আরেকটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ ক্রিকেট। ওয়ানডে’তে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয় করল টাইগাররা। আজ মিরপুরে তিন-ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অজিদেরকে ৫ উইকেটে হারিয়েছে মিরাজের বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার একই ভেন্যুতে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের স্বাদ পায় স্বাগতিকরা। আর আজ ছয়বাররে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে নিশ্চিত করল সিরিজ জয়।
আজ প্রথমে ব্যাট করে ৪২ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর যখন ৮ উইকেটে ১৮৭ তখনই বাধ সাধে প্রকৃতি। বৃষ্টির জন্য অনেকটা সময় খেলা বন্ধ থাকে। এরপর ম্যাচ যখন পুনরায় শুরু হয় তখন আর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাট করার জন্য যথেষ্ট সময় ছিল না। ফলে জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে ৪১ ওভারে ১৯২ রানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
স্বাগতিকরা ৫ উইকেট হারিয়ে ৬ ওভার হাতে রেখেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। আর তাতেই লেখা হয়ে যায় টাইগার ক্রিকেটের আরেকটি সোনালী অধ্যায়, আর সৃষ্টি হয় ইতিহাস।
প্রথম ম্যাচের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আজও সকালে টসে জেতেন অজি অধিনায়ক জশ ইংলিশ। তবে আজ বোলিং নয়, ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করতে খুব বেশি সময় নেয়নি অজি টপ অর্ডার। ইনিংসের প্রথম ১২ বলে শূন্য রানে তাঁদের তিন তিনজন ব্যাটার ফিরে গেলে অস্ট্রেলিয়ার স্কোরটা দাঁড়ায় ২ ওভারে শূন্য রানে ৩ উইকেট। স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়ে অজি অধিনায়কের মনে তখন কি চলছিল, সেটা কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়।
মোস্তাফিজ-তাসকিনের পাশাপাশি আজ বাঁহাতি স্পিনার তানভির ইসলামও ভুগিয়েছেন অজি ব্যাটারদের। তবে লোয়ার মিডল অর্ডারে লাবুশানের অপরাজিত ৫৫ এবং জাভিয়ের বার্টলেটের ৫২ রানের কল্যাণে অস্ট্রেলিয়ার স্কোরটা কিছুটা হলেও ভদ্রস্থ অবস্থানে পৌঁছায়। এর আগে অধিনায়ক ইংলিশের ৩৪ রান প্রাথমিক প্রতিরোধটা গড়ে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের হয়ে ৩টি করে উইকেট নিয়েছেন দুই পেসার তাসকিন ও মোস্তাফিজ। তানভির নিয়েছেন ২টি উইকেট।
বৃষ্টির সাময়িক বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্যটা দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২, প্রয়োজনীয় রানরেট ৫-এর কিছুটা নিচে। ব্যাটিংয়ে টাইগারদের শুরুটা ভালো হয়নি। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই তানজিদ তামিম শূন্য রানে ফিরে যান। তবে দলে ফেরা সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত দ্বিতীয় উইকেটে ৮৬ রান যোগ করে বাকিদের জন্য কাজটা অনেকটাই সহজ করে দেন।
সৌম্য-শান্ত দু’জনেই ৪২ রান করে আউট হলেও প্রয়োজনীয় রানরেটটা ঠিক রেখেছিলেন। ৫ চার ও ২ ছয়ে সাজানো সৌম্য’র ৪২ রান আসে ৪৭ বলে। অন্যদিকে, একই স্কোর করতে শান্তর খরচ হয় ৫৩ বল।
পরবর্তীতে লিটন ২১ রানে এবং মোসাদ্দেক সৈকত ১৫ রানে ফিরে গেলেও ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। সেখান থেকে দলকে ঐতিহাসিক জয়ের প্রান্তরে নিয়ে যান তৌহিদ হৃদয় ও অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ। হৃদয় ৫৫ বলে ৪০ এবং মিরাজ ২২ বলে ২২ রান করে অপরাজিত ছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে বার্টলেট, গ্রিন, রেনশ, জাম্পা ও মেরেডিথ ১টি করে উইকেট নিয়েছেন। অজিদের জন্য এবারের এশিয়া সফরটা যে দুঃস্বপ্নের মতো যাচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পাকিস্তানের কাছে ওডিআর সিরিজ হেরে বাংলাদেশে এসেও হারের বৃত্ত থেকে বেরোতে পারেনি তারা।
দীর্ঘ ১৫ বছর পর ঘরের মাটিতে ৫০ ওভারের ফরম্যাটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলছে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচের ২১ বছরের খরা কাটিয়েছে টাইগাররা। এরপর আজ গড়ল ইতিহাস।
অস্ট্রেলিয়ার এই দলটিতে তাঁদের প্রথম সারির বেশ ক’জন ক্রিকেটারই নেই। কেউ পড়েছেন ইনজুরিতে, কেউবা আছেন ছুটিতে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দলটার নাম যখন অস্ট্রেলিয়া- যাদের বিপক্ষে এই সিরিজের আগে ২২ ওয়ানডেতে টাইগারদের জয় ছিল মাত্র ১টি- তাঁদের সাথে পরপর ২ ম্যাচ জিতে সিরিজ নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে অনন্য এক অর্জন।
বিশেষ করে ঘরের মাঠে স্পিন-নির্ভর ফর্মুলা ক্রিকেট থেকে বের হয়ে এসে টাইগাররা যে এখন অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে পেস সহায়ক উইকেটেও ম্যাচ জয় করছে, আধিপত্য দেখাচ্ছে- সেটা হয়তো নতুন বাংলাদেশেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।