সবচেয়ে পছন্দের চাকরিই এখন সবচেয়ে অপছন্দের কেন?

একসময় বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশের কাছে পুলিশের চাকরি ছিল স্বপ্নের চাকরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অনেক তরুণই বিসিএসের পাশাপাশি পুলিশ ক্যাডারকে ক্যারিয়ারের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতেন। শুধু চাকরির নিশ্চয়তা নয়—ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের অংশ হওয়ার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাও এর পেছনে কাজ করত। এমনকি পুলিশে চাকরি পাওয়ার আশায় পরিবারকে জমিজমা বিক্রি কিংবা বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও সমাজে শোনা যেত।

কিন্তু সময় বদলেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং সে সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনা পুলিশের প্রতি তরুণ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এখন অনেক তরুণের কাছে প্রশ্নটি শুধু ‘কোন চাকরি ভালো?’ নয়; বরং ‘কোন প্রতিষ্ঠানে গেলে ভবিষ্যতে নিজের পেশাগত পরিচয় ও নৈতিক অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ রাখা যাবে?’

সেখানেই প্রশাসন ক্যাডারসহ বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার যুক্তি সামনে আসে।

তরুণদের একটি অংশ মনে করছে—সরকার পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলায়; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে স্থায়ী। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমলাদের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের প্রত্যেকের অবস্থানও পুলিশের মতো সরাসরি জনরোষের কেন্দ্রে আসে না। অন্যদিকে পুলিশের ক্ষেত্রে সরকার ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সম্পর্ক এতটাই প্রত্যক্ষ যে ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায় অনেক সময় পুরো বাহিনীর ওপর এসে পড়ে।

এখানেই মূল সংকট।

পুলিশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত পুলিশ নয়; বরং পুলিশের ওপর রাজনৈতিক নির্ভরতার সংস্কৃতি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ সরকারের নয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে পুলিশের আনুগত্যের কেন্দ্র বদলানোর কথা নয়। পুলিশের দায়িত্ব হওয়া উচিত আইন প্রয়োগ, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংবিধান ও আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যদি একটি বাহিনীকে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী মত দমন কিংবা ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠতে থাকে, তাহলে একসময় সেই বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষয়ে যাওয়া অনিবার্য।

২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ এই সংকটকে আরও প্রকট করেছে। পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশ সদস্যদের প্রাণহানি, থানায় আক্রমণ এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের জনরোষের মুখে পড়া—এসব শুধু একটি বাহিনীর সংকট নয়; রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর গভীর দুর্বলতার প্রকাশ। একটি রাষ্ট্রে মানুষ যদি পুলিশকে নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে না দেখে ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—কিছু সদস্যের কর্মকাণ্ডের দায় পুরো পুলিশ বাহিনীর ওপর চাপানোও ন্যায়সংগত নয়।

হাজার হাজার পুলিশ সদস্য প্রতিদিন অপরাধ দমন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা সামলানো, হারিয়ে যাওয়া মানুষ খোঁজা, সন্ত্রাস মোকাবিলা এবং নানা ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে মাঠপর্যায়ের একজন সাধারণ পুলিশ সদস্য যে পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করেন, তার সবকিছুর নিয়ন্ত্রক তিনি নন। ফলে সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত পুলিশকে দুর্বল করা নয়; বরং পুলিশকে এমন একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, যেখানে একজন কনস্টেবল থেকে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যন্ত রাজনৈতিক নির্দেশের চেয়ে আইন ও পেশাগত নীতিকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।

এখানে আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণের অভিযোগ। প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, স্থানীয় প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা হারায়। এর সবচেয়ে ভয়াবহ ফল হয় তখনই, যখন সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, কর্মকর্তা বদলি এবং পেশাগত মূল্যায়নও রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এর ফলে দক্ষতা নয়, আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যোগ্যতার পরিবর্তে সম্পর্ক মূল্যবান হয়ে যায়। আর তখন একজন তরুণ চাকরিপ্রার্থীও স্বাভাবিকভাবেই হিসাব করতে শুরু করে—কোন পেশায় তার ভবিষ্যৎ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, কোথায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত কম, কোথায় নিজের পেশাগত মর্যাদা ধরে রাখা সম্ভব।

এই মানসিক পরিবর্তন তাই কেবল পুলিশের প্রতি অনীহার গল্প নয়। এটি আসলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

তবে প্রশাসনও যে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিকীকরণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। তাই পুলিশের বদলে প্রশাসনকে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখাও বাস্তবসম্মত নয়। সমস্যাটি কোনো একটি বাহিনী বা ক্যাডারে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্যাটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সংস্কৃতিতে।

সমাধানও তাই শুধু পুলিশে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা বা কিছু নতুন ইউনিফর্ম, গাড়ি কিংবা প্রযুক্তি যুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

প্রথমত, পুলিশের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পুলিশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাগত স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা বেআইনি নির্দেশের ক্ষেত্রে কার্যকর ও স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, পুলিশ সদস্যদেরও স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে—সরকারের প্রতি আনুগত্য আর রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এক বিষয় নয়।

পঞ্চমত, জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক পুনর্গঠনে কমিউনিটি পুলিশিং, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পুলিশকে কোনো রাজনৈতিক দলের বাহিনী নয়, রাষ্ট্রের বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

কারণ একটি দুর্বল পুলিশ মানে শুধু দুর্বল আইনশৃঙ্খলা নয়। এর অর্থ হলো নাগরিকের নিরাপত্তা দুর্বল হওয়া, অপরাধ দমনের সক্ষমতা কমে যাওয়া, বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়া।

তাই আজকের তরুণ যদি পুলিশের চাকরিকে একসময়কার স্বপ্নের জায়গা থেকে সরিয়ে ‘ঝুঁকিপূর্ণ পেশা’ হিসেবে ভাবতে শুরু করে, সেটিকে শুধু চাকরির বাজারের একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

যে পেশা একসময় তরুণদের কাছে গর্বের প্রতীক ছিল, সেই পেশায় আবার মেধাবী তরুণদের আকৃষ্ট করতে হলে পুলিশের ভাবমূর্তি পালিশ করলেই হবে না—পুলিশের কাঠামো, রাজনৈতিক সম্পর্ক, জবাবদিহি ও পেশাগত সংস্কৃতিতেই পরিবর্তন আনতে হবে।

রাষ্ট্রের জন্য একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব পুলিশ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতার অন্যতম মৌলিক শর্ত।

আর সেই সংস্কার যত দ্রুত শুরু হবে, শুধু পুলিশ নয়—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থাও তত দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

লেখক: সাংবাদিক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]