দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের লম্বা পথ। এর পর শান্তির কপোত ওড়ানোর পর গোটা পশ্চিম যুদ্ধ দেখেছে টেলিভিশনে, খবরের কাগজে। আমেরিকা কিংবা ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলোকে আর সেই বাস্তবতা দেখতে হয়নি সেভাবে। তাই বলে যুদ্ধ থামেনি। স্নায়ুযুদ্ধের জেরে দেশে দেশে যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সেসব যুদ্ধে ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলো সেভাবে জড়িয়ে পড়েনি। এবার পড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কালো ছায়া ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সে কারণেই নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার এক নতুন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে অঞ্চলটিতে, যেখানে পুরোহিতের আসনে বরাবরের মতোই আমেরিকা।
ইউরোপ অবশ্য এ জন্য রাশিয়াকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারে। ইউক্রেনে রুশ অভিযানের কারণেই না ন্যাটো শক্তি ও পরিধিতে বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন নতুন সদস্য যুক্ত হচ্ছে এ সামরিক জোটে। ব্রেক্সিটের পর যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তাও নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। ইউক্রেন ও মলদোভাকে এরই মধ্যে ইইউর ‘ক্যান্ডিডেট স্ট্যাটাস’ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ইউরোপের প্রাণ ফ্রান্স, জার্মানির মতো শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে একযোগে কাজ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে।
জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে থাকা ঐতিহাসিক দূরত্ব ঘোচাতে দেশ দুটি তৎপর হয়েছে। এই তো গত ৬ জুন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শুলজ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁকে নিজ বাসভবনে আতিথ্য দিলেন। দুই নেতা দূরত্ব ঘোচানোর কিছু প্রতীকী তৎপরতা অন্তত করছেন। অথচ দীর্ঘ তিক্ততায় মন্ত্রিপর্যায়ের সভা বাতিলের মতো ঘটনা ঘটায় মনে হয়েছিল এ দূরত্ব যেন ঘুচবারই নয়। কিন্তু গেল মাসে দুই নেতা তিন ঘণ্টা একসাথে কাটালেন, খেলেন, হাসলেন এবং কত কী না আলাপ করলেন।! সে আলাপ শেষে জুলাইয়ে পুরো দেশ ঘুরে দেখার জন্য ম্যাখোঁকে শুলজ আমন্ত্রণ জানালেন, যা গত ২৩ বছরে কোনো জার্মান চ্যান্সেলর কোনো ফরাসি প্রেসিডেন্টকে করেননি। তাহলে ইউরোপ কেন রাশিয়াকে ধন্যবাদ দেবে না?
ইউক্রেন যুদ্ধের কালো ছায়া ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: উইকিপিডিয়া
রাশিয়ার এ অভিযানের কারণে গোটা ইউরোপে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা ইস্যু। এটা এতটাই যে, যে ফ্রান্স আগে ইইউর বিস্তারের বিরুদ্ধে ছিল, সেই ফ্রান্সই এখন এই জোটকে আরও বিস্তৃত করে পূর্বদিকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। গত জুনে কিয়েভ সফরের সময় ইইউতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ইউক্রেন ও মলদোভাকে সমর্থন জানান ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। শুধু তাই নয়, একই প্রশ্নে আলবেনিয়া ও উত্তর মেসিডোনিয়ার বিষয়ে নিজেদের দেওয়া ভেটোও অপসারণ করেছে তারা। তিনি এখন বলছেন, ‘আমরা আরও বিস্তৃত হব, প্রশ্ন সেটি নয়। বরং কীভাবে বিস্তার করব, প্রশ্ন সেটিই।’ পশ্চিম ইউরোপ এখন পূর্ব ইউরোপের কান্না শুনতে পাচ্ছে।
