করোনা মহামারির কারণে ৩ বছর দেশে অবস্থানের পর গত বছরের ১৫ জুলাই পুনরায় মালয়েশিয়ায় প্রবাসজীবনে ফিরে আসি। তিন বছর খুব বেশি সময় নয়। আবার কম সময়ও নয়। ওই তিন বছরে অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে মালয়েশিয়া একটুও পিছিয়ে যায়নি। বরং এগিয়েছে সব দিক দিয়ে। এই লেখায় শুধু মোবাইলে কথা বলা বা ভাব-তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে বলি।
আসলে গত ১৬ মাস ধরে মোবাইল ফোনে কল সম্পর্কে কিছু লিখব লিখব করেও লেখা হয়নি। সম্প্রতি ‘ফের ২৫ পয়সা কলরেটে ফিরছে সিটিসেল’ শিরোনামে একটা নিউজ চোখে পড়ার পর মোবাইল ফোনে কথা বলা নিয়ে এই লেখাটি লিখছি।
দ্বিতীয়বার মালয়েশিয়ায় এসে (২০২৩ সালে) শুরুতেই যেটা দেখলাম সেটা হচ্ছে, মালয়েশিয়ায় মোবাইল ফোনে কথা বলা কোন কোম্পানির সিমে কলরেট কত সেটা কেউ জানে না! মোবাইলে কথা বললে আগে মিনিটে কত পয়সা কাটত, সেটা হয়ত কারও কারও মনে আছে। আর গত কয়েক বছরে মালয়েশিয়ায় আসা ৫ লক্ষাধিক বাংলাদেশির মধ্যে হয়তো গুটিকয়েক ছাড়া কেউই বলতে পারবে না মালয়েশিয়ায় মোবাইলে কথা বলা কলরেট কত, এক মিনিট কথা বললে কত পয়সা কাটে। আগে তো আমরা কলরেট জানতাম। কত হিসাব করে মালয়েশিয়ায় কথা বলতাম, দেশে কথা বলতাম। শুধু মিনিটের হিসাব নয়, সেকেন্ডের হিসাব রাখতাম। কারণ, দেখা যাচ্ছে মিনিট পূর্ণ হয়ে কয়েক সেকেন্ড হলেও আরেক মিনিটের টাকা কাটবে, তাই যত মিনিট কথা বলি না কেন শেষে ৫০ সেকেন্ডের ওপরে গিয়ে লাইন কেটেছি। সব সময় না হলেও মাঝেমধ্যে এ রকম কঠিন হিসাব করেও চলেছি আগে। সময় বদলে গেছে, তাই এখনকার ব্যাপার ভিন্ন। এখন আর সময় দেখে কথা বলতে হয় না। চাইলেই যত ইচ্ছে মোবাইলে কথা বলা যায়।
কথার পিঠে কথা চলে আসে। আমরা তো মালয়েশিয়া থেকে দেশে মোবাইলে মাসে বড়জোর মাত্র ৩/৪ বার ফোন করেছি, এর বেশি নয়, সেই যুগের মানুষ। কলিং কার্ড দিয়ে কথা বলা, তারও আগে যখন নিজের মোবাইল ছিল না, তখন কলিং কার্ড দিয়ে রাস্তার পাশের টেলিফোন বুথ থেকে কথা বলেছিলাম। সেই গল্পকাহিনী এখন না লিখে বরং আসল কথায় আসি।
মালয়েশিয়ায় এখন কেউ কলরেট জানে না– এটা একেবারে সত্যি কথা। এর কারণ একটাই। এই দেশে এখন কোনো মানুষ মোবাইলের সিম থেকে সরাসরি কল করে না। কালেভদ্রে কেউ করে। কারো মোবাইল সিমে হয়তো কল আসে। তবে সেটা হঠাৎ করে। স্বাভাবিকভাবে সবাই কল করে হোয়াটসঅ্যাপে। চেনা–অচেনা সব মানুষই কল করে হোয়াটসঅ্যাপে। ভয়েজ বার্তা আদান-প্রদানও হোয়াটসঅ্যাপে। সচল অচল সব মানুষের হাতে স্মার্টফোন, সবাই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। এখানে এখন অল্প টাকায় এক মাসের জন্য ইন্টারনেট কেনা যায়। শুধু কেনা যায় বললে ভুল হবে। বলতে হবে সবাই অল্প টাকায় ৩০ দিনের জন্য ইন্টারনেট কেনেন। আমি নিজে ব্যবহার করে আসছিলাম একটা মোবাইলে ২৫ রিঙ্গিতের প্যাকেজ, আরেকটাতে ৪৫ রিঙ্গিতের প্যাকেজ। দুইটা ফোনেই ২৪ ঘণ্টা নেট চালু থাকে। ঘুমের সেই ৭/৮ ঘণ্টা ছাড়া বাকি সময়টুকু তো ইন্টারনেটেই পড়ে থাকি। ব্যবসা করিও ই-কমার্স। মানে অনলাইনেই কাজ। কিন্তু কোনো দিন কোনো মোবাইলে নেট শেষ হয়নি। ৪৫ রিঙ্গিতেরটাও না, ২৫ রিঙ্গিতেরটাও না।
