়ী প্রোটিন কণিকার উৎপাদন হ্রাস করলে তার বদলে আরেকটি ক্ষতিকর এলার্জেন সঞ্চয়ী প্রোটিন সংশ্লেষণের হার বৃদ্ধি পাওয়া, একটি এলার্জেন সংশ্লেষণ হ্রাস করলে তার বিপাকীয় গতিপথ বদলে আরেকটি ক্ষতিকর এলার্জেন অধিকতর হারে সংশ্লেষিত হওয়া, কিংবা কোষে কোনো মিনারেল বা ভিটামিনের সংশ্লেষণ হার বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিকর ‘ভারী’ ধাতুর সঞ্চয় বৃদ্ধির আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে। জিএম প্রযুক্তিতে সৃষ্ট উদ্ভিদে বংশকণিকা পরিবর্তন নিয়ে যারা কাজ করেন, তাঁরা অভিষ্ট নতুন উদ্ভিদে এই সমস্ত আভ্যন্তরীণ বিপাকীয় ও শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বলেই তারা এফডিএ-এর কাছে এ‑সংক্রান্ত আরও কঠোরতর নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশা করেন।
জেনেটিক প্রকৌশলে উদ্ভূত জিএম উদ্ভিদে আরও দেখা যায়, বিভিন্ন ভিটামিনের পরিমাণ হ্রাস বা বৃদ্ধি পাওয়া, দানাদার শস্যে পুষ্টিমান হ্রাস পাওয়া, তেলজাতীয় শস্যে কোনো কোনো ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ পরিবর্তিত হওয়া, প্রাণীর শরীরে হজম প্রক্রিয়া শেষে পুষ্টি শোষণের কাজে সহায়তাকারী অতি সামান্য পরিমাণে প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি। এগুলো পুষ্টিবিজ্ঞানীদের কাছে সবিশেষ গুরুত্ববাহী। জিএম উদ্ভিদের বিপক্ষে আন্দোলনরতদের কাছে এগুলো যথেষ্ট উদ্বেগজনক। তাঁরা মনে করেন, এফডিএ এ রকম উদ্বেগজনক বিষয়কে যথাযথ গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এ ছাড়া জেনেটিক প্রকৌশলে উৎপন্ন উদ্ভিদ বা জীবের ক্ষেত্রে অপর একটি মারাত্মক ত্রুটি ঘটতে পারে, যার নাম প্লিওট্রপি। প্লিওট্রপি হলো জীবের শরীরে একটি একক জিনের যে শারীরিক গঠন প্রকাশে বহুমুখী প্রতিক্রিয়া থাকে, প্লিওট্রপির কারণে কাঙ্ক্ষিত জেনেটিক পরিবর্তনের ফলে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটে থাকে। বেশির ভাগ সময় আপাতদৃষ্টিতে এটি সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। তবে এই সমস্ত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত বিপাকীয় রাসায়নিক সৃষ্টি কিংবা বিপাকীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়ার গতিপথ বদলে যেতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে অতিরিক্ত বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো প্রোটিন অণু, সেই গাছের দেহে, ফলে বা বীজে, যা মানুষ বা গবাদিপশুর শরীরে বিষক্রিয়া বা এলার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
প্লিওট্রপির কারণে উদ্ভিদ বা জীব কোষের আণবিক স্তরে জিনের অদলবদলে বাহ্যিক বা দৈহিক প্রকাশে অনেক রকম আনুষঙ্গিক বা অপ্রধান পরিবর্তন সংঘটিত হয়। এফডিএ এ সকল বিষয়ে ওয়াকিবহাল বলেই উদ্বেগের বিষয়গুলো উল্লেখ করেছে। আর আশা প্রকাশ করেছে যে, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে বা যারা এই কাজ করছেন, তাঁরা এ বিষয়ে পূর্বেকার শঙ্করায়ণের কাজে যুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মতো প্রাণী বা মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য