দিল্লিতে ককরোচ আন্দোলনে ব্যবহৃত ‘বিটচ্যাট’ আসলে কী?

একবার ভেবে দেখুন তো, আপনি একটা বিশাল ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। চারপাশে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ, উত্তাল পরিস্থিতি। হঠাৎ খেয়াল করলেন, ফোনে কোনো ইন্টারনেট কাজ করছে না। ৪জি, ৫জি সব গায়েব। এমনকি জ্যামারের কারণে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে আপনি আপনার পাশের মানুষটিকে কীভাবে মেসেজ পাঠাবেন?

সম্প্রতি দিল্লির জন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছে। কিন্তু চমকপ্রদ বিষয় হলো, ইন্টারনেট আর মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ থাকার পরও আন্দোলনকারীরা দিব্যি নিজেদের মাঝে মেসেজ আদানপ্রদান করে যাচ্ছিলেন। 

কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হলো? এর নেপথ্যে রয়েছে একটি প্রযুক্তি, এবং একটি অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপ, যার নাম ‘বিটচ্যাট’। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক, ইন্টারনেট ছাড়া এই অ্যাপ কীভাবে কাজ করে, আর কেনই বা এটি নিয়ে ভারতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

বিটচ্যাট কী?

শুরুতেই বলে রাখি, আমরা প্রতিদিন যে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম বা সিগন্যাল অ্যাপ ব্যবহার করি, বিটচ্যাট কিন্তু সেগুলোর মতো নয়। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সের (সাবেক টুইটার) সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরসি অফিশিয়ালি এই অ্যাপটি সামনে আনেন। এটি সম্পূর্ণ একটি 'পিয়ার-টু-পিয়ার' অফলাইন মেসেজিং অ্যাপ।

অর্থাৎ, এই অ্যাপটি ব্যবহার করে মেসেজ আদানপ্রদানে ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন পড়ে না। শুধু তাই নয়, বিটচ্যাট ব্যবহার করতে এমনকি সিম কার্ড বা ফোন নম্বরও প্রয়োজন হয় না। এছাড়া অন্যান্য অ্যাপের মতো এতে ইমেইল আইডি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলারও বালাই নেই।

সহজ করে বললে, অ্যাপটি ডাউনলোডের পর ব্লুটুথ অন করে ইন্টারনেট ছাড়াই চ্যাট শুরু করে দিতে পারেন ব্যবহারকারীরা।

কীভাবে কাজ করে?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইন্টারনেট আর সার্ভার ছাড়া মেসেজ এক ফোন থেকে অন্য ফোনে যায় কীভাবে? এর মূল রহস্য লুকিয়ে আছে 'ব্লুটুথ মেশ নেটওয়ার্ক' প্রযুক্তিতে।

সাধারণত ব্লুটুথ দিয়ে ১০০ মিটারের বেশি দূরত্বে মেসেজ পাঠানো যায় না। কিন্তু বিটচ্যাট এক্ষেত্রে একটু চালাকি করে থাকে। ধরুন, আপনি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, আর আপনার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে আপনার থেকে ৫০০ মিটার দূরে। আপনাদের দু’জনের মাঝখানে আরও ১০ জন বিটচ্যাট ব্যবহারকারী আছেন।

আপনি যখন মেসেজ পাঠাবেন, বিটচ্যাট অ্যাপ আপনার ব্লুটুথ ব্যবহার করে মেসেজটি মাঝের ব্যবহারকারীদের ফোনে রিলে করে পাঠাতে থাকবে। অর্থাৎ, এক ফোনের ব্লুটুথ থেকে অন্য ফোনের ব্লুটুথ নেটওয়ার্কে লাফিয়ে লাফিয়ে মেসেজটি একেবারে শেষে আপনার বন্ধুর ফোনে পৌঁছে যাবে। ফলে নেটওয়ার্কে যত বেশি মানুষ থাকবে, এই অফলাইন সংযোগ তত বেশি শক্তিশালী হবে।

বিটচ্যাট কতটা সুবিধাজনক? 

বিষয়টি মজার, তাই না? তবে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনই নয়, এই প্রযুক্তি কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্রে জাদুকরী ভূমিকা রাখতে পারে। এই যেমন বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন টাওয়ার ভেঙে পড়ে, কিংবা স্টেডিয়ামের মতো প্রচণ্ড ভিড়ের জায়গায় যেখানে নেটওয়ার্ক জ্যাম হয়ে যায়, সেখানে বিটচ্যাট ব্যবহার করে অনায়াসে যোগাযোগ রাখা সম্ভব। আর এই প্রযুক্তিতে যেহেতু এমনকি ফোন নাম্বারও প্রয়োজন হয় না, তাই ব্যবহারকারীর প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও শতভাগ নিরাপদ থাকে। 

ভারত সরকার কেন এটি নিষিদ্ধ করতে চায়?

এত সুবিধা থাকার পরও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সাইবার ক্রাইম বিভাগ গিটহাব থেকে এই অ্যাপের সকল সোর্স কোড সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। জ্যাক ডরসি নিজেই তাঁর এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে সরকারের এই দাবির কথা প্রকাশ্যে এনেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? কেন ভারত সরকার এই অ্যাপটিকে নিষিদ্ধ করতে চাইছে? 

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও দেশটির সিকিউরিটি এজেন্সির দুশ্চিন্তা মূলত দুটো জায়গায়। প্রথমত, যেহেতু বিটচ্যাটে কোনো ফোন নম্বর বা আইডি ব্যবহার করা হয় না, তাই অপরাধমূলক কোনো কাজে এই অ্যাপটি ব্যবহার করা হলে তা ট্র্যাক করা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, আন্দোলন বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলেও বিটচ্যাটের কল্যাণে আন্দোলনকারীদের মাঝে যোগাযোগ বন্ধ করা যাচ্ছে না।

তবে বিটচ্যাট বন্ধ করতে সরকারের এই প্রচেষ্টাকে ডিজিটাল বাক-স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থাগুলো।  

জ্যাক ডরসির এক সপ্তাহের ছোট একটি এক্সপেরিমেন্ট যে প্রযুক্তি বিশ্বে এতটা আলোড়ন তৈরি করবে এবং রীতিমতো বিতর্কের জন্ম দেবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে একদিকে যেমন আছে বাক-স্বাধীনতার বিষয়, অন্যদিকে আছে দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি।

প্রশ্ন হচ্ছে, অফলাইন মেসেজিং অ্যাপ ‘বিটচ্যাট’ কি আগামী দিনে ইন্টারনেট শাটডাউনের সবচেয়ে বড় বিকল্প হতে চলেছে? উত্তরটা না হয় ভবিষ্যতের জন্যই তোলা রইলো।