কিন্তু এই দারুণ ঘটনা তো এমনি এমনি হয়নি। এটি করেছে রাশিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন যেমন স্নায়ুযুদ্ধের অজুহাতে গোটা পুঁজিবাদী পশ্চিমকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছিল, এবারও ঘটনা তেমনই। এতটাই যে, ইউরোপের নাক উঁচু দেশ হিসেবে পরিচিত ফ্রান্সই এখন দু হাত তুলে পূর্ব ইউরোপকে বুকে টেনে নিতে আকুল হয়ে আছে। ইমানুয়েল ম্যাখোঁ নিজের আগের বক্তব্য গিলে এখন ন্যাটোকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন। একইসঙ্গে বলছেন, ইউরোপকেও নিজের নিরাপত্তা নিজে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। অথচ এই তিনিই ২০১৯ সালে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটোকে মৃতপ্রায় বলেছিলেন।
ম্যাখোঁর এই ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠাটি ঠিক অমূলক নয়। কারণ, গোটা ন্যাটো ভর করে আছে আমেরিকার কাঁধে, যা নিয়ে যথেষ্ট বিরক্ত ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বর্তমানে নিজ দেশে নানা মামলা ও বিতর্কে জর্জরিত ট্রাম্প সে সময় ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য বিপুল অঙ্কের মার্কিন ডলারের অহেতুক খরচা নিয়ে যারপরনাই অখুশি ছিলেন। এবং সেই অখুশি থেকে ন্যাটোর অর্থায়ন বন্ধের পথেও হেঁটেছিলেন। এখন সেই ন্যাটোর ওপরই আবার সবাইকে সওয়ার হতে হয়েছে, যার চাপ গিয়ে পড়ছে এখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ওপর। সামনের বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে যত স্বার্থই থাকুক না কেন, রাশিয়ার মতো ‘শত্রু’-কে এক হাত নেওয়ার যত সুযোগই থাক না কেন, এই নিরাপত্তা ব্যয় আমেরিকা সামনেও মেটাবে কিনা, তা নিয়ে ইউরোপের মুরব্বিদের শঙ্কা অহেতুক নয়। হাজার হোক, পরের বাহুর চেয়ে নিজ বাহুর বলই তো আসল।
জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে থাকা ঐতিহাসিক দূরত্ব ঘোচাতে দেশ দুটি তৎপর হয়েছে। ছবি: টুইটার
তবে এ শুধু নিরাপত্তার ইস্যুও নয়। অন্তত জার্মানির ক্ষেত্রে তো নয়ই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির অর্থনীতি রাশিয়ার সস্তা জ্বালানি ও চীনের রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ এ সমীকরণ বদলে দিয়েছে। একদিকে রাশিয়া, অন্যদিকে চীন আমেরিকা তথা ন্যাটো জোটের অভিন্ন শত্রুর তকমা পেয়ে গেছে। ফলে জার্মানিকে ভিন্নভাবে নিজ অর্থনীতির কথা ভাবতে হচ্ছে। আবার নিজের সামরিকীকরণের চাপও আছে।
ইউরোপের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর যে কথা ফ্রান্স মুখ ফুটে বলেছে, তা জার্মানিরও মনের কথা। ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি সামরিক ব্যয় কমিয়ে আনার যে পথে ছিল এবং যা ধরে ছিল দীর্ঘদিন, তা থেকে সরে এসেছে। এরই মধ্যে ১০০ কোটি ইউরো করে বাড়তি বাজেট বরাদ্দ করেছে সামরিক খাতে।
তবে ফ্রান্সের ক্ষেত্রে অর্থনীতি তেমন দুশ্চিন্তার বিষয় না হলেও নিরাপত্তা সত্যিই বড় ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। এটা এতই যে, আগামী ১৯ জুলাই প্যারিসে অঞ্চলটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বসবেন আলোচনায়। সেখানে নিশ্চিতভাবেই ইউরোপের নিরাপত্তা ইস্যুটিই সামনে আসবে। ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনকে সামনে রেখে আগে থেকেই ইউরোপ নিজেকে গুছিয়ে নিতে চায়। তবে ফ্রান্সের মতো সবাই এ ক্ষেত্রে সরবে এগোতে চায় না। অধিকাংশেরই ভয় হচ্ছে, যদি তাদের তোড়জোড় দেখে আমেরিকা পিঠটান দেয়। ফলে ম্যাখোঁর আক্রমণাত্মক বক্তব্য নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিও আছে ইইউ দেশগুলোর।
ন্যাটোও থেমে নেই
চোয়ালে রাশিয়ার সজোর গুঁতো খেয়ে ইউরোপের এখন দিশা ফিরেছে যে, তাদের ঐক্য প্রয়োজন। জন্মের পর কিছুকাল সচল থেকে বাকি পুরোটা সময় নানা জায়গায় কলকাঠি নাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল ন্যাটো। এখন রাশিয়া তাদের বলে দিয়েছে, ‘বাপু একটু নড়ে বসো। নিজের দিকে ফেরো।’ বহু আগে থেকেই সুনিশ্চিত প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে এমন বার্তা পেয়ে তাকে নড়তেও হয়েছে, আর নিজের দিকে ফিরতেও হয়েছে।
