চাঁদ নিয়ে কাড়াকাড়ির বছরে রহস্য বাড়াল এলিয়েন  

২০২৩ সালে বিজ্ঞানের যত অর্জন আর মাইলফলকের দেখা মিলেছে, তার বেশির ভাগের আলোটা কেড়ে নিয়েছে ভারত। দুবারের চেষ্টার পর তৃতীয়বার এসে এ বছর চাঁদের মাটি স্পর্শ করে দেশটির পাঠানো মহাকাশযান। তবে ভিনগ্রহের প্রাণি বা এলিয়েন ও ল্যাবে সূর্য বানানোর মতো ঘটনাও এবার ছিল আলোচনায়।

চাঁদ নিয়ে ‘কাড়াকাড়ি’

বছরের শুরুটা হয় চাঁদে আরও একটি সফল অভিযান শেষে পৃথিবীতে ফিরে আসা মার্কিন মহাকাশযান ওরিয়নের মধ্য দিয়ে। চাঁদে আবারও মানুষ পাঠাতে চায় নাসা। আর্টেমিস নামের ওই প্রকল্পের অংশ হিসেবে আর্টেমিস–১-এর একটি মিশন এই ওরিয়ন।

২০২২ সালে দুইবার চেষ্টা করেও মহাকাশযান পাঠাতে ব্যর্থ হয় নাসা। অবশেষে ওই বছরের ১৬ নভেম্বর তৃতীয় দফার চেষ্টায় চাঁদের উদ্দেশে মনুষ্যহীন ওরিয়ন মহাকাশযানের সফল উৎক্ষেপণ করে নাসা। পাঠানো হয় মানবদেহের সেন্সরসহ তিনটি ম্যানিকুইন। আর সফলভাবে এটি ফিরেও আসে এ বছরের জানুয়ারিতে। আর্টেমিস-৩ মিশনের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে প্রথম চাঁদে নারী পাঠাতে চায় নাসা।

এ বছরের ২৩ আগস্ট রোভার প্রজ্ঞানকে নিয়ে চাঁদের মাটিতে অবতরণ করে চন্দ্রযান-৩-এর ল্যান্ডার বিক্রম। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে গবেষণা কাজ শুরু করে ভারত। এর আগে কোনো দেশ চাঁদের দক্ষিণ মেরু স্পর্শ করতে পারেনি।

চাঁদের মাটিতে হাঁটে রোভার প্রজ্ঞান। ছবি: ইসরো

রাশিয়া মহাকাশযান পাঠালেও সেটি সফল অবতরণ করতে পারেনি। রাশিয়ার পাঠানো যানের নাম লুনা-২৫। এর মধ্য দিয়ে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যে প্রতিযোগিতায় রাশিয়া হেরে যায়। তবে চীনও এই প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়। দেশটি দাবি করে বসে, ভারত আদতে দক্ষিণ মেরুতে যেতে পারেনি। চীন প্রথম দক্ষিণ মেরুতে যাবে!

এ ছাড়া সূর্যেও অভিযান চালায় ভারত। সূর্য সম্পর্কে নানা অজানা তথ্য জানতে চলতি বছরের ২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে সূর্যের উদ্দেশে যাত্রা করে ভারতের মহাকাশযান আদিত্য-এল ১।

নতুন নতুন গ্রহের খোঁজ

২০২৩ সালটা নতুন গ্রহের খোঁজ পাওয়ার বছর বললে তেমন একটা ভুল বলা হবে না। এ বছরের জানুয়ারিতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে সৌরজগতের বাইরে পৃথিবীর প্রায় সমান আকৃতির গ্রহের সন্ধান পাওয়ার দাবি করে নাসা। গবেষকরা বলছেন, এলএইচএস ফোরসেভেনফাইভবি (LHS475B) নামের এই এক্সোপ্ল্যানেটটির উষ্ণতা পৃথিবীর চেয়ে কয়েক শ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

