কেন ২৫ বছরের পুরোনো প্রযুক্তিতে ফিরছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা? 

সাইবার অপরাধীদের নিত্যনতুন আক্রমণের মুখে যখন বিশ্বজুড়ে আধুনিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন সুরক্ষার এক অভিনব কৌশল হয়ে উঠেছে পুরোনো বা অপ্রচলিত প্রযুক্তির ব্যবহার। সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় যাকে বলা হয় সিকিউরিটি বাই অ্যান্টিকুইটি বা সিকিউরিটি বাই অবসোলেসেন্স।

ফিনল্যান্ডের খ্যাতিমান সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মিকো হিপ্পোনেন বহু বছর ধরে জিমেইল বা হটমেইলের মতো জনপ্রিয় মাধ্যম এড়িয়ে ইউডোরা নামের এক পুরোনো ইমেইল সফটওয়্যার ব্যবহার করেছেন। সফটওয়্যারটির কারিগরি সহায়তা বহু আগে বন্ধ হলেও হিপ্পোনেনের যুক্তি ছিল—হ্যাকাররা লাভজনক শিকারের খোঁজে থাকে। যে প্রযুক্তি মাত্র গুটিকয়েক মানুষ ব্যবহার করে, সেখানে সময় নষ্ট করার আগ্রহ হ্যাকারদের থাকে না।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, একদম হালনাগাদ ও প্যাচযুক্ত নতুন সফটওয়্যার ব্যবহার করাই হয়তো সর্বোচ্চ সুরক্ষার উপায়, কিন্তু কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে পুরোনো প্রযুক্তি আধুনিক প্রযুক্তির চেয়ে বেশি নিরাপদ প্রমাণিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী অধ্যাপক ম্যাট বিশপ একটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তারা একটি পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করে হ্যাকারদের ট্র্যাপ বা হানিপট তৈরি করলেও কোনো হ্যাকার তাতে আক্রমণ করেনি। অথচ সফটওয়্যারটি আপডেট করার পরপরই একের পর এক সাইবার হামলা শুরু হয়।

শুধু ইমেইল বা সফটওয়্যার নয়, যোগাযোগের ক্ষেত্রেও পুরোনো ডিভাইসের চাহিদা দেখা যাচ্ছে। হিপ্পোনেন ও বিশপ জানান, তাদের পরিচিত অনেকেই আধুনিক অ্যান্ড্রয়েড বা আইওএস বাদ দিয়ে ২৫ বছরের পুরোনো নোকিয়া ৯২১০-এর মতো ফিচার ফোন ব্যবহার করছেন। এতে স্মার্টফোনের মতো জটিল সাইবার হামলার সুযোগ নেই বললেই চলে।

একই নীতি প্রযোজ্য জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতেও। যেমন, জিপিএস প্রযুক্তিতে স্যাটেলাইট জ্যামিংয়ের ঝুঁকি বাড়ায় আয়ারল্যান্ডের এভিয়েশন অথরিটি পুরোনো ভূ-ভিত্তিক রেডিও নেভিগেশন ব্যবহারের প্রক্রিয়া জারি রেখেছে। সামরিক খাতে ইলোরানের মতো প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের শক্তিশালী রেডিও নেভিগেশন পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে, যা জ্যাম করা প্রায় অসম্ভব।

ইউক্রেন যুদ্ধের মতো আধুনিক সংঘাতের ময়দানেও কমান্ডো ও সেনারা ডিজিটাল ম্যাপের বদলে কাগজের ম্যাপ ও কম্পাস ব্যবহার করছেন। কারণ পেপার ম্যাপে কখনোই জ্যামিং বা হ্যাকিং সম্ভব নয়। এই সক্ষমতাকে বলা হয় অ্যানালগ রেসিলিয়েন্স।

আবার অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের চেয়ে কাগজের ব্যালটকেই বেশি নিরাপদ মনে করে, কারণ ডিজিটাল মাধ্যমে প্রভাব ফেলা সহজ হলেও কাগজের ভোট জালিয়াতি করা কঠিন।

র‍্যানসামওয়্যার হামলার যুগে ৫০-এর দশকে আবিষ্কৃত ম্যাগনেটিক টেপ আজও ডাটা ব্যাকআপের জন্য জনপ্রিয়। কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত না থাকায় ইন্টারনেট হ্যাকারদের পক্ষে এই টেপে সংরক্ষিত ফাইল এনক্রিপ্ট করা সম্ভব নয়।

সর্বোপরি, প্রতিদিনের কাজকর্মের জন্য আধুনিক আপডেটেড প্রযুক্তি ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে সাইবার বিশ্ব যত বেশি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, কৌশলগত নিরাপত্তার প্রয়োজনে পুরোনো ও এনালগ প্রযুক্তিতে ফিরে যাওয়ার এই প্রবণতা নতুন করে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।