সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কি ১৬ বছরের নিচে নিষিদ্ধ করা উচিত? এই প্রশ্ন এখন যুক্তরাজ্যে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার যেমন বিষয়টি নিয়ে জনমত নিচ্ছে, তেমনি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও চলছে নানা মতামত ও বিতর্ক।
উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৩৩ জন শিক্ষার্থী সম্প্রতি বিবিসি নিউজের ‘বিগ সোশ্যাল মিডিয়া ডিবেট’ নামে এক আলোচনায় অংশ নেয়। যেখানে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরে।
১৩ বছর বয়সী আইজ্যাক জানায়, ‘সে প্রতিদিন প্রায় চার ঘণ্টা টিকটক ব্যবহার করে। ছুটির দিনে সময় আরও বেড়ে যায়। ফুটবল, গেমিং আর সুপারহিরো ভিডিও দেখতে সে বেশি পছন্দ করে।’
তবে সে এটাও জানায়, ‘সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় এমন ভিডিও সামনে আসে যা কষ্ট দেয়। আবার অনেক কনটেন্ট রাগান্বিত বা চিন্তিত করে তোলে।’ যদি সে প্রধানমন্ত্রী হতো, তাহলে শিশুদের জন্য এসব কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করত।
১৪ বছর বয়সী ইগা জানায়, ‘সামাজিক মাধ্যমে সে এমন ভিডিও দেখেছে যেখানে মানুষ আত্মহত্যার চিন্তা বা মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করে।’ তার মতে, ‘সবকিছু দেখা যায়, যা দেখা উচিত না। এতে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে।’
তবে সে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার পক্ষে নয়। বরং তার মত, ১৩ বছরের নিচে সামাজিক মাধ্যম বন্ধ থাকা উচিত।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে সম্প্রতি ১৬ বছরের নিচে সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব তৃতীয়বারের মতো বাতিল হয়েছে।
সরকার এখন একটি জনপরামর্শ প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, যেখানে শিশুদের অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্ট, যেমন সহিংসতা, আত্মহত্যা, নারীবিদ্বেষ ও খাওয়াদাওয়া সংক্রান্ত। সেই সাথে এই ব্যাধি থেকে সুরক্ষার উপায় খোঁজা হচ্ছে।
ইগা মনে করে, ‘পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে কিছু কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা ভালো। তবে সে আশঙ্কা করে, পুরো নিষেধাজ্ঞা দিলে শিশুরা সহজেই উপায় বের করে নেবে।’
অস্ট্রেলিয়ায় ইতিমধ্যে ১৬ বছরের নিচে নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে গবেষণা বলছে, অনেক কিশোর এখনো বিভিন্নভাবে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
১৪ বছর বয়সী মেইজি মনে করে, ‘অটোপ্লে ও অসীম স্ক্রলিংয়ের মতো ফিচারগুলো আসক্তি বাড়ায়। এগুলো বন্ধ করলে শিশুদের মনোযোগ বাড়তে পারে এবং তারা অন্য কাজে আগ্রহী হবে।’
সে এমনকি শর্ট ভিডিও ফরম্যাট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পক্ষেও মত দেয়।
তার ভাষায়, ‘এগুলো শিশুদের মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং সময় নষ্ট করে।’
১৫ বছর বয়সী পিস মনে করে, ‘পুরো নিষেধাজ্ঞা ঠিক হবে না। তবে বয়স যাচাই কঠোর করা দরকার।’
তার মতে, ‘সামাজিক মাধ্যম বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ ও অনুপ্রেরণার জায়গা হিসেবেও কাজ করে। তাই সম্পূর্ণ বন্ধ করলে অনেক সুযোগও হারিয়ে যাবে।’
অনেক শিক্ষার্থীই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ছবি ব্যবহার করে ভুয়া বা আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরির বিষয়টি তাদের চিন্তায় ফেলছে।
এক শিক্ষার্থী বলে, ‘এটা শুনতেই খারাপ লাগে যে মানুষের ছবি ব্যবহার করে এমন কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে।’
সামাজিক মাধ্যম নিয়ে কিশোরদের মতামত এক নয়। কেউ নিষেধাজ্ঞা চায়, কেউ নিয়ন্ত্রণ চায়, আবার কেউ মনে করে এটি বন্ধ করা ঠিক হবে না।
আইজ্যাকের ভাষায়, ‘সম্পূর্ণ নিষেধ হলে জীবন খুব বেশি বদলাবে না, তবে বিরক্তি বাড়বে। কারণ বাইরে এখনও ফুটবল খেলার মতো অনেক কিছুই অপেক্ষা করছে।’
সরকার জানিয়েছে, জনপরামর্শ শেষে আগামী গ্রীষ্মে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি