পরিবেশবান্ধব জুতা তৈরি করে একসময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা মার্কিন কোম্পানি ‘অলবার্ডস’ এবার বড় ধরনের ব্যবসায়িক পরিবর্তন এনেছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, এখন থেকে তারা আর শুধু জুতা বানাবে না। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে কাজ করবে। এই খবর প্রকাশের পরই কোম্পানির শেয়ারের দাম একদিনে ৫৮০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে।
একসময় প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ছিল অলবার্ডস। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিক্রি কমে যাওয়ায় কোম্পানির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের জুতার ব্যবসা ও ব্র্যান্ড বিক্রি করে দেয় আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে।
এরপরই আসে নতুন ঘোষণা, অলবার্ডস এখন নিজেদের নাম বদলে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করবে ‘নিউবার্ড এআই’ নামে। নতুন এই কোম্পানি মূলত এআই কম্পিউটিং অবকাঠামো নিয়ে কাজ করবে। সহজভাবে বললে, তারা বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং পাওয়ার ভাড়া দেবে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, তারা একটি বড় বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) কিনবে। যা এআই প্রযুক্তি চালাতে ব্যবহৃত হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তারা পুরোপুরি এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবসায় প্রবেশ করতে চায়।
এই ঘোষণার পরই বাজারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদিনেই কোম্পানির শেয়ার ৬০০ শতাংশের কাছাকাছি বেড়ে যায়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্থান যতটা বড়, কোম্পানির বাস্তব ব্যবসায়িক ভিত্তি ততটা শক্ত নয়।
কারণ নতুন এই এআই ব্যবসায় অলবার্ডসের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। আগে যেটি ছিল পরিবেশবান্ধব জুতার ব্র্যান্ড, সেটি এখন পুরোপুরি প্রযুক্তি কোম্পানিতে রূপ নিচ্ছে। অলবার্ডস একসময় পরিচিত ছিল টেকসই উপকরণ দিয়ে তৈরি জুতার জন্য। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ ব্র্যান্ড হিসেবে এটি জনপ্রিয় ছিল।
কোম্পানিটি আগে এমনকি সার্টিফায়েড বেনিফিট কর্পোরেশন হিসেবেও কাজ করত। যেখানে পরিবেশ ও সামাজিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন ব্যবসায় এআই প্রযুক্তির কারণে প্রচুর বিদ্যুৎ ও শক্তি ব্যবহার হবে। যা আগের পরিবেশবান্ধব অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। এ কারণে কোম্পানি তাদের পরিবেশ সংক্রান্ত পুরোনো প্রতিশ্রুতি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জুতার ব্যবসায় ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ার পরই কোম্পানি এই বড় সিদ্ধান্ত নেয়। বিক্রি কমে যাওয়া এবং স্টোর পরিচালনায় ব্যর্থতার কারণে তারা মূল ব্যবসা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। একসময় যেটি ছিল দ্রুত বেড়ে ওঠা ফ্যাশন ব্র্যান্ড, সেটিই ধীরে ধীরে বাজার হারাতে থাকে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব্যবসার মৌলিক পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা এই ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। প্রযুক্তি খাতে ‘এআই’ শব্দটি যুক্ত হলেই বাজারে শেয়ারের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে, এমন প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরনের অতিরিক্ত উত্তেজনা বা ‘বাজার উন্মাদনা’। যেখানে বাস্তব সক্ষমতার চেয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এটি প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও কিছু কোম্পানি নতুন প্রযুক্তির ট্রেন্ড ধরতে ব্যবসা বদল করেছে। যেমন ২০১৭ সালে একটি পানীয় কোম্পানি ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে ঢোকার ঘোষণা দিয়ে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও পরে সেই ব্যবসা টেকেনি।
অলবার্ডসের এই হঠাৎ পরিবর্তন দেখাচ্ছে, প্রযুক্তির নতুন ঢেউ কীভাবে পুরোনো ব্যবসাকে বদলে দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ‘এআই’ শব্দ জুড়ে দিলেই দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া কঠিন। প্রকৃত সক্ষমতা ও বাস্তব ব্যবসায়িক পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।