অ্যাপল ও চ্যাটজিপিটি নির্মাতার বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাস্কের এআই প্রতিষ্ঠান

আইফোন নির্মাতা অ্যাপল ও চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই’র বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআই। প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বাজারে তাঁরা ন্যায্য প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্থ করতে গোপনে ষড়যন্ত্র করেছে। গতকাল সোমবার দায়েরকৃত মামলায় অ্যাপল-এর অ্যাপ স্টোরের র‍্যাঙ্কিং ব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ করেছে ইলন মাস্কের এক্সএআই।

মামলায় বলা হয়েছে, অ্যাপল ও ওপেনএআই ‘বাজারে নিজেদের একাধিপত্য ধরে রাখতে, এবং এক্স ও এক্সএআই-এর মতো উদ্ভাবকদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে বাজারগুলোকে নিজেদের দখলে নিয়েছে।’

উল্লেখ্য, অ্যাপল তাঁদের বিভিন্ন পণ্য যেমন আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাকে নিজেদের অপারেটিং সিস্টেমে ওপেনএআই’র জনপ্রিয় চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি-কে সমন্বয় করেছে।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, অ্যাপল যদি ওপেনএআই’র সাথে তাঁদের একচেটিয়া চুক্তি না-ই করবে তবে অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে এক্স ও গ্রোক অ্যাপ দুটিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে না ধরার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

অর্থাৎ, এক্সএআই’র সরাসরি অভিযোগ হচ্ছে, কেবলমাত্র ওপেনএআই’র সাথে চুক্তি করার কারণেই অ্যাপল তাঁদের অ্যাপ স্টোরের র‍্যাঙ্কিংয়ে এক্স ও গ্রোক অ্যাপ দুটিকে পিছিয়ে রেখেছে। মামলায় শুধু অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হয়নি মাস্কের এক্সএআই, সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাঁরা বিলিয়ন ডলার দাবি করছে। 

এক্সএআই’র করা মামলা প্রসঙ্গে অ্যাপলের কাছে মন্তব্য জনাতে চেয়ে রয়টার্সের করা অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব মেলেনি। তবে জবাব দিয়েছে ওপেনএআই। এক বিবৃতিতে স্টার্টআপটির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, ওপেনএআই’র সাম্প্রতিক এই অভিযোগ ইলন মাস্কের চলমান হয়রানির কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

মামলা দায়ের করার পর সোমবারই নিজের এক্স প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে মাস্ক মামলায় করা অভিযোগগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘গ্রোকের ১০ লাখেরও বেশি রিভিউ এবং ৪ দশমিক ৯ গড় রেটিং থাকা সত্ত্বেও অ্যাপল কোনো তালিকাতেই গ্রোকের নাম উল্লেখ করেনি।’

উল্লেখ্য, গত মাসেই অ্যাপলের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছিলেন ইলন মাস্ক। এক্স প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে তিনি জানিয়েছিলেন যে, অ্যাপলের এমন আচরণের কারণে ওপেনএআই ব্যতীত অন্য কোনো এআই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অ্যাপ স্টোরে প্রথম স্থানে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

২০২২ সালের নভেম্বরে এআই চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি নিয়ে এসে প্রযুক্তি জগতে রীতিমত আলোড়ন তৈরি করে ওপেনএআই। এর পর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁদেরকে। তবে ওপেনএআই’র এক সময়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের সাথে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছর ওপেনএআই-কে কিনে নিতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়ে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র করে তোলেন ইলন মাস্ক নিজেই।

অ্যাপল ও ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করার যে অভিযোগ এক্সএআই দায়ের করেছে সেটা কতটা যৌক্তিক তা আদালতই বিচার করবে। কিন্তু একই অভিযোগ ইলন মাস্কের স্টার্টআপ এক্সএআই’র বিরুদ্ধেও তোলার সুযোগ রয়েছে।

চলতি বছর মার্চে মাস্কের এক্সএআই তাঁরই মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-কে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে অধিগ্রহণ করে। এক্ষেত্রে তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, গ্রোক চ্যাটবটের প্রশিক্ষণে এক্স প্ল্যাটফর্মের ডেটা অবাধে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা। অর্থাৎ, চ্যাটবটটিকে আরো ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এখানেই শেষ নয়, মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা’র তৈরি গাড়িতে গ্রোক চ্যাটবটকে সমন্বয় করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ওপেনএআই ছেড়ে আসার পর থেকেই নিজের এআই প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রস্তুতি নেয় ইলন মাস্ক। এরপর ২০২৩ সালের মার্চে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এআই স্টার্টআপ এক্সএআই, যারা ইতোমধ্যেই গ্রোক নামের একটি এআই চ্যাটবট এনে বাজারে আলোড়ন তৈরি করেছে। এআই’র বাজারে এক্সএআই’র অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মাইক্রোসফট-সমর্থিত ওপেনএআই ও চীনের ডিপসিক।

প্রতিযোগিতা আইনের বিশেষজ্ঞরা- যারা এক্সএআই’র দায়ের করা মামলায় কোনোভাবে জড়িত নন- তাঁরা মনে করছেন, স্মার্টফোনের বাজারে অ্যাপলের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে এক্সএআই’র দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠতে পারে যে, অ্যাপল অবৈধভাবে তাঁদের আইফোনে ওপেনএআই’র চ্যাটজিপিটি-কে যুক্ত করেছে।

তবে পাল্টা যুক্তি হিসেবে অ্যাপল বলতে পারে যে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে ওপেনএআই-এর সাথে অংশীদারিত্বের চুক্তি করা ছিল সাধারণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত এবং বাজারে এক্সএআই’র মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাড়াতে সাহায্য করার কোনো বাধ্যবাধকতা তাঁদের নেই।

ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়া’র আইন স্কুলের শিক্ষক হার্বার্ট হোভেনক্যাম্প বলেছেন যে, অ্যাপল চাইলে যুক্তি হিসেবে এও বলতে পারে যে, তাঁদের অপারেটিং সিস্টেমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি যুক্ত করার পেছনে নিরাপত্তা বা অপারেশনাল কারণ রয়েছে।

আদালতে এক্সএআই’র করা এই মামলাটি ধোপে টিকবে কি-না তাঁর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য একটি বিষয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই’র জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো বাজার আছে কিনা এবং থাকলে তার পরিধি কতটুকু- এই বিষয়টি এক্সএআই’র মামালার কল্যাণে প্রথমবারের মতো খতিয়ে দেখার সুযোগ পাচ্ছে আমেরিকার আদালত। ভবিষ্যতে অ্যান্টিট্রাস্ট মামলায় প্রতিযোগিতা-বিরোধী কার্যকলাপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বিষয়।  

ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলো স্কুল অফ ল-এর অধ্যাপক ক্রিস্টিন বার্থোলোমিউ বলেছেন, ‘এটি একটি সতর্কবার্তা, যা নির্দেশ করে আদালতগুলো কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), এবং অ্যান্টিট্রাস্ট ও এআই-এর বিষয়গুলোকে মোকাবিলা করবে।’ 

উল্লেখ্য, পৃথক একটি মামলায় ওপেনএআই ও এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে লড়ছেন ইলন মাস্ক। ওপেনএআই যাতে অলাভজনক থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপান্তর হতে না পারে সেজন্য মামলা করেছেন মাস্ক। ২০১৫ সালে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠার সময় অল্টম্যান ও মাস্ক দু’জনেই ছিলেন এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স