এ বছরই এপ্রিলে সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতির উপগ্রহে অনুসন্ধান চালাতে মহাকাশযান পাঠায় ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ)। অভিযানের নাম দেওয়া হয় জুস মিশন। মে মাসে মহাকাশে প্রথমবারের মতো বেসামরিক নভোচারী পাঠায় চীন। শেনচৌ-১৬ নামের মনুষ্যবাহী নভোযান পাঠায় দেশটি। এই নভোচারীরা যায় চীনের মহাকাশ কেন্দ্রে।

রহস্য বাড়াল ‘এলিয়েন’

শনাক্ত না হওয়া উড়ন্ত বস্তু (ইউএফও) নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে করা গবেষণার প্রতিবেদন ২০২৩ সালে প্রকাশ করে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ৩৩ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউএফও নিয়ে নতুন বৈজ্ঞানিক কৌশলে গবেষণা চালাতে হবে। এ জন্য অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইউএফও, এলিয়েন কিংবা ইউএপির কোনো প্রমাণ পায়নি সংস্থাটি। এ নিয়ে আরও গবেষণা করতে নতুন একজন ব্যক্তিকে প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

 তবে পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার প্রধান বিল নেলসন। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এলিয়েন রয়েছে। অজ্ঞাত বস্তু এলিয়েনের কিনা, সে ব্যাপারে কোনো প্রমাণ নাসা পায়নি। আমরা বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান করছি।’

গত সেপ্টেম্বরে অদ্ভুত দুটো মমি পাওয়ার দাবি করা হয় মেক্সিকোর কংগ্রেসে। তাতে বলা হয়, মমি দুটো এক হাজার বছর আগেকার। এগুলো মানুষের নয় বলে দাবি করেন গবেষকেরা। এলিয়েন নিয়ে গবেষণা করা মেক্সিকোর প্রখ্যাত সাংবাদিক জেমি মসান ওই অদ্ভূত আকারের দুটো মমি সকলের সামনে আনেন। ওই এলিয়েন দুইটির দেহে তিনটি করে আঙ্গুল এবং হাত ও পা রয়েছে বলে জানায় ইউএফও বিশেষজ্ঞরা।

মেক্সিকোর কংগ্রেসে প্রদর্শন করা আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘এলিয়েনের মমি’ঘিরে গেল ডিসেম্বরের প্রথম দিকে নতুন করে আবারও রহস্য দেখা দেয়। এবার রহস্য শুরু হয় এর ডিএনএ নিয়ে। ল্যাবে গবেষণার পর বিশেষজ্ঞরা জানান, এসব কঙ্কালের ৩০ শতাংশ ডিএনও কোনো প্রাণির সঙ্গে মিলছে না। এগুলো একদম স্বতন্ত্র!

মেক্সিকোতে প্রদর্শিত এই কঙ্কাল ঘিরে শুরু হয়েছে রহস্য। ছবি: রয়টার্স

ওই কঙ্কালের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে। তাতে পাওয়া গেছে, ৩০ শতাংশ অজানা জিনের হদিস। এই অজানা অংশটির সঙ্গে আদতে কোনো জীবেরই মিল নেই বলে জানান গবেষকেরা।

পৃথিবীতে যত রকমের প্রজাতি রয়েছে, তাদের সকলের জিনের একটি ডেটাবেস রয়েছে বিজ্ঞানীদের কাছে। কিন্তু কারোর ডিএনএর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি এই অংশটুকুর। এবার তাই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এ কঙ্কাল।

ল্যাবে বানানো হলো ক্ষুদ্র সূর্য

সূর্যের মতো নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী। আবারও একই কাজ করে দেখালেন তাঁরা। এ বছরের ৩০ জুলাই এ বিক্রিয়ায় পাওয়া যায় আগেরবারের চেয়ে বেশি শক্তি। এর মধ্য দিয়ে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উৎস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দুইটি পরীক্ষাই ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লাইভমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটিতে (এনআইএফ) চালান বিজ্ঞানীরা। সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান বলছে, সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটে থাকে। বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীতেই নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় সেই বিক্রিয়া ঘটানোর কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। এই পরীক্ষার সফলতার মধ্য দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।