প্রথম ৫ ওভারে মাত্র ১০ রান। বাংলাদেশের শুরুটা ঠিক প্রত্যাশিত ছিল না। পরের পাঁচ ওভারে তানজিদ হাসান তামিম ঝড় তুললেন। পাওয়ার প্লে-র শেষ ৫ ওভারে বাংলাদেশ তুলল ৬৩ রান। পাওয়ার প্লে শেষে বাংলাদেশের স্কোর বিনা উইকেটে ৬৩। পুনের ব্যাটিং উইকেটে এমন শুরুই তো চাই! বাংলাদেশের স্বপ্ন তখন সাড়ে তিন শ রানের।
সাড়ে তিন শ দূরে থাক। এক পর্যায়ে আড়াই শ হবে কি না, তা নিয়েই চিন্তা হচ্ছিল। ২০১ রানে শেষ স্বীকৃত ব্যাটিং জুটি ভেঙেছে। শেষ দিকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ৩৬ বলে ৪৬ রানের ইনিংসে কোনোরকমে ২৫০ পেরিয়েছে বাংলাদেশ। ৫০ ওভার ব্যাটিং করেছে - এটাকেই একমাত্র স্বস্তি মানতে পারেন, কারণ এর অন্যপাশে অস্বস্তি হয়ে দেখা দেবে এই তথ্য যে, শেষ বলে শরীফুলের দারুণ ছক্কায় ভারতকে 'মাত্র' ২৫৭ রানের লক্ষ্য দিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের ইনিংসকে মোটা দাগে দুটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া যায় - তানজিদ তামিম আউট হওয়ার আগে এবং তার পরে। প্রথম পাঁচ ওভারে 'টেস্ট' খেলে যেন উইকেটের হাল বুঝে নিয়েছিলেন লিটন-তানজিদ। এরপর শুরু হলো ঝড়। তানজিদের ব্যাটেই বেশি! বুমরাকে ছক্কা হাঁকিয়ে যেন হাত মকশো করলেন, এরপর সিরাজ-শার্দুল সবাইকেই বাউন্ডারিছাড়া করেছেন। তানজিদের অন্য প্রান্তে লিটনও তখন বেরিয়েছেন খোলস ভেঙে।
অষ্টম থেকে দশম - টানা তিন ওভারে দুই অঙ্কে রান এল, দশম ওভারে তো ১৬ রান নিয়ে এক ধাক্কায় ৬৩ হয়ে গেল বাংলাদেশের রান। পাওয়ার প্লে-র পর অতটা না হলেও ঝড় একেবারে থামেনি। ৪১ বলে ওয়ানডেতে প্রথম ফিফটি পূর্ণ করে ফেললেন তানজিদ (৫ চার, ৩ ছক্কা)।
কিন্তু ফিফটি করার পরই দম ছেড়ে দিল তানজিদের ব্যাট। ফিফটি করার পরই কুলদীপ যাদবের বলে এলবিডাব্লিউ হয়ে গেলেন (৪৩ বলে ৫১)। বাংলাদেশের দাপটেরও শেষ যেন সেখানেই। তানজিদ আউট হওয়ার সময়ে লিটনের রান ছিল ৩৯ (৪৫ বলে), কিন্তু লিটন ফিফটি পাওয়ার আগে আরেকবার উইকেটের উদ্যাপন ভারতের। বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা - শান্ত এলবিডাব্লিউ হয়ে গেলেন জাদেজার (১৫ বলে ৮) বলে। বিশ্বকাপের আগে দারুণ ছন্দে থাকা শান্ত বিশ্বমঞ্চে এসে হঠাৎই ছন্দহীন, অথচ আজ চোটে সাকিবের অনুপস্থিতিতে অধিনায়কত্ব করা শান্তর কাছ থেকে ব্যাটিংয়েও বাড়তি প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের।
দ্রুত দুই উইকেট হারিয়ে ঝড়-টড় বাদ দিয়ে আবার ইনিংস পুনর্গঠনে মনোযোগ দিতে হলো বাংলাদেশকে। কিন্তু সাড়ে তিন শ-র আশা একপাশে রেখে তখন তিন শ-টিন শ হলেই বাংলাদেশ খুশি। কিন্তু সেই আশাও যে কিছুক্ষণের মধ্যে হাওয়া হয়ে যাবে, তা কে জানত!