আরেকটা বিষয়– এই যে ২৫ রিঙ্গিত একটা, ৪৫ রিঙ্গিত অন্যটা; দুটো ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেজ। অবশ্য সিমও ভিন্ন। মানে দুইটা সিম দুই কোম্পানির। একটা ডিজি আরেকটা ইউয়ু মোবাইল। এই দুইটা প্যাকেজ কোনটা কত জিবির প্যাকেজ তা-ও জানি না। দুইটাই চমৎকারভাবে ব্যবহার করতে পারি পূর্ণ ৩০ দিন, ইচ্ছেমতো। তাই কোম্পানি কত জিবি ইন্টারনেট দিচ্ছে, সেটা দেখার প্রয়োজনই হয় না। হয়তো প্রথম বার প্যাকেজ নেওয়ার সময় দেখেন কেউ কেউ। পরে ৩০ দিন শেষ হওয়ার আগে আগে রিচার্জ করে রাখি। অটো রিনিউ হয়ে যায় প্যাকেজ। কোনো টেনশন নেই।
গত কয়েক মাস আগে থেকে ইন্টারনেট খরচেও আমি প্রতি মাসে ২৫ রিঙ্গিত সেভ করি। কারণ, এখন আর দুইটা মোবাইলে ইন্টারনেট কিনি না। ২৫ রিঙ্গিতেরটা বাদ দিয়েছি। ৪৫ রিঙ্গিতেরটা চালু রেখেছি। সেটা থেকে হটস্পট দিয়ে আরেক মোবাইলেও ইন্টারনেট চালায় পরিপূর্ণভাবে। অর্থাৎ একটা মোবাইলের ইন্টারনেট দিয়ে দুইটা মোবাইলে সক্রিয় থাকি সমানতালে। কোনো সমস্যা হয় না।
মালয়েশিয়ায় ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনলে সরাসরি কল করা ফ্রি-ও আছে। তারপরও কেউ সরাসরি কল করে না। কল মানে অভিও কল বা ভিডিও কল যা-ই হোক, হোয়াটসঅ্যাপেই কল। হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবসার আলাপ, প্রেমের আলাপ, ফাও আলাপ, দীর্ঘ আলাপ, অল্প আলাপ-সল্প আলাপ সব। প্রয়োজনীয় কথা, অপ্রয়োজনীয় কথা সবই হোয়াটসঅ্যাপে।
মালয়েশিয়ায় মোবাইলে সরাসরি কল দেওয়ার চর্চা অতীত হয়ে গেলেও মালয়েশিয়া ডিজিটাল দেশও না, স্মার্ট দেশও না! মালয়েশিয়া কেবলই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া আমাদের অনতিদূর একটা দেশ। এই দেশের রাজনীতিবিদরা জনগণকে ঠকায় কম। তারা অনেকটাই সৎ, ডিজিটাল দেশ, স্মার্ট দেশের নেতাদের চেয়ে। মালয়েশিয়া একবারই স্বাধীন হয়েছিল ১৯৫৭ সালে বৃটিশ থেকে, সেটাই পুরানো স্বাধীনতা, সেটাই সদা নতুন স্বাধীনতা। এই দেশে একজন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে (নাজিব রাজাক) তীব্র আন্দোলন হয়েছিল দেখেছিলাম, তবে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়। এটাও বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ। এখানেও দলগুলোর মধ্যে বিরোধ আছে, ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা আছে। তবে দেশের কল্যাণে জণগণের কল্যাণে সবাই কাজ করে আলিঙ্গাবদ্ধ হয়ে– এই যা। আবার এই দেশে জগদ্বিখ্যাত পুরস্কার বিজয়ী মহামানব যেমন নেই, হাজার কোটি টাকায় মূর্তি বানিয়ে দেশজুড়ে সাজিয়ে রাখার মতো মরহুম নেতাও নেই।
তবে স্বাধীনতার কথা উঠলে মালয়েশিয়ার ইতিহাসে তাদের একজন স্বাধীনতার জনক আছে। এই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে কখনো কাউকে ভিন দেশে বসে স্বদেশের রাজনীতি করতে হয়নি। তাই এই দেশে মোবাইলের কলরেট কিংবা ইন্টারনেট রেট নিয়ে জনগণকে অনলাইন বা অফলাইনে কখনো আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়নি।