জুন মাসের শেষ দিকের কথা! মিরপুরে অপেক্ষাকৃত দুর্বল জিম্বাবুয়ের কাছে তিন দিনের মাথায় ইনিংস ব্যবধানে হেরে চরম সমালোচনার মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম। কিন্তু ঠিক তার কিছুদিন পরেই কী ঘটলো? সম্পূর্ণ বিপরীত এক রূপ। ডারউইন টেস্টে অজিদের ধুলো খাইয়ে শুধু ম্যাচই জেতেনি বাংলাদেশ, গড়েছে একের পর এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড। এশিয়ান ক্রিকেটের ইতিহাসে যা অনেকেই করতে পারেনি, তা করে দেখিয়েছে শান্ত-তামিম-হাসানরা। আজ জানব সেইসব রেকর্ডের পেছনের গল্প।
ডারউইন টেস্টের নাটকীয়তা
ডারউইন টেস্টের একদম প্রথম সেশন থেকেই বাংলাদেশ দল মাঠে নেমেছিল নিখুঁত এক মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে। প্রতিটি সেশনে সেই প্ল্যান বাস্তবায়নে কোনো ছাড় দেয়নি টাইগাররা। প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত বোলিং আক্রমণে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশ। জবাব দিতে নেমে চালকের আসনে বসে দল। তানজিদ তামিমের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, সাথে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত আর মেহেদী হাসান মিরাজের দায়িত্বশীল হাফ-সেঞ্চুরিতে ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তোলে ৪২৬ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে অজিরা কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও ২৮৪ রানেই থেমে যায় তাদের ইনিংস। জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। আর এই জয়ের সাথেই রচিত হয় এক নতুন ইতিহাস।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যে রেকর্ড এশিয়ার কারও নেই
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জেতা কতটা কঠিন, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশ্বের বড় বড় দলগুলো ক্যাঙ্গারুদের দেশে জয় পেতে যুগের পর যুগ অপেক্ষা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ? অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজেদের খেলা মাত্র ৩ নম্বর টেস্টেই জয়ের দেখা পেলো। এবার আসুন পরিসংখ্যানের খাতাটা একটু দেখে নেওয়া যাক—
সবচেয়ে কম ম্যাচে জয়ের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে ইংল্যান্ড। ১৮৭৭ সালে নিজেদের খেলা ২য় টেস্টেই অজিদের হারিয়েছিল ইংলিশরা। এরপর ১৯১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের ৩য় টেস্টে জয় পায়। আর এবার, বাংলাদেশ তাদের ৩য় টেস্টেই অজিদের হারিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে যৌথভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম দল হিসেবে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। ভেবে দেখুন, শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজের লেগেছিল ৫টি টেস্ট। পাকিস্তানের লেগেছিল ৭টি টেস্ট, আর ভারতের মতো পরাশক্তিকে প্রথম জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১২টি টেস্ট পর্যন্ত। এমনকি শ্রীলঙ্কা ১৫টি এবং জিম্বাবুয়ে ২টি টেস্ট খেলে আজও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো জয় পায়নি। সেখানে বাংলাদেশ ৩ নম্বর ম্যাচেই ছিনিয়ে এনেছে অবিস্মরণীয় এই জয়!
তামিমের বিরল সেঞ্চুরি
ম্যাচের অন্যতম সেরা নায়ক ছিলেন তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। ডারউইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন তিনি। আর এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে তিনি ঢুকে গেছেন ইতিহাস বিখ্যাত সব মহারথীদের তালিকায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচের প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ তামিম হলেন ইতিহাসের দ্বিতীয় এশিয়ান ব্যাটার। এর আগে ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের কিংবদন্তি হানিফ মোহাম্মদ অস্ট্রেলিয়ায় নিজের খেলা প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন। দীর্ঘ ৬২ বছর পর কোনো এশীয় ব্যাটার হিসেবে তানজিদ তামিম সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনলেন।
ভারতের কিংবদন্তি সুনিল গাভাস্কার ১৯৭৭ সালে এবং যশস্বী জয়সওয়াল ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ছিল ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে। মার্টিন ক্রো এবং স্যার গারফিল্ড সোবার্সের মতো বিশ্ববরণীয় ক্রিকেট আইকনদের পাশে তানজিদ তামিমের নাম উঠে যাওয়া নিশ্চিতভাবেই এক বিশাল গৌরব।
হাসান মাহমুদের ইতিহাস
ব্যাটিংয়ে তানজিদ তামিম আলো ছড়ালেও, বল হাতে অস্ট্রেলিয়াকে ধসিয়ে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন পেসার হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন হাসান। টেস্ট ক্রিকেটে এটি বাংলাদেশি পেসারদের মধ্যে তৃতীয় সেরা বোলিং ফিগার। বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সেরা ৩টি ইনিংস যদি আমরা দেখি—
২০০৮ সালে মিরপুরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে শাহাদাত হোসেনের ২৭ রানে ৬ উইকেট, ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এবাদত হোসেনের ৪৬ রানে ৬ উইকেট, আর এবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে হাসান মাহমুদের ৫৫ রানে ৬ উইকেট। শুধু তা-ই নয়, এই ম্যাচে ৯ উইকেট শিকার করে শাহাদাত হোসেন ও রবিউল ইসলামের পর এক টেস্টে ৯ উইকেট নেওয়া ৩য় বাংলাদেশি পেসার হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন হাসান মাহমুদ।
জিম্বাবুয়ের কাছে লজ্জাজনক হার থেকে ডারউইনে অজিদের হারিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি—বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানো প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা থাকলে যেকোনো পরাশক্তিকেই হারানো সম্ভব।