চীনের ডিপসিকের তৈরি এআই চ্যাটবট এবার নিষিদ্ধ হলো সাউথ কোরিয়ায়। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ইস্যুতে ডিপসিকের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কমিশন। এর ফলে বর্তমানে সাউথ কোরিয়ায় নতুন করে ডিপসিক এআই চ্যাটবটের অ্যাপটি ডাউনলোড করা যাবে না।
সাউথ কোরিয়ার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কমিশন বলছে যে, শনিবার সন্ধ্যা (১৫ ফেব্রুয়ারি) থেকে তাঁদের দেশে গুগল ও অ্যাপলের অ্যাপস্টোরে ডিপসিক অ্যাপ্লিকেশনটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে সংস্থাটি এও জানিয়েছে, পর্যাপ্ত উন্নতি, সংশোধন ও প্রতিকারের মাধ্যমে ডিপসিক যদি দেশটির ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন মেনে চলে তাহলে অ্যাপটির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।
গত ১০ জানুয়ারি ডিপসিক তাঁদের এআই চ্যাটবট ‘ডিপসিক এআই অ্যাসিসট্যান্ট’ রিলিজ করে। এরপর ২০ জানুয়ারি তাঁরা নিয়ে আসে ‘আর১’ (আর ওয়ান) নামের এআই মডেলটি। উন্নত এআই মডেলটির কল্যাণে ডিপসিকের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ২৭ জানুয়ারির মধ্যে অ্যাপলের অ্যাপস্টোরে সর্বোচ্চ ডাউনলোড হওয়া ফ্রি অ্যাপের তালিকায় প্রথম স্থানে উঠে আসে ডিপসিকের চ্যাটবট অ্যাপটি।
এই প্রেক্ষাপটে সাউথ কোরিয়া’তেও দ্রুত বৃদ্ধি পায় ডিপসিকের ব্যবহার। এক পর্যায়ে সপ্তাহে ১০ লাখেরও বেশি ব্যবহারকারী আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয় অ্যাপটি, ফলে সাউথ কোরিয়ার অ্যাপ স্টোরেও শীর্ষে পৌঁছে যায় ডিপসিক। তবে এবার নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ডিপসিকের ব্যবহারে লাগাম টেনেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নজরদারির দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাটি।
ডিপসিকের ব্যাপারে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ অবশ্য এর আগেও নিয়েছে সাউথ কোরিয়া সরকার। বেশ কিছুদিন আগেই দেশটির বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তাদেরকে বারণ করা হয় তাঁরা যেন নিজেদের কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত ডিভাইসে ডিপসিকের এআই চ্যাটবট অ্যাপটি ডাউনলোড না করে।
সাউথ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট কোই স্যাং-মক ডিপসিকের আগমনে হতবাক হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এবং তিনি মনে করেন শুধু এআই খাতেই নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে দেশটির বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে।
সাউথ কোরিয়ার অ্যাপস্টোরে ডিপসিক নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ কী?
গুগল ও অ্যাপলের অ্যাপস্টোরে ডিপসিক নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে নতুন করে সাউথ কোরিয়ানরা এই এআই চ্যাটবটটি ডাউনলোড করতে পারবেন না। তবে যাদের ডিভাইসে অ্যাপটি রয়েছে তারা আগের মতোই অ্যাক্সেস করতে পারবেন ডিপসিক এআই। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ডাউনলোড করা না গেলে ডিপসিক ব্যবহার করা যাবে না। যাদের ফোনে ডিপসিক অ্যাপটি নেই, তাঁরা ডিপসিকের ওয়েবসাইটে গিয়ে ব্যবহার করতে পারেন চ্যাটবটটি।
গত মাসের শেষ দিকে এআই’র জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করা ডিপসিক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে ইতোমধ্যেই বেশ সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ- যেমন: ইতালি, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা- ইতোমধ্যেই ডিপসিক এআই’র বিরুদ্ধে পদক্ষেপও নিয়েছে।
তাইওয়ান ও অস্ট্রেলিয়াও সরকারি সকল প্রকার ডিভাইসে অ্যাপটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ইউরোপের দেশ ইতালিতে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে ডিপসিক এআই। ডিপসিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নীতিমালা সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়ে সন্তুষ্ট হতে না পেরে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালির নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
আমেরিকান আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ ইতোমধ্যেই সরকারি ডিভাইসে ডিপসিকের ব্যবহার নিষিদ্ধের প্রস্তাব করে একটি বিল নিয়ে এসেছে। ডিপসিক অ্যাপের মাধ্যমে চীন সরকার আমেরিকার উপর নজরদারি করতে পারে, এমন উদ্বেগ থেকেই ডিপসিক নিষিদ্ধ করার বিলটি নিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছে তাঁরা।
উল্লেখ্য, রিজনিং সক্ষমতার দিক থেকে ডিপসিকের ‘আর১’ মডেলটিকে আমেরিকা-ভিত্তিক শীর্ষ এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই’র উন্নত ‘০১’ (ও ওয়ান) মডেলের সাথে তুলনা করা যায়। অথচ ‘আর১’-এর প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা খরচ ‘০১’-এর ভগ্নাংশ পরিমাণ। ফলে এআই খাতে গুগল, ওপেনএআই’র মতো আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স