বাজারজাত করবে। অর্থাৎ, এখানে মনসানতো’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তের ওপরই তারা আস্থা রাখছে। বিষয়টিকে আরেকটু আগ বাড়িয়ে বললে বলা যায়, এফডিএ করপোরেট পূঁজির ওপর ভরসা রেখেছে এফডিএ। আর যারা এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বলেন, তাঁদের মত হচ্ছে যে, এ সমস্ত বিষয়ে যথাযথ গবেষণা না করেই বৃহৎ করপোরেট শঙ্কর কৃষিপণ্য উৎপাদনকারীরা সেগুলো বাজারজাত করছে। বস্তুত আমেরিকা ও কানাডার বাজারে কোও কৃষিপণ্য (ফলমূল, শাক-সবজি, তেল ইত্যাদি) শঙ্করায়িত কিংবা জিএম কিনা সে বিষয়ে ঘোষণায় বিক্রেতাদের জন্য কোও বাধ্যবাধকতা না থাকায়, সবই অবিমিশ্র বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তা জেনে বা না জেনেই খাচ্ছে। যার ফলে একই বাজারে নন-জিএম ট্যাগ দিয়ে আরেকটি সমান্তরাল অধিকতর মূল্যে একই পণ্য বাজারজাত হচ্ছে। হয়তো দেখা যাচ্ছে যে, এই জিএম কৃষিপণ্য উৎপাদনকারীরাই অধিক মূল্যে সেসব কিনে খাচ্ছেন। অন্যদিকে স্বল্প মূল্যে তাদের পণ্য মাঝারি ও নিম্নবিত্তের সাধারণ মানুষ কিনে খাচ্ছে। জিএম কৃষিপণ্যের বিপক্ষে এটি বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের অনৈতিক অবস্থানের একটি উদাহরণ।
এই যে শঙ্করায়িত বা জিএম কৃষিপণ্য থেকে উৎপাদিত খাদ্য মানুষ বা গবাদিপশুর শরীরে বিষক্রিয়া বা অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যেতে পারে। যেমন উপমহাদেশের গবাদিপশু বেশির ভাগই খাদ্য হিসেবে খড়-বিচুলির ওপর নির্ভরশীল। গবাদিপশু কিন্তু মানুষের মতো নানা রকম খাদ্যগ্রহণ করে না। এই প্রাণীগুলো সারা জীবন কেবলমাত্র খড় খেয়ে বেঁচে থাকে। এখন ধরুন, এমন একটি উচ্চফলনশীল জিএম ধানগাছ উদ্ভাদিত হলো, যার থেকে খুব উৎকৃষ্ট গুণমানসম্পন্ন ভিন্ন কোনো আমিষ বা ভিটামিনযুক্ত ধান বা চাল পাওয়া গেল, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য খুব স্বাস্থ্যসম্মত, ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখা গেল, সেই জিএম ধানগাছের পাতায় বা কান্ডে অতিরিক্তি কোনো বিপাকীয় হরমোন বা অন্য আমিষ অণু উৎপাদিত হয়েছে, যা কিনা গবাদিপশুর শরীরে বিষক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা নিয়ে আদৌ কোনো গবেষণা পরিচালিত হয়নি। যেহেতু গবাদিপশু সারা জীবন একই প্রকারের প্রধানতম খাদ্য হিসেবে সেই ধানের খড়বিচুলি খেয়ে যাবে, তাই তার কান্ডে-পাতায় সঞ্চিত অতিরিক্ত বা নতুনতর হরমোন বা প্রোটিন অণু তাদের শরীরে প্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়া তৈরি করবে। তাতে দেশ ভিন্নভাবে পবাদিপশু সম্পদ হারাবে। পশুচিকিৎসকরা কোনো কিনারা খুঁজে পাবেন না। আবার এই গবাদিপশুর মাংস মানুষেও খাবে। খাদ্যশৃঙ্খলের নিয়ম মেনে ক্রমান্বয়ে সেই বিষক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া মানুষের শরীরেও প্রবেশ করবে। জিএম কৃষিপণ্য আকছার বাজারে ছাড়ার আগে তাই বিরুদ্ধবাদীরা সোচ্চার যে, বাজারে আসার আগে এগুলো নিয়ে আরও গবেষণা হোক। কিন্তু করপোরেট পূঁজি তো তাদের পূঁজির স্ফীতি ও লভ্যাংশ সংগ্রহে অধিকতর মনোযোগী! কাজেই সে কাজটি আর হচ্ছে না। আবার একবার একটি পণ্য বাজারে ঢুকিয়ে দিতে পারলে, আর পেছন ফিরে দেখার কিছু নেই।
