গোল্ডকোস্টে বিজিপিএএর গালা ডিনার ও সাংস্কৃতিক রাতে মাতলেন বাংলাদেশি চিকিৎসকরা

প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এক সন্ধ্যার জন্য যেন ফিরে এল বাংলাদেশ। স্মৃতিচারণ, আড্ডা, গান, নাচ, কবিতা, নাটক আর হাস্যরসে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টের নেরাং বাইসেন্টেনিয়াল হল। বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ জেনারেল প্রাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়া (বিজিপিএএ) আয়োজিত জমকালো গালা ডিনার অ্যান্ড কালচারাল নাইট ২০২৬-এর এবারের আয়োজনের নাম ছিল—‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’।

গত ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি চিকিৎসক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক বন্ধনকে উদ্‌যাপনের এই আয়োজন পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।

বিজিপিএএর সাধারণ সম্পাদক ডা. সাজিদুল ইসলামের সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সভাপতি ডা. পারভেজ খান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার বোরহান উদ্দিন।

এ সময় অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি চিকিৎসা পেশায় দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রবীণ জেনারেল প্র্যাকটিশনার ডা. আব্দুর রশীদ আলমগীর এবং ডা. কামালউদ্দিন আহমেদকে বিশেষ সম্মাননা প্রতীকী প্রদান করা হয়।

সম্মাননা প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন বিজিপিএএর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. তোজাম্মেল হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ডা. রফিকুর রহমান এবং সদ্য সাবেক সভাপতি ডা. এন এম নিজামুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ডা. নাহিদ সিনহা ও ডা. রুম্মান চৌধুরীর প্রাণবন্ত, সাবলীল ও কৌতুকপূর্ণ উপস্থাপনায় পুরো সন্ধ্যা হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত।

বিজিপিএএ আয়োজিত গালা ডিনার অ্যান্ড কালচারাল নাইট ২০২৬ চলছে। ছবি: লেখক

অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি চিকিৎসক এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের অংশগ্রহণে নাচ, গান, কবিতা ও নাট্য পরিবেশনায় জমে ওঠে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।

শুরুতেই ডা. রেশমী সেহেলী, ডা. বাহিজা খানম রত্না ও ডা. শাহরিয়া সুলতানা জবার দলগত ধ্রুপদী নৃত্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। তাঁদের নৃত্যের ছন্দে নেরাং হল যেন মুহূর্তেই হয়ে ওঠে ছোট্ট এক বাংলাদেশ।

এরপর ডা. পীযূষ সরকারের ব্যান্ড সংগীত দর্শকদের ফিরিয়ে নেয় নব্বই দশকের নস্টালজিয়ায়। ডা. খান মজলিস তাপসের চমকপ্রদ পরিবেশনাও দর্শকদের আনন্দ দেয়। তাসনিয়া ও মীমের দলগত পরিবেশনা ছিল অনুষ্ঠানের আরেকটি আকর্ষণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধ্যয়নরত মীমের সাবলীল নৃত্য বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ে।

স্থানীয় চিকিৎসক পরিবারগুলোর অংশগ্রহণে রকি বাংলা গ্রুপের গান ও নাচের সমন্বিত পরিবেশনাও দর্শকদের নজর কাড়ে। লাইভ গানের সঙ্গে অভিনব নৃত্য পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে দেয় ভিন্ন মাত্রা।

ছোট্ট আনিরার ‘পাতার বাঁশি’ গানের সঙ্গে ডা. মুশফিক ও ডা. শাহরিয়া সুলতানা তনয়ার নৃত্য পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পায়।

অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি ডা. শাহরিয়া সুলতানা জবার কবিতা পাঠ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় যোগ করে ভিন্ন আবহ। আর মধ্যবিরতির ঠিক আগে বিজিপিএএর শিক্ষা সম্পাদক ডা. রেশমী সেহেলীর একক নৃত্য দর্শকদের তুমুল আনন্দ দেয়।

বিজিপিএএ আয়োজিত গালা ডিনার অ্যান্ড কালচারাল নাইট ২০২৬ চলছে। ছবি: লেখক

সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন ব্রিসবেনপ্রবাসী বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ডা. রাপ্তি সারওয়াত। পেশায় চিকিৎসক হলেও সংগীতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পীর পরিবেশনায় সুর ও তালের অপূর্ব মেলবন্ধনে মুগ্ধ হন দর্শকরা।

তাঁর পরিবেশনা মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হয় পুরো হল। জানা গেছে, ডা. রাপ্তি সারওয়াতের মৌলিক গান ‘দূরত্ব’ খুব শিগগিরই তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।

গানের একপর্যায়ে মঞ্চে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন জীবনসঙ্গী সাব্বির আলম। তাঁদের দ্বৈত গান পরিবেশনা দর্শকদের বিশেষভাবে প্রশংসা কুড়ায়।

রাতের শেষভাগে ছিল অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত ও হাস্যরসাত্মক পরিবেশনা—বিজিপিএএর কালচারাল কমিটি প্রযোজিত ও পরিচালিত এক অভিনব হাইব্রিড যাত্রাপালা-নাচ-নাটক।

এর স্ক্রিপ্ট, স্ক্রিনপ্লে ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন বিজিপিএএর সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. রুম্মান চৌধুরী।

সিরাজউদ্দৌলা, ঘষেটি বেগম, মিস চুলবুলি, বুলবুলি, ঢাকাইয়া অ্যারিস্টটল, বাকের ভাই, মুনা ও বদি—এমন সব পরিচিত চরিত্রের ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা ও শিল্পীদের প্রাণবন্ত অভিনয়ে হলজুড়ে তৈরি হয় হাসির রোল। দর্শকদের অনেকেই হাসতে হাসতে রীতিমতো নাকাল হয়ে পড়েন।

স্মৃতিচারণ ও আড্ডার পাশাপাশি দেশীয় চা, পুরি, সিঙাড়া ও ঝাল আচারের স্বাদে সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে আরও আপন। নাচে-গানে ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন বাংলাদেশি চিকিৎসক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।

বিজিপিএএর এক্সিকিউটিভ অ্যান্ড কোর কমিটির সদস্য ডা. নকিবুল ইসলাম পুরো সাংস্কৃতিক পর্বের সমন্বয় করেন। তিনি জানান, আগামী বছর আরও বৃহৎ পরিসরে এবং আরও জমকালো আয়োজনে এ অনুষ্ঠান উদ্‌যাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

সবশেষে উপস্থিত অতিথি, শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন বিজিপিএএর সাধারণ সম্পাদক ডা. সাজিদুল ইসলাম। তখন ঘড়ির কাঁটায় আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টা।

প্রবাসের মাটিতে চিকিৎসকদের পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে নিজেদের সংস্কৃতি, শেকড় ও পারস্পরিক বন্ধনকে উদ্‌যাপনের এমন আয়োজন আবারও প্রমাণ করল—দেশ থেকে দূরে থাকা যায়, কিন্তু দেশকে হৃদয় থেকে দূরে রাখা যায় না।