শরীফ ওসমান হাদির জানাজা শুধু একজন শহীদের শেষ বিদায় নয়, তা হয়ে উঠেছে ইতিহাসের এক নীরব অথচ দৃপ্ত ঘোষণাপত্র। শোক, শ্রদ্ধা আর প্রতিজ্ঞার বন্ধনে এই জানাজা পরিণত হয়েছিল গণমানুষের এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে। এই জনসমুদ্র শুধু কান্নায় ভেজা ছিল না; এতে ছিল আধিপত্যবাদ, স্বৈরতন্ত্র আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভে জ্বলে ওঠা এক জাতির প্রতিবাদী কণ্ঠ।
শনিবার সকাল থেকেই জানাজার স্থান—জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ঘিরে জমতে থাকে মানুষের ঢল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, তরুণ ও প্রবীণ—সবার চোখে ছিল অপূরণীয় ক্ষতির বেদনা আর গভীর শ্রদ্ধা। কারও হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, কারও হাতে প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড।
‘জান দেব, তবু জুলাই দেব না’, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘আধিপত্যবাদ নিপাত যাক’—এমন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে জাতীয় সংসদ ভবনসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা।
শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন সেই বিরল কণ্ঠস্বর, যিনি নির্ভীকভাবে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার আর স্বাধীন মত প্রকাশের প্রশ্নে তিনি কোনো আপস করেননি। বিদেশি প্রভাব, অভ্যন্তরীণ স্বৈরশাসন ও ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। সহযোদ্ধাদের মতে, হাদি বিশ্বাস করতেন—স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রে নয়, প্রতিফলিত হতে হবে রাষ্ট্রচিন্তা ও প্রতিটি সিদ্ধান্তে।
জানাজার মুহূর্তে পুরো এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। হাজারো মানুষের ভিড়েও তখন যেন কেবল শোকাতুর নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও হাদির ভাই ড. আবু বকর সিদ্দিকের স্মৃতিচারণে উঠে আসে ওসমান হাদির সাহসী জীবনের কথা এবং আধিপত্যবাদ ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস। অনেকের চোখে জল থাকলেও হৃদয়ে ছিল অটুট দৃঢ়তা।
জানাজা শেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত স্রোত আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ে। সংসদ ভবন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত লাখো জনতা তাঁকে পৌঁছে দেয় শেষ ঠিকানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবির কবরের পাশে দাফনের সময়ও মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে দোয়া করেছেন, কেউ শপথ নিয়েছেন হাদির দেখানো পথে চলার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে জানাজার দৃশ্য। আবেগঘন বার্তায় ভরে যায় টাইমলাইন। অনেকেই লিখেছেন, ওসমান হাদি ছিলেন সময়ের আগেই উচ্চারিত এক সতর্কবার্তা। যিনি বুঝেছিলেন, আধিপত্যবাদ ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নীরবতা মানেই পরাজয়।
ওসমান হাদির জানাজা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এটি প্রমাণ করেছে, একজন সাহসী মানুষের মৃত্যু কখনো শেষ নয়; বরং তা হয়ে উঠতে পারে গণপ্রতিরোধের শক্তিশালী প্রেরণা। এই জানাজা দেখিয়ে দিয়েছে, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি সম্মিলিত ও প্রজন্মব্যাপী এক মহৎ সংগ্রাম।
ওসমান হাদি আজ শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু বিপ্লবীরা কখনো মরে না। তাঁরা যুগের পর যুগ বেঁচে থাকেন মানুষের চেতনায়। এই জানাজা শুধু বিদায়ের নয়, এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অবিস্মরণীয় সম্মিলিত উচ্চারণ।
লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