এফডিএর বিরুদ্ধে তাই অভিযোগ উঠেছে, তারা পূঁজির কাছে আত্মসমর্পণ করছে। এ বিষয়ে আরেকটি গভীর উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সোর্স গাছ বা জীব থেকে টার্গেট জীবে এলার্জেন পরিবাহিত হওয়া। এটা নির্ধারণের কোনো প্রক্রিয়া এখনো নেই। আণবিক স্তরে পরিবর্তনের কারণে টার্গেট কোষেতে এলার্জেন বৃদ্ধি পেতে পারে বা নতুনতর এলার্জেন সৃষ্টি হতে পারে। মানুষ ও পশুর খাদ্যতালিকার একটি বড় অংশই এফডিএ-এর এলার্জেন তালিকায় রয়েছে। এফডিএ সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিন্তু এলার্জেন নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণের কোনো পন্থা যেহেতু বিজ্ঞানীদের হাতে নেই, কাজেই বিষয়টাকে জিএম বা শঙ্কর উদ্ভিদ বা জীব উৎপাদনকারীদের ওপরেই ছেড়ে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছেন যে, এলার্জেনযুক্ত উদ্ভিদ থেকে জেনেটিক উপাদান নিয়ে নতুন জিএম উদ্ভিদ উৎপাদনের পূর্বে, এলার্জেনযুক্ত উদ্ভিদের জেনেটিক উপাদানে কোনো রকম অদলবদলের পূর্বে, এবং কোন উদ্ভিদের এলার্জেনের মাত্রা পরিবর্তন সম্পর্কিত যেকোনো কাজের পূর্বে তারা যেন এফডিএ-কে অভিহিত করে। জিএম কৃষিপণ্যের বিরুদ্ধবাদীরা দাবি করেন, বিষয়টিতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার।
এফডিএ-এর খসড়া নীতিমালা ও কানাডার অবস্থান
কানাডা সরকারিভাবে ২০১৯ সাল থেকে এ যাবৎ ১৪টি কৃষিজ খাদ্যপণ্যে জেনেটিক প্রকৌশলবিদ্যা প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। তার মধ্যে সয়াবিন, সরিষা, আলু, ভুট্টা, বিট (চিনি শিল্পের জন্য), আলফা আলফা, বেগুন, ক্যাপসিকাম, স্কোয়াশ, অন্যতম। এ জন্য কানডার দোকানপাটে কোনো কৃষিপণ্য জিএম বা হাইব্রিড কিনা, তা ক্রেতাদের জন্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক নয়। তার অর্থ, আমাদের অজ্ঞাতসারেই আমরা জিএম পণ্য খেয়ে চলেছি। দেখা যায়, অধিকাংশ বিষয়ের মতোই রাষ্ট্রীয়ভাবে কানাডা জেনেটিক প্রকৌশলবিদ্যার মাধ্যমে সৃষ্ট নতুনতর খাদ্যপণ্যের বিষয়েও এফডিএ-এর সুপারিশ অনুসরণ করে থাকে। তবে সর্ব বিষয়ে নয়। কানাডার অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর কৃষি, ডিম, দুধ বা গবাদি বিষয়ে এ দেশ নিজস্ব স্বার্থে ট্যারিফ দিয়ে বা অন্য কোনো একটা কারণ দেখিয়ে আমদানি আটকে রাখে। কানাডার কয়েকটি সরকারি সংস্থা যেমন, হেলথ কানাডা, কানাডিয়ান ফুড ইনস্পেকশন এজেন্সি (সিএফআইএ), এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ কানাডা, জিএমও খাদ্যপণ্য সম্পর্কে দায়িত্ব পালন করে। সরকারিভাবে দি কানাডিয়ান এনভায়রমেন্ট প্রটেকশন অ্যাক্ট (সিইপিএ) অনুযায়ী জিএমও কৃষিপণ্য সম্পর্কিত বিষয়াবলী পরিচালিত হয়। প্রসঙ্গান্তর হলেও জেনে আশ্চর্য হবেন যে, এফডিএ-এর সুপারিশকৃত খাদ্যপণ্যের মানোয়ণের যে পদ্ধতি বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী খাদ্যশিল্প-কারখানায় ২০০০ সালের আগে থেকে কার্যকর করা শুরু করেছিল, কানাডার কোনো কোনো শিল্প-কারখানায় এখনো তার বাস্তবায়ন চলছে! (সমাপ্ত)
লেখক: কানাডা প্রবাসী লেখক


জিএম কৃষিপণ্য যে ফাঁদে ফেলছে মানুষকে
