দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর আবারও ভাঙনের শঙ্কায় পড়েছে জাতীয় পার্টি। নির্বাচনে দলটির পরাজিত প্রার্থীদের একটি অংশ চ্যালেঞ্জের ছুড়েছেন চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে। এরই মধ্যে বিদ্রোহী চার নেতাকে বহিস্কার করা হয়েছে। তবে মহাসচিব চন্নু মনে করেন, এতো সহজে ভাঙবে না জাতীয় পার্টি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল জাতীয় পার্টি। চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে অহযোগিতার অভিযোগ এনে দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ ও তার অনুসারী নেতারা নির্বাচন বর্জন করেন। তাঁদের অভিযোগ, রওশনপন্থিদের কোনঠাসা করতে নির্বাচনে তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
নির্বাচনের ফল বিপর্যয়ের পর থেকে তা আরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। চলছে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও বহিস্কারের পাল্টাপাল্টি ঘটনা। নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে দায়ী করে তাদের পদত্যাগ চাইছেন দলটির মনোনীত প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের একাংশ।
বিক্ষোভে ইন্ধনের অভিযোগে দলের কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশিদ ও প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়কে অব্যাহতি দিয়েছে জাতীয় পার্টি। চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের সমালোচনা করায় বহিষ্কার হয়েছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু ও ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াহিয়া চৌধুরী।
ইয়াহিয়া চৌধুরী বলেন, ‘দলের মহাসচিব যদি ওনার পোস্টারে লেখেন আমি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী, মানে পুরা দল আমরা আওয়ামী লীগ সমর্থিত হয়ে গিয়েছি। এটার কি উনি জবাব দেবেন না? এটার জবাব না দিয়ে উনি আমাকে বহিস্কার করেছেন। এতো দাম্ভিকতা ভাল নয়। নেতা–কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করুক। আমার মুখ থাকলে আমি বলছি, আপনি আমাকে ডেকে বলুন। আপনি সাথে সাথে বহিস্কার করবেন? আপনি কত বহিস্কার করবেন?’
বহিস্কৃত নেতাদের অভিযোগ, জাতীয় পার্টিতে গণতন্ত্র নেই। স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য কারণ দর্শানো ছাড়াই বহিস্কার করা হয়েছে।
এর আগেও অন্তত তিনবার ভেঙেছে জাতীয় পার্টি। ১৯৮৬ সালে সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি প্রথম ভাঙনের মুখে ১৯৯৬ সালে। এরশাদের সঙ্গে মতোবিরোধের জেরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মূল দল থেকে বেরিয়ে গঠন করেন জাতীয় পার্টি (জেপি)। এই দলটি বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক।
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আরেকবার ভাঙনের মুখে পড়ে জাতীয় পার্টি। এবার দল থেকে বেরিয়ে যান সাবেক মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জুর। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামের এই অংশটির নেতৃত্বে বর্তমানে আছেন নাজিউর রহমানের ছেলে আন্দালিব রহমান পার্থ। বিজেপি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক।
সবশেষ, ২০১৪ সালের নির্বাচনে আগের দলটির নেতা কাজী জাফর মূল দল থেকে আলাদা হয়ে যান। এই অংশটি জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) নামে পরিচিত। এই অংশটিও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আছে।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ ২০১৯ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে বিবাদে জড়ান তার ছোট ভাই জিএম কাদের আর স্ত্রী রওশন এরশাদ। এরশাদের মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্বে আসেন জিএম কাদের। শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন রওশন। দুজনই নিজেদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে অবশ্য সমঝোতার মাধ্যমে জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান ও রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করা হয়।
এরপর ২০২২ সালে আবারও দলের এই গৃহবিবাদ প্রকাশ্যে আসে। সে সময় এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ ছিল আওয়ামী লীগের সাথে জোটে থাকা-না থাকাকে কেন্দ্র করে। জি এম কাদেরপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোট থেকে বের হয়ে বিএনপির সাথে বা আলাদা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। অন্যদিকে রওশনপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোটেই থেকে যাওয়া।
একপর্যায়ে ওই বছরের আগস্টে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই রওশন এরশাদ কেন্দ্রীয় সম্মেলন ডাকেন। সে সময় রওশনের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
ফলে জি এম কাদেরের চেয়ারম্যান পদে থাকাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক মামলাও করা হয়। এতে শুরুতে জি এম কাদেরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত। পরে অবশ্য উচ্চ আদালতের রায়ে চেয়ারম্যান পদ ফিরে পান জি এম কাদের।
নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে রওশন ও কাদেরের দ্বন্দ্ব আবারও প্রকাশ্যে আসে। ফলে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেননি রওশন। অন্যদিকে, প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের দুটি আসন ঢাকা–১৭ এবং রংপুর–৩ থেকে দলটির মনোনয়ন নেন চেয়ারম্যান জিএম কাদের। পরে অবশ্য ঢাকা–১৭ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন তিনি।
এরশাদের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে রংপুর–৩ আসনে হওয়া উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তাঁর ছেলে রাহগির আলমাহি সাদ এরশাদ। ধারণা করা হয়েছিল, এবারও তিনি এই আসনে মনোনয়ন পাবেন।
জাতীয় পার্টির একাংশের নেতাদের অভিযোগ, দলে রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতা–কর্মীদের এবার নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। রংপুর–১ আসন থেকে জাতীয় পার্টির হয়ে বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন দলের সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত এই নেতাকে এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তাঁর জায়গায় মনোনয়ন দেওয়া হয় এইচ এম শাহরিয়ার আসিফকে।
অন্যদিকে, এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ২৬টি আসনে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। দলটির প্রার্থীরা এই আসনগুলোতেও নির্বাচিত হতে পারেননি। দ্বাদশ সংসদে জাতীয় পার্টির পাওয়া আসন ১১টি। আওয়ামী লীগের ছাড় দেওয়া আসন ছাড়া কোনো আসনেই জয় পাননি দলটির প্রার্থীরা। এ নিয়ে দলটির নেতা–কর্মীরা ক্ষোভে ফুঁসছেন।
তবে জাতীয় পার্টির আরেক দফা ভাঙনের শঙ্কা নাকচ করেছেন দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তাঁর দাবি, বিক্ষুব্ধ নেতাদের অভিযোগ সত্যি নয়।
চুন্নু বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ শুধু মিথ্যাই না, একদম বাজে কথা এগুলো। জাতীয় পার্টি ভাঙার কোনো কারণ বা সুযোগ নাই। যারা আজকে হাউকাউ করছে, ১০–২০ দিন পর এরাই দরখাস্ত দেবে যে আমরা ভুল করেছি, আমাদের মাফ করে দেন। দলে নিন।’
এদিকে, নির্বাচনে জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের আর্থিক অনিয়মের তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ্যে আনা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির বিক্ষুব্ধ নেতারা।