যে কারণে ইউরোপে বড় জরিমানার সম্মুখীন অ্যাপল ও মেটা

ইউরোপে বড় অংকের অর্থ জরিমানার সম্মুখীন আমেরিকান দুই শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল ও মেটা। আজ বুধবার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অ্যান্টিট্রাস্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা অ্যাপলকে ৫০০ মিলিয়ন ইউরো এবং মেটাকে ২০০ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করেছে। ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্টের অধীনে অ্যান্টিট্রাস্ট আইন লঙ্ঘন করায় এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে।

অ্যাপল ও মেটার বিরুদ্ধে এক বছরব্যাপী তদন্তের পর ইউরোপিয়ান কমিশন এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিল। প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যকলাপ ইউরোপের ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্টের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কি-না তা খতিয়ে দেখা হয়েছে তদন্তে। মোটা অংকের জরিমানার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান দুটিকে দু’মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্টের সাথে তাঁদের কার্যকলাপকে সঙ্গতিপূর্ণ করে তুলতে, অন্যথায় প্রতিদিন গুণতে হবে জরিমানা।

উল্লেখ্য, ইউরোপের বাজারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতেই প্রণীত হয়েছে ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্ট। 

অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের লক্ষ্যও প্রায় একই। ‘বিগ টেক’ খ্যাত শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা সীমিত করার মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা-বিরোধী কার্যকলাপ থেকে তাঁদেরকে বিরত রাখাই এই আইনটির মূল উদ্দেশ্য। এভাবে করে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।

ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্ট ও অ্যান্টিট্রাস্ট আইনে এর আগেও ভুগতে হয়েছে অ্যাপল ও মেটাকে। এবারের শাস্তির মাত্রা সে তুলনায় কিছুটা কম বলেই প্রতীয়মান হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নয়া শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটেই হয়তো আরও বড় শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ইউরোপ চাইছে না তাঁদের বিষয়ে ট্রাম্পের অসন্তুষ্টির মাত্রা আরও এক ধাপ বৃদ্ধি পাক।

অবশ্য মোটা অংকের জরিমানার প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে মেটা ও অ্যাপল। প্রায় একই সুরে তাঁরা ইউরোপের এই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। অ্যাপল বলেছে তাঁরা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জরিমানার সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানাবে।

ই-মেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে অ্যাপল বলেছে যে,  ইউরোপিয়ান কমিশন আরও একবার তাঁদের প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে। তাঁদেরকে ‘টার্গেট’ করার অভিযোগও এনেছে আইফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। কমিশনের এই সিদ্ধান্ত তাঁদের ‘ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার জন্য, এবং তাঁদের পণ্যের জন্য ক্ষতিকর’ বলেও জানিয়েছে তাঁরা। শুধু তাই নয়, কমিশন ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্টের অধীনে অ্যাপলের নিজস্ব প্রযুক্তিকে বিনামূল্যে ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

মেটার সুরও একই রকম। ই-মেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান গুরুতর অভিযোগ এনেছে কমিশনের বিরুদ্ধে। তাঁরা বলেছে, ‘ইউরোপীয় কমিশন সফল আমেরিকান ব্যবসায়গুলোকে পঙ্গু করার চেষ্টা করছে, অথচ চীনা ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে ভিন্ন মানদণ্ডের অধীনে কাজ করার অনুমতি দিচ্ছে।’ 

মেটা’র বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘এটি কেবল একটি জরিমানা নয়; কমিশন আমাদের ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তন করতে বাধ্য করছে, যা কার্যকরভাবে মেটার উপর বহু বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপ করার সমতুল্য, একই সাথে আমাদের একটি নিকৃষ্ট পরিষেবা প্রদান করতে বাধ্য করছে।’

মেটা স্পষ্টতই বিষয়টিকে ট্রাম্পের রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্কের আলোতে দেখতে চাইছে। হয়তো ট্রাম্পের হস্তক্ষেপও প্রত্যাশা করছে তাঁরা। 

মেটা ও অ্যাপলের বিরুদ্ধে বড় অংকের জরিমানার সিদ্ধান্ত যে ট্রাম্প প্রশাসনও ভালোভাবে নেবে না, এমনটা বেশ অনুমেয়। নয়া শুল্কনীতিতে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের হাত থেকে রেহাই পায়নি ইউরোপও। এই প্রেক্ষাপটে মেটা ও অ্যাপলের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আমেরিকা-ইউরোপ সম্পর্ককে কতটা প্রভাবিত করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স