আগামী ১১ ও ১২ জুলাই তারা আলোচনায় বসছে। নতুন সদস্য ফিনল্যান্ডও সেখানে থাকছে। লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে অনুষ্ঠেয় সেই বৈঠকে স্নায়ুযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা ও এর অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে জোটটির। এ ঘটনাকে বার্লিন দেয়ালের পতনের পর ‘সবচেয়ে নাটকীয়’ ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন সুপ্রিম হেডকোয়ার্টার্স অ্যালায়েড পাওয়ার ইউরোপের (শেইপ) আমেরিকান জেনারেল ম্যাথিউ ভ্যান ওয়াগেনেন।
সেখানে মূল আলোচনা কিন্তু হবে ইউরোপ নিয়ে। যেমন ইউক্রেনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি, অন্য সব সহায়তার নিশ্চয়তা, সুইডেনের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তুরস্কের ভেটো, আরও বৃহত্তর ইউরোপীয় জোটের বাস্তবতা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা-এ সবই থাকবে সে আলোচনার টেবিলে। একইসঙ্গে ইউরোপের সাথে এশিয়ার সম্পর্ক, চীনকে মোকাবিলায় এশীয় মিত্র বলয় বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা বিষয় আসবে। এমনকি টোকিওতে ন্যাটো অফিস খোলা হবে কিনা, তাও থাকতে পারে আলোচ্যসূচিতে। অর্থাৎ বেশ একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ একটা ব্যাপার থাকছে।
ন্যাটো ভর করে আছে আমেরিকার কাঁধে, যা নিয়ে যথেষ্ট বিরক্ত ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: উইকিমিডিয়া
এদিকে রাশিয়া নিয়েও তাদের ভয়টি ঠিক কাটেনি। এই গোটা বৈঠকটি আহ্বানের ক্ষেত্রে অলক্ষে রাশিয়াই তাদের সহায়তা করেছে সবচেয়ে বেশি। যদি একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা কৌশলপত্র তারা অনুমোদন দেয়, তাতে ন্যাটোর চেয়ে রাশিয়ার কৃতিত্ব কম কিছু হবে না। সেটা বোঝা গেছে ন্যাটোর মিলিটারি কমিটির চেয়ার রব বয়ারের কথাতেই। তাঁকে উদ্ধৃত করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো গত ৩ জুলাই লিখেছে, রুশ সেনাদের একটি বড় অংশ ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধরত হলেও ক্রেমলিন এখনো বড় ধরনের হুমকি।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বৈঠকের আগে একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সবাইকে সম্মত করতে রুশ জুজুকে বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন রব বয়ার। ঠিক যেমনটা ইইউ করছে। গোটা পশ্চিমের জন্য ইউক্রেন যুদ্ধ নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করার এক মহা টনিক হিসেবে হাজির হয়েছে। এই টনিক কাজে লাগিয়ে ইউরোপ আদতে চীনকে মাথায় নিয়েই নিজেকে গোছাতে চাইছে। নইলে চিরদিনের ব্রাত্য এশিয়ায় ছোটাছুটি করত না তারা। এখন তারা এশিয়াকেও নিজের দিকে টানতে চাইছে ব্যাপকভাবে। এবং তা চীনের নাকের ডগায় থাকা টোকিওকে মিত্র হিসেবে নিয়েই শুধু নয়, সেখানে নিজেদের দপ্তর খুলে হলেও।
গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে গোটা বিশ্বে নানা নকশার যুদ্ধ রপ্তানি করা ইউরোপ ও আমেরিকা এখন যুদ্ধ ও মৃত্যুর শঙ্কায় ভুগছে। তাদের ভয়, এই না বুঝি সব মৃত্যু ও ধ্বংস হুড়মুড় করে তাদের ঘরে ঢুকে পড়ল। তারা তো বড়জোর সংকটগ্রস্ত দেশের শরণার্থী নিয়ে, নিষেধাজ্ঞার আওতা নিয়ে, অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে, দূর দেশের নিরাপত্তা, মানবিকতা ইত্যাদি নিয়ে তর্ক ও নসিহত করতে এবং প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করতে ভালোবাসে। তাই এখন যখন ইউক্রেন এক দারুণ বাস্তবতা, রাশিয়া অস্ত্র নিয়ে ফুঁসছে, চীন মায়েস্ত্রোর মতো কৌশলে তরি পার করছে, তখন সে দেখছে নিজের নিরাপত্তার জন্য সে এতদিন কিছুই করেনি। এখন তাই এত ঐক্য-ঐক্য রব উঠেছে ইউরোপজুড়ে। দেখা যাক কী হয়!