কুলদীপের বলে সিঙ্গেল নিয়ে লিটন ফিফটিতে পৌঁছালেন বটে (৬২ বলে), ২৪তম ওভারে জাদেজাকে টানা দুই চার মেরে কিছুটা জাগিয়ে তুলেছিলেন গ্যালারিতে কতিপয় বাংলাদেশিদের। কিন্তু অন্য প্রান্তে মিরাজকে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান বানানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আরেকবার ব্যর্থতা। ২৫তম ওভারের প্রথম বলে সিরাজের নির্বিষ, লেগ সাইড দিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকা বলে খোঁচা দিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন মিরাজ (১৩ বলে ৩)।
আরও বড় ধাক্কা তখনো অপেক্ষায়! বাংলাদেশ ইনিংস পুনর্গঠনে নেমেছে আরও আগ থেকেই, কিন্তু একদিকে লিটন সেট ছিলেন বলে অতটা দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়নি তখনো। কিন্তু ২৮তম ওভারে জাদেজাকে ইনসাইড-আউটে উড়িয়ে মারতে গিয়ে লং অনে গিলের হাতে ধরা পড়লেন লিটনও। শেষ হলো তাঁর ৮২ বলে ৬৬ রানের ইনিংস। লিটন রানে ফিরেছেন বটে, কিন্তু পুনের এই ব্যাটিংস্বর্গে, বাংলাদেশের ইনিংসের অমন প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর আউটটা বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে বেশ।
ক্রিজে তখন নতুন দুই ব্যাটসম্যান - মুশফিক আর তাওহিদ হৃদয়। ইনিংস মেরামতের পাশাপাশি রানের গতিও ঠিক রাখার দুই গুরুদায়িত্ব তাঁদের কাঁধে। এরপর স্বীকৃত ব্যাটসম্যান বলতে শুধু মাহমুদউল্লাহ, অথচ ইনিংসের তখনো অর্ধেকের বেশি বাকি। বাংলাদেশের আশায় তাই আরেকবার লাগাম পরাতে হলো - ৩০০ না হোক, অন্তত ২৭৫-২৮০ তো হবে!
হৃদয় ক্রিজে স্বস্তিতে ছিলেন না, রানের দায়িত্বটা তাই মুশফিকই নিয়েছেন। ৩২তম ওভারের প্রথম বলে জাদেজাকে স্লগ সুইপে ছক্কা মেরে বাংলাদেশকে দেড় শ পার করালেন, কিছুক্ষণ পর বুমরাকে দারুণ স্কয়ার ড্রাইভে চার মারলেন। পঞ্চম উইকেটে জুটিটা ধীরে হলেও বড় হচ্ছিল। কিন্তু আবার আশা কিছুটা ফিরতে না ফিরতেই আবার ধাক্কা! ৩৮তম ওভারের দ্বিতীয় বলে শার্দুল ঠাকুরের ক্রস সিম ডেলিভারিতে উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিড অনে সহজ ক্যাচ দিয়ে শেষ হলো হৃদয়ের ৩৫ বলে ১৬ রানের সংগ্রাম। জুটি ভাঙল ৪২ রানে।
বাংলাদেশ তখন বাকি ১৩ ওভারে মুশফিক আর মাহমুদউল্লাহর ব্যাটেই আবার স্বপ্ন বুনেছে। আশার পারদ আরেকটু নিচে নেমেছে তখন - ২৫০ হবে তো! মাহমুদউল্লাহ নেমেই ভরসা হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখালেন। সিরাজকে দারুণ ফরোয়ার্ড ড্রাইভে চার মারার পর কুলদীপকে এগিয়ে এসে দারুণ ছক্কা হাঁকিয়েছেন। ৪৩তম ওভারের প্রথম বলে বাংলাদেশের রান ২০০ পেরোল। আবার আশা জাগল, মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ টিকে থাকলে বাকি ৪১ বলে ৬০-৭০ রানও তো হতে পারে।
আশার গুড়ে বালি! বুমরার করা ৪৩তম ওভারের তৃতীয় বলটা হলো স্লোয়ার, ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন মুশফিক। কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়া জাদেজার অসাধারণ ক্যাচের শিকার হয়ে শেষ হলো মুশফিকের ৪৬ বলে ৩৮ রানের ইনিংস।
বাংলাদেশের তখন একমাত্র ভরসা - মাহমুদউল্লাহ!
মুশফিক আউট হওয়ার সময়ে তাঁর রান ছিল ১৯ বলে ১৪, মুশফিক ফেরার পর ওভার দুয়েকে তেমন কিছু হয়নি। তবে ৪৬তম ওভারে শার্দুলকে টানা দুই বলে চার-ছক্কা মারলেন মাহমুদউল্লাহ, দুটিই দারুণ শটে। পরের ওভারে নাসুম সিরাজের প্রথম পাঁচ বলে দুই চার মারার পর ষষ্ঠ বলে আউট হয়ে গেছেন উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে (১৮ বলে ১৪)।
কিন্তু মাহমুদউল্লাহ ৪৮তম ওভারে আবার বুমরাকে চার মারