কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানবপাচারের জটিলতা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার সাংকংহে ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইয়াসমিন আক্তার অধরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুলের এশিয়ান নন-গভর্নমেন্টাল অর্গানাইজেশনস প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি এ সম্মাননা অর্জন করেন।
এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ১৩ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন সায়েন্স বিল্ডিংয়ের জন ডেলি হলে ২০২৫ সালের শরৎকালীন সেমিস্টারের ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে মোট ২৫৪ জন শিক্ষার্থী ডিগ্রি লাভ করেন। তাদের মধ্যে ১৮৮ জন স্নাতক এবং ৬৬ জন স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের মোট ১৩ জন শিক্ষার্থী প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তাদের মধ্যে গ্র্যাজুয়েট স্কুল থেকে একমাত্র এই সম্মাননা অর্জন করেন ইয়াসমিন আক্তার অধরা। একই অনুষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থী চেয়ারম্যান অ্যাওয়ার্ড এবং গ্র্যাজুয়েট স্কুলের পাঁচজন শিক্ষার্থী আউটস্ট্যান্ডিং থিসিস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
ইয়াসমিন আক্তার অধরার থিসিসের শিরোনাম “Internal Colonies of Aid and Mobility: Human Trafficking within the Rohingya Refugee–Host Community Landscape of Cox’s Bazar”।
গবেষণায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রেক্ষাপটে মানবিক সহায়তা, বাস্তুচ্যুতি, মানুষের চলাচল, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে মানবপাচারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিশেষ করে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং মানুষের চলাচলের ওপর থাকা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কীভাবে মানবপাচারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
গবেষণাটিতে রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু একটি শরণার্থী সংকট হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে জড়িত বৃহত্তর সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতাগুলো বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। মানবপাচার, মানুষের চলাচল, জীবিকার সুযোগ এবং নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত—গবেষণায় সে বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে ইয়াসমিন আক্তার অধরা বলেন, “এই স্বীকৃতি আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। একই সঙ্গে এটি আমার কাছে একটি বড় দায়িত্বেরও বিষয়। মানবপাচার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে একটি কঠিন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ আমার জন্য অনেক অর্থবহ ছিল।”
গবেষণার বিষয় নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু একটি শরণার্থী সংকট হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে জড়িত মানবপাচার, মানুষের চলাচল, জীবিকা ও সামাজিক বাস্তবতার জটিলতাগুলোকে বোঝার চেষ্টা করাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য।”
ইয়াসমিন আক্তার অধরা আরও বলেন, “গবেষণার সময় আমি উপলব্ধি করেছি, একটি সমস্যাকে বুঝতে হলে শুধু পরিসংখ্যান বা নীতিমালার দিকে তাকালেই হয় না; এর সঙ্গে জড়িত মানুষের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হয়।”
আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে গর্বিত ইয়াসমিন। তিনি বলেন, “সাংকংহে ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পাওয়া আমার জন্য নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ মুহূর্ত। এই অর্জনের পেছনে আমার পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী এবং গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা আমাকে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সবার অবদান রয়েছে। তাঁদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি গর্বিত। আমি বিশ্বাস করি, এই অর্জন আমার পথচলার শেষ নয়; বরং মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক সংকট নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা।”
ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে সাংকংহে ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট কিম কিয়ং-মুন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি শিক্ষার্থীদের এমন মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান জানান, যারা “দয়ালু কিন্তু অজ্ঞ নন” এবং “যোগ্য কিন্তু অহংকারী নন”।
পরিচিত ও স্বস্তিকর গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার জন্যও শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষার্থীরা যখন পথ হারিয়ে ফেলবেন, তখন তাঁদের হৃদয়ে থাকা ‘উন্মুক্ততা, ভাগ করে নেওয়া এবং সেবা’—এই মূল্যবোধ অনুসরণ করার পরামর্শ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ঘিরে মানবপাচারের মতো একটি জটিল সামাজিক ও মানবিক সমস্যা নিয়ে গবেষণার জন্য ইয়াসমিনের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাঁর একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের গবেষণা ও মানবাধিকারভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।