কথা না রাখা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রসঙ্গ উঠলে অনেকেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার প্রসঙ্গ টানেন। কবিতাটিতে প্রধান চরিত্র তাঁর জীবনের ৩৩ বছরে বহু আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি পেলেও শেষ পর্যন্ত কোনোটিই বাস্তবায়িত হতে দেখেননি। এক অর্থে, বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে পৃথক করার দীর্ঘদিনের আলোচনাতেও এই কবিতার মূল বক্তব্য প্রতিফলিত হয়। বছরের পর বছর কেটে গেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো সরকার বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া এক ঐতিহাসিক মামলার রায়ের ২৭ বছর পেরিয়ে গেছে। এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব বনাম মাসদার হোসেন মামলা নামেই পরিচিত। ১৯৯৫ সালে বিসিএস (জুডিশিয়াল) অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাসদার হোসেনের করা আবেদনের ভিত্তিতে মামলাটির সূচনা হয়েছিল।
সম্প্রতি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটি চারটি অধ্যাদেশ ‘রহিতকরণ ও হেফাজতের’ সুপারিশ করায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। অধ্যাদেশ চারটি হলো— সুপ্রিম কোর্ট জাজেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট অধ্যাদেশ, ২০২৫; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬; এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তী বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ২০২৪।
ওই বিশেষ সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন ব্যাখ্যা করছেন যে, এসব অধ্যাদেশ রহিত করা মানে আপাতত এগুলোর অধীনে নতুন কোনো কার্যক্রম নেওয়া হবে না। তবে হেফাজতের ফলে এসব অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে গৃহীত কার্যক্রম বহাল থাকবে এবং সেগুলো বাতিল হবে না।
জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় এসব অধ্যাদেশ রহিত ও হেফাজতের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জয়নুল আবেদীন আরও ব্যাখ্যা করেন যে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ দেন এবং নিয়োগের প্রধান যোগ্যতা হিসেবে আইন পেশায় অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। তবে নতুন অধ্যাদেশে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স ৪৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের গঠন ও কার্যক্রম নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, সে কারণে আরও আলোচনা প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিত অবস্থায় গ্রহণ করেছে। ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করা হয়েছে। ১৬টি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দেওয়া হবে এবং পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সেগুলো বিল আকারে সংসদে পুনরায় উপস্থাপন করবে। বাকি চারটি অধ্যাদেশের রহিতকরণ ও হেফাজতের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে, বিএনপির কয়েকজন আইনপ্রণেতা বলছেন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যথাসময়ে নতুন বিল আনা হবে। এটা হলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যসহ সবাই সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার এবং আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব সিদ্ধান্তই নির্ভর করবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির ওপর, কারণ যেকোনো আইন পাস করা এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা একমাত্র তাদের হাতেই রয়েছে।
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি বিচারপতিদের নিয়োগ দেন। তবে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। বাস্তবে, এই সাংবিধানিক ব্যবস্থার কারণে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কতখানি—তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
বিচার বিভাগকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠলেও বিচারপতি নিয়োগ বিষয়ে এখনো কোনো সরকার সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করেনি। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করে, যাতে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের জন্য উপযুক্ত প্রার্থীদের বাছাই করে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। এ ধরনের আইন অধিক যোগ্য ও নিরপেক্ষ বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ বাড়াতে পারে।
পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে, বিশেষ করে অধস্তন আদালতগুলোর তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও দুটি অধ্যাদেশ আনা হয়।
বিএনপি সরকার এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন না দেওয়ায় নতুন আইন প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়া আগের কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে। তবে বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। সেখানে বিচারপতি নিয়োগসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে দেওয়া এবং পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। এ ছাড়া, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঘোষিত দলটির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে হুবহু একই ধরনের অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বিরোধটা কোথায়? বিএনপির প্রতিশ্রুতি ও এসব অধ্যাদেশের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুবই সামান্য। যদিও বিচার বিভাগসংক্রান্ত উল্লিখিত তিনটি অধ্যাদেশ বিএনপির ঢালাও অঙ্গীকারের তুলনায় আরও বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিধান দিয়েছে। তবুও তিনটি অধ্যাদেশ বহাল রাখতে বিএনপির এই অনীহা বিচার বিভাগের প্রকৃত পৃথকীকরণের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি করছে।
অতীত অভিজ্ঞতার কারণে এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আশঙ্কা অমূলক নয়, যদিও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার অধ্যাদেশগুলোকে আরও যাচাই-বাছাই করবে, প্রয়োজনীয় সংশোধন আনবে এবং পরে বিল আকারে সংসদে পুনরায় উপস্থাপন করবে।
সংশয় ঘনীভূত হওয়ার কারণ বাংলাদেশে বিচার বিভাগের জন্য নতুন কিছু নয়। এমনকি মাসদার হোসেনও ২০২২ সালে একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন যে, বাংলাদেশে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ নিয়ে আলোচনা সাম্প্রতিক নয়; এর ইতিহাস ঔপনিবেশিক আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ বিষয়ে প্রথম একটি উদ্যোগ আসে ১৯০০ সালে, যখন তৎকালীন বেঙ্গল সরকারের সচিব সি ডব্লিউ বোল্টন পৃথকীকরণের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। কিন্তু তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে ১৯০৮ সালে তৎকালীন ভারত সরকারের হোম মেম্বার স্যার হার্ভি অ্যাডামসন কয়েকটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে সেই পরিকল্পনা চালুর জন্য একটি খসড়া প্রস্তুত করেন। ১৯২১ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পক্ষে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করে, কিন্তু তখনও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আবার ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে পৃথকীকরণ বিষয়ে কিছু পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পূর্ব পাকিস্তানে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
এখন দেখার বিষয়, বিএনপি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে কি না। শুধু বিচার বিভাগসংক্রান্ত ওই তিনটি অধ্যাদেশের রহিতকরণ হয়নি; মানবাধিকার, গুম, দুর্নীতি দমন ও রাজস্ব প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসংক্রান্ত অন্যান্য অধ্যাদেশও আরও পর্যালোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই অধ্যাদেশগুলো কোনো সাধারণ সময়ে প্রণীত হয়নি। এগুলোর জন্ম হয়েছিল জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। এই অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার হচ্ছে ফ্যাসিবাদ উৎখাত করা এবং আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই অভ্যুত্থানের স্বপ্ন এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবে এগিয়ে নেওয়া হবে, নাকি নীরবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হবে।
(নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]