সামাজিক মাধ্যাম এখন আর কেবল মত প্রকাশ বা যোগাযোগের জায়গা নয়। এসব প্ল্যাটফর্ম যেন হয়ে উঠেছে নিজের পরিচয়ের ডিজিটাল ব্যনার। পেশা, ব্যবসা, রাজনীতি ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ফেসবুক ও টুইটার (বর্তমান নাম এক্স)। তাই তো এই শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মগুলোই এখন হয়ে উঠেছে সাইবার অপরাধীদের প্রধান টার্গেট।
সম্প্রতি টুইটার ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনা বাড়তে থাকায় ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত কয়েক মাসে একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সাধারণ ব্যবহারকারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ভুয়া পোস্ট, কোথাও অর্থ আত্মসাৎ। আবার কোথাও রাজনৈতিক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ সামনে এসেছে।
কেন বাড়ছে হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের নির্ভরতা যত বাড়ছে, সাইবার অপরাধীদের আগ্রহও তত বাড়ছে। কারণ একটি হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট মানেই শুধু একটি প্রোফাইল নয়। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, বার্তা ও ব্যবসায়িক লেনদেন এমনকি মানুষের বিশ্বাস।
ফেসবুক ও টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মে এখন অনেকেই একই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে পেজ পরিচালনা, বিজ্ঞাপন চালানো, অনলাইন ব্যবসা এবং গণমাধ্যম কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ফলে একটি অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে ক্ষতির পরিমাণও বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে।
হ্যাকিংয়ের কৌশল: আগের চেয়ে আরও নিখুঁত
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এখনকার হ্যাকিং কৌশল আগের মতো সহজ নয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ফিশিং পদ্ধতি। ব্যবহারকারীর ইনবক্স বা ইমেইলে এমন একটি বার্তা পাঠানো হয়। আর যেখানে বলা হয়, অ্যাকাউন্টে কপিরাইট সমস্যা হয়েছে, কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভঙ্গ হয়েছে বা জরুরি ভেরিফিকেশন প্রয়োজন।
এই বার্তার সঙ্গে দেওয়া লিংকে ক্লিক করলে ব্যবহারকারীকে নিয়ে যাওয়া হয় নকল একটি লগইন পেজে। দেখতে একেবারে ফেসবুক বা টুইটারের মতো হলেও সেটি নিয়ন্ত্রণ করে হ্যাকাররা। সেখানে লগইন করলেই ব্যবহারকারীর ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড চলে যায় প্রতারকের হাতে।
আরেকটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল হলো হ্যাক হওয়া পরিচিতের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা। কোনো বন্ধুর অ্যাকাউন্ট আগে হ্যাক করে সেখান থেকে অন্যদের কাছে লিংক পাঠানো হয়। পরিচিত নাম দেখে অনেকেই সন্দেহ না করে ক্লিক করেন।
টুইটারও কেন ঝুঁকিতে?
টুইটার বা এক্স প্ল্যাটফর্মটি মূলত রাজনৈতিক মতামত, ব্রেকিং নিউজ ও প্রভাবশালী বক্তব্যের জায়গা হিসেবে পরিচিত। ফলে এখানে হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ভুল তথ্য বা উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে নাম ও ছবি অপরিবর্তিত রেখে ভেতরে ভেতরে পোস্ট দেওয়া হয়। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মী, জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ ছাড়া যেসব অ্যাকাউন্টের সঙ্গে ব্যবসায়িক পেজ, বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্ট বা অর্থনৈতিক লেনদেন যুক্ত, সেগুলো হ্যাকারদের কাছে বেশি মূল্যবান। কারণ এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন চালিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা যায়।
হ্যাক হলে কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে
হ্যাকিংয়ের পর অনেক ব্যবহারকারী প্রথমেই অ্যাকাউন্টে ঢুকতে না পারার সমস্যায় পড়েন। ইমেইল ও পাসওয়ার্ড বদলে দেওয়া হয়। এরপর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর পোস্ট, ভুয়া লিংক শেয়ার বা পরিচিতদের কাছে টাকা চাওয়ার মতো ঘটনা ঘটানো হয়।
ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন চালিয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির ঘটনাও ঘটছে। আবার সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে ভুয়া পোস্টের কারণে পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
ফেসবুক ও টুইটারের সতর্কবার্তা
ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা এবং টুইটার কর্তৃপক্ষ উভয়ই ব্যবহারকারীদের নিয়মিত সতর্ক করছে। তারা জানিয়েছে, কখনোই ব্যক্তিগত বার্তায় পাসওয়ার্ড বা কোড চাওয়া হয় না। সন্দেহজনক কোনো লিংকে ক্লিক না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দুই প্ল্যাটফর্মই ব্যবহারকারীদের টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখার ওপর জোর দিয়েছে, যাতে শুধু পাসওয়ার্ড জানলেই কেউ অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে না পারে।
ফেসবুক-টুইটার হ্যাকিং এড়াতে কী করবেন?
ফেসবুক ও টুইটার (এক্স) এখন অনেকের ব্যক্তিগত পরিচয়, কাজের মাধ্যম এবং আয়ের উৎস। কিন্তু একটু অসতর্ক হলেই এসব অ্যাকাউন্ট সাইবার অপরাধীদের হাতে চলে যেতে পারে। হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি পুরোপুরি শূন্যে নামানো সম্ভব না হলেও কিছু সচেতন অভ্যাস এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার: একই পাসওয়ার্ড বারবার ব্যবহার করা হ্যাকিংয়ের সবচেয়ে বড় কারণ। ফেসবুক ও টুইটারের জন্য আলাদা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। পাসওয়ার্ডে বড় হাতের ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্ন থাকলে নিরাপত্তা বাড়ে।
টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু: শুধু পাসওয়ার্ডের ওপর নির্ভর না করে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করুন। এতে নতুন ডিভাইস থেকে লগইন করতে গেলে অতিরিক্ত একটি কোড দিতে হয়, যা সাধারণত আপনার মোবাইলে আসে।
সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলুন: ইনবক্সে বা ইমেইলে আসা অচেনা লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন। ‘অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’, ‘ভেরিফিকেশন প্রয়োজন’-এ ধরনের বার্তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ফিশিংয়ের অংশ। পরিচিত কারও কাছ থেকে এলেও আগে যাচাই করা জরুরি।
সিকিউরিটি নোটিফিকেশন চালু: ফেসবুক ও টুইটার, দুই প্ল্যাটফর্মেই লগইন অ্যালার্ট চালু রাখলে নতুন ডিভাইস বা লোকেশন থেকে ঢোকার চেষ্টা হলে সঙ্গে সঙ্গে নোটিফিকেশন পাওয়া যায়।
অপ্রয়োজনীয় অনুমতি বাতিল: ফোনে অনেক সময় তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে লগইন করতে গিয়ে ফেসবুক বা টুইটার অ্যাকাউন্টের অনুমতি দেওয়া হয়। যেগুলো আর ব্যবহার করছেন না, সেগুলোর অ্যাকসেস নিয়মিত বাতিল করা উচিত।
ইমেইল অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখুন: ফেসবুক বা টুইটার যেই ইমেইলের সঙ্গে যুক্ত, সেটি হ্যাক হলে পুরো অ্যাকাউন্টই ঝুঁকিতে পড়ে। তাই ইমেইল অ্যাকাউন্টেও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন ব্যবহার করুন।
পাবলিক ওয়াই-ফাইয়ে সতর্ক: পাবলিক বা ফ্রি ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে লগইন করার সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। সম্ভব হলে এসব নেটওয়ার্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লগইন এড়িয়ে চলুন।
নিয়মিত সিকিউরিটি সেটিংস যাচাই: মাঝে মাঝে ফেসবুক ও টুইটারের সিকিউরিটি সেটিংসে গিয়ে লগইন হিস্ট্রি, ডিভাইস তালিকা ও নিরাপত্তা অপশনগুলো দেখে নেওয়া ভালো অভ্যাস।
ফেসবুক-টুইটার হ্যাক হলে কী করবেন?
সাম্প্রতিক সময়ে হ্যাকিংয়ের ঘটনা বাড়ছে। তাই তো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে কী করবেন? সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। প্রথমেই নিশ্চিত হোন অ্যাকাউন্ট সত্যিই হ্যাক হয়েছে কি না। হঠাৎ করে লগইন করতে না পারা, পাসওয়ার্ড বদলে যাওয়ার নোটিফিকেশন, নিজের অজান্তে পোস্ট বা মেসেজ পাঠানো, এগুলো হ্যাক হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। এ ছাড়া ইমেইলে যদি ‘আপনার অ্যাকাউন্টে নতুন ডিভাইস থেকে লগইন হয়েছে’ ধরনের বার্তা আসে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
দ্রুত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন: যদি এখনো অ্যাকাউন্টে ঢোকা যায়, তাহলে সময় নষ্ট না করে সঙ্গে সঙ্গে পাসওয়ার্ড বদলে ফেলুন। নতুন পাসওয়ার্ড যেন আগের কোনো পাসওয়ার্ডের সঙ্গে মিলে না যায়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইমেইল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডও পরিবর্তন করা জরুরি।
সব ডিভাইস থেকে লগআউট: ফেসবুক ও টুইটার, দুই প্ল্যাটফর্মেই ‘লগ আউট ফ্রম অল ডিভাইস’ বা ‘লগইন সেশন’ দেখার অপশন আছে। সেখানে গিয়ে অচেনা ডিভাইস বা লোকেশন থেকে লগইন থাকলে সেগুলো বন্ধ করে দিন।
অফিসিয়াল রিকভারি অপশনে রিপোর্ট: অ্যাকাউন্টে ঢোকা না গেলে ফেসবুকের ‘অ্যাকাউন্ট রিকভারি’ এবং টুইটারের ‘হেল্প সেন্টার’ অপশনে গিয়ে জানান যে আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে। সেখানে সাধারণত পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ইমেইল, ফোন নম্বর বা পরিচয়পত্র চাইতে পারে। সঠিক তথ্য দিলে অনেক ক্ষেত্রেই অ্যাকাউন্ট ফেরত পাওয়া যায়।
পরিচিতদের সতর্ক করুন: হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট থেকে অনেক সময় বন্ধু বা অনুসারীদের কাছে টাকা চাওয়া বা লিংক পাঠানো হয়। তাই অ্যাকাউন্ট উদ্ধার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিচিতদের জানানো জরুরি, যাতে তারা প্রতারণার শিকার না হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসবুক বা টুইটার হ্যাক হওয়া এখন আর অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তবে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে ক্ষতি অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব। ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেতনতা আর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।