চাঁদের চারপাশ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। এই মিশন শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, মহাকাশ নিয়ে মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ওরায়ন মহাকাশযানটি পুরো যাত্রায় দারুণভাবে কাজ করেছে। নভোচারীরা চাঁদের দূরের অংশের যে ছবি তুলেছেন, তা দেখে অনেকেই আবার মহাকাশ ভ্রমণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।
কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই সাফল্য কি আমাদের খুব দ্রুত চাঁদে বসবাস বা মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার পথ খুলে দেবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এত সহজ নয়। সামনে এখনও অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
চাঁদের চারপাশ ঘোরা সহজ, নামা কঠিন
অনেকে ভাবতে পারেন, যেহেতু মানুষ চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসতে পারছে। তাহলে চাঁদে নামাও হয়তো খুব সহজ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ১৯৬৯ সালে যখন নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন প্রথম চাঁদে পা রাখেন। তখন পৃথিবীর মানুষ ভেবেছিল খুব দ্রুতই মহাকাশে মানুষের বসবাস শুরু হবে। কিন্তু তা হয়নি।
এর কারণ ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা। অ্যাপোলো মিশন হয়েছিল মূলত ঠান্ডা যুদ্ধের প্রতিযোগিতার কারণে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল দেখাতে যে তারা প্রযুক্তিতে এগিয়ে। চাঁদে মানুষের পা রাখার মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়। এরপর ধীরে ধীরে আগ্রহ কমে যায়, বাজেটও কমে যায়। পরবর্তীতে অনেক মিশন বন্ধ হয়ে যায়।
এবার লক্ষ্য বদলেছে
বর্তমান আর্টেমিস মিশেনের লক্ষ্য আগের মতো নয়। এবার শুধু চাঁদে গিয়ে ফিরে আসা নয়। সেখানে নিয়মিত যাওয়া এবং ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, ২০২৮ সাল থেকে প্রতি বছর একটি করে মানুষবাহী চাঁদ মিশন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বছরেই আর্টেমিস-৫ মিশনের মাধ্যমে চাঁদে একটি বেস বা ঘাঁটি তৈরির কাজ শুরু হতে পারে।
শুনতে অনেকটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগলেও, বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি অসম্ভব নয়। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির প্রধান জোসেফ অ্যাশবাখার মনে করেন, ‘ভবিষ্যতে ‘চাঁদকেন্দ্রিক অর্থনীতি’ গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ চাঁদে কাজ, গবেষণা, এমনকি ব্যবসাও হতে পারে।’ তবে তিনি এটাও বলেছেন যে, এটি সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া।
বড় সমস্যা চাঁদে নামার যান
চাঁদে মানুষ নামাতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি বিশেষ ধরনের যান, যাকে ল্যান্ডার বলা হয়। এই ল্যান্ডার ছাড়া চাঁদের মাটিতে নামা সম্ভব নয়। এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুইটি বেসরকারি কোম্পানিকে স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিন।
স্পেসএক্স তৈরি করছে স্টারশিপের একটি বিশেষ সংস্করণ, যা চাঁদে নামবে। অন্যদিকে ব্লু অরিজিন তৈরি করছে ব্লু মুন নামের একটি ল্যান্ডার। কিন্তু সমস্যা হলো, দুইটি প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। স্টারশিপ ল্যান্ডার অন্তত দুই বছর পিছিয়ে গেছে। আর ব্লু মুন প্রকল্পও পিছিয়েছে কয়েক মাস। ফলে পুরো আর্টেমিস পরিকল্পনাই দেরির মুখে পড়তে পারে।
আগের মতো সহজ নয়
অনেকে ভাবতে পারেন, আগে যখন মানুষ চাঁদে গিয়েছে। তাহলে এখন কেন এত সমস্যা? আসলে এখনকার লক্ষ্য অনেক বড়। ১৯৬৯ সালে যে ল্যান্ডার দিয়ে মানুষ চাঁদে গিয়েছিল, সেটি ছিল খুব ছোট। শুধু দুইজন মানুষ নামত, কিছু নমুনা সংগ্রহ করত, তারপর ফিরে আসত। কিন্তু এখনকার পরিকল্পনা ভিন্ন।
এবার ল্যান্ডারে থাকতে হবে ভারী যন্ত্রপাতি, চাঁদে চলার গাড়ি (রোভার) এবং ভবিষ্যতের ঘাঁটির সরঞ্জাম। এত কিছু নিয়ে যেতে হলে অনেক বেশি জ্বালানি দরকার। যা একটি রকেটে পাঠানো সম্ভব নয়।
জ্বালানি নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
এই সমস্যার সমাধান হিসেবে একটি নতুন পরিকল্পনা করা হয়েছে। মহাকাশে একটি জ্বালানি ডিপো তৈরি করা হবে। বিভিন্ন রকেট দিয়ে ধাপে ধাপে সেখানে জ্বালানি পাঠানো হবে। তারপর সেই জ্বালানি ব্যবহার করে ল্যান্ডার চাঁদে যাবে। শুনতে সহজ লাগলেও, এটি অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।
মহাকাশে জ্বালানি রাখা মানে অত্যন্ত ঠান্ডা অবস্থায় তরল অক্সিজেন ও মিথেন সংরক্ষণ করা। এগুলোকে স্থিতিশীল রাখা এবং এক মহাকাশযান থেকে আরেকটিতে স্থানান্তর করা প্রযুক্তিগতভাবে খুব জটিল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীতে এই কাজ করা যতটা কঠিন, মহাকাশে তা আরও বেশি কঠিন হবে।
নতুন মহাকাশ প্রতিযোগিতা
আর্টেমিস প্রোগ্রামের সময়সূচির পেছনে রাজনৈতিক বিষয়ও আছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৮ সালের মধ্যেই আবার চাঁদে মানুষ পাঠাতে চায়। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই সময়ের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করা কঠিন হবে।
এর মধ্যেই নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে চীন। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। চীনের পরিকল্পনা তুলনামূলক সহজ। তারা আলাদা রকেট ব্যবহার করবে এবং মহাকাশে জ্বালানি ভরার জটিলতা এড়িয়ে যাচ্ছে।
যদি যুক্তরাষ্ট্রের মিশনে দেরি হয়। তাহলে চীন আগে চাঁদে পৌঁছে যেতে পারে। এমন আশঙ্কা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
আরও বড় চ্যালেঞ্জ মঙ্গল গ্রহ
চাঁদের পর মানুষের লক্ষ্য মঙ্গল গ্রহ। ইলন মাস্কও এই দশকের মধ্যেই মানুষকে মঙ্গলে পাঠাতে চান। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। মঙ্গলে যেতে সময় লাগে প্রায় ৭ থেকে ৯ মাস। এই দীর্ঘ যাত্রায় নভোচারীদের থাকতে হবে তীব্র বিকিরণের মধ্যে। নির্ভর করতে হবে সীমিত খাবার ও পানির ওপর। আর সেখানে কোনো জরুরি উদ্ধারের সুযোগ নেই।
এছাড়া মঙ্গলে অবতরণ করাও খুব কঠিন। সেখানে বায়ুমণ্ডল খুব পাতলা। ফলে বড় মহাকাশযান নামানো এবং আবার উড্ডয়ন করানো অত্যন্ত জটিল। এই কারণে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, ২০৪০ সালের আগে মঙ্গলে মানুষ পাঠানো সম্ভব নয়।
তবুও আশা কেন আছে
সব চ্যালেঞ্জের পরও আর্টেমিস-২ মিশন একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এটি প্রমাণ করেছে যে মানুষ আবার মহাকাশ অভিযানে বড় পদক্ষেপ নিতে পারছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলো একসঙ্গে কাজ করছে। আগে যেখানে সব কাজ করত সরকার। এখন সেখানে স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিনের মতো কোম্পানিগুলো বড় ভূমিকা রাখছে। এতে কাজের গতি বাড়ছে এবং নতুন প্রযুক্তি দ্রুত তৈরি হচ্ছে।
মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখা
মহাকাশ ভ্রমণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দেয়। আলেকজান্ডার গার্স্ট নামে একজন নভোচারী মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখে বলেছিলেন, ‘আমাদের এই গ্রহটি খুবই ছোট, সুন্দর এবং ভঙ্গুর।’ তার মতে, ‘যদি পৃথিবীর সব মানুষ একবার মহাকাশ থেকে এই দৃশ্য দেখতে পারত। তাহলে হয়তো আমরা আমাদের গ্রহকে আরও বেশি যত্ন নিতাম।’
আর্টেমিস-২ মিশন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে, মানুষ আবার চাঁদে যাওয়ার পথে এগোচ্ছে। কিন্তু চাঁদে নিয়মিত যাতায়াত, সেখানে বসবাস, কিংবা মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার স্বপ্ন, এসব বাস্তব করতে এখনও অনেক সময় লাগবে। প্রযুক্তিগত সমস্যা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সবকিছু মিলিয়ে পথটা সহজ নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, মানুষের কৌতূহল আর অনুসন্ধানের ইচ্ছা কখনও থেমে থাকে না। সেই ইচ্ছাই একদিন হয়তো আমাদের সত্যিই চাঁদে বসবাস করতে এবং মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি