বাংলাদেশের এই হার মনে করিয়ে দিল পুরোনো লজ্জা

যাক, পেছাতে পেছাতে শেষ পর্যন্ত এই স্বস্তিতে এল যে, বাংলাদেশের বিশ্বকাপে রানের ব্যবধানে সবচেয়ে বড় হারটা আজ দেখতে হয়নি! 

ধর্মশালায় আজ ইংল্যান্ডের ৩৬৪ রানের জবাবে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত করতে পেরেছে ২২৭ রান। ১৩৭ রানে হেরে এই বিশ্বকাপের রান রেটের হিসাবে একটু পিছিয়ে গেল বাংলাদেশ, এই আর কী! অবশ্য রান রেটের হিসাব তো আসবে সেমিফাইনালে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৪-৫টি ম্যাচ জিতে গেলে। আপাতত তাই রানরেটে না তাকালেও চলছে। 

রান রেটের হিসাবের চেয়ে বরং তেতো রেকর্ড না হওয়ার স্বস্তিই সই - রানের ব্যবধানে এই হারটা বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের নয়, সেটি ২০৬ রানে - ২০১১ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৮ রানে অলআউট হওয়ার ওই ম্যাচে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চও নয়, সেটি ২০০৭ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৯৮ রানে। তবে এরপর আর স্বস্তির জায়গা নেই। রানের হিসাবে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হারের তালিকায় তিন নম্বর জায়গা দখল করে পোডিয়ামে জায়গা করে নিয়েছে আজকের এই হার।  

বাংলাদেশের আজ পুরো ম্যাচের গল্পটাই এমন। একের পর এক ধাপে আশার পারদ নিচে নামিয়ে এসে কোনো না কোনো স্বস্তি খুঁজে নেয়া।  

ইংল্যান্ডের ইনিংসের শেষদিকে বাংলাদেশ দারুণভাবে ফিরে আসার একটা স্বস্তি ছিল বটে, তবে স্বস্তিটা এই যে - অন্তত ৪০০ রান তো করতে দেয়া হয়নি ইংল্যান্ডকে! তবে এই স্বস্তির উল্টো পিঠেই বাস্তবতা বলছিল, ৪০০ রানের 'এভারেস্ট' না হলেও ইংল্যান্ড ৩৬৫ রানের 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' তো ঠিকই দাঁড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের সামনে। এত বছরে ওয়ানডেতে রান তাড়ায় মাত্র ৩২২ রানের 'কেওকারাডং' পার করার অভিজ্ঞ বাংলাদেশ যে এ ম্যাচে জিতবে না, সেটা তখনই ধরে নেয়া যাচ্ছিল। 

তখন অপেক্ষা ছিল, বাংলাদেশ অন্তত পাল্টা লড়াইটা করুক! প্রথম ওভারেই ক্রিস ওকসকে যখন লিটন দাস টানা তিন চার মারলেন, মনে হচ্ছিল, লড়াই কিছুটা হলেও জমবে। কিন্তু ভুল ভাঙতে এক ওভারের বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। এই ম্যাচেই মঈন আলীর বদলে দলে ঢোকা রিস টপলি গুঁড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশের টপ অর্ডার। দ্বিতীয় ওভারের চতুর্থ বলে ফেরালেন ওপেনার তানজিদ তামিমকে, পরের বলে আরও বড় ধাক্কা - গত এক-দেড় বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে ইনফর্ম ব্যাটসম্যান নাজমুল হোসেন শান্ত আউট গোল্ডেন ডাক নিয়ে। 

আশার পারদ নিচে নামল। লিটন-সাকিব-মুশফিকরা মিলে যদি ৩০০ ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে পারেন, তাতেও মুখরক্ষা হয়। ধন্য আশা কুহকিনী! কিন্তু আশার ভেলায় চড়ে বেশিদূর যাওয়া সম্ভব হলো না, বাস্তবতা আবার পানিতে ডোবাল। ষষ্ঠ ওভারে টপলির অসাধারণ এক ডেলিভারি উড়িয়ে নিল সাকিবের অফ স্টাম্প, নবম ওভারে ওকসের বলে মিরাজ ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন উইকেটকিপারের হাতে। দশ ওভারও না যেতেই, ৪৯ রানে ৪ উইকেট হাওয়া! আশায় বসবাস আর কতক্ষণ!

নতুন করে মনকে চোখ ঠারানো চলল - ও কিছু নয়, ইংল্যান্ডের মতো বড় দলের বিপক্ষে এমন হতেই পারে। অন্তত লিটন আর মুশফিকের ব্যাটে কিছুটা ঝলক দেখা দিলেই তো হারের ব্যবধানটা কমিয়ে আনতে পারে বাংলাদেশ। লিটন আর মুশফিকের জুটি হলো বটে ৭২ রানের, কিন্তু ওতে ভরসা জাগতে না জাগতেই ওকসের কাটারে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে এলেন লিটন। তার আগে ৬৬ বলে ৭ চার ২ ছক্কায় ৭৬ রানে কিছু শটে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন, আর ফর্মে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন লিটন - এটাই প্রাপ্তি। 

কিন্তু এর উল্টো পিঠে আশা আরেকবার পিছটান দিয়ে দিল। আশা নয়, আসলে ততক্ষণে শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে - বাংলাদেশ ২৫০ রান পর্যন্তও যেতে পারবে তো? ৩৬৫ রানের লক্ষ্যে ১২১ রানেই ইনিংসের অর্ধেক শেষ হওয়ার পর অমন প্রশ্ন জাগা অমূলকও নয়। মুশফিকুর রহিম শঙ্কাটা দূর করার চেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য হলো না সেটা। ফিফটি করার পরপরই সেই টপলির চতুর্থ শিকার হয়ে ফিরলেন মুশফিক। আউটটাতে হতাশার ব্যাপার হলো, ইনিংসের শুরুতে ভোগানো টপলির এই বলটা তেমন বিষমাখা ছিল না। বাউন্সার ছিল, সেটিতে ব্যাটকে চামচ বানিয়ে খেলতে গিয়ে থার্ডম্যানে ক্যাচ তুলে দিয়েছেন মুশফিক (৫১)। 

তখন আর আশা-দূরাশা কী, বাংলাদেশের বড় ব্যবধানে হারই ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছে বোঝা যাচ্ছিল। কতটুকু যেতে পারে বাংলাদেশ, সেটাই তখন প্রশ্ন। তাওহীদ হৃদয় (৩৯) দলকে দুই শ-র কাছাকাছি নিয়ে গেলেন। ১৮৯ রানে সপ্তম ব্যাটসম্যান হিসেবে ফেরার পর ভাবা যাচ্ছিল, ২০০ রানও যদি হয় আর কী! শেখ মেহেদি, তাসকিন, শরীফুলদের দুই অঙ্কে পৌঁছানো স্কোরে দুই শ পার হলো। 

এখানে একটা স্বস্তি খুঁজে নিতে পারেন, বিশ্বকাপে এবার কোনো দলের প্রতি ১০০ রানের জন্য তৃণমূল ক্রিকেটে ১০টি করে কিটব্যাগ পৌঁছে দেয়ার নিয়ম করা হয়েছে। বাংলাদেশ অন্তত ২০টা কিটব্যাগ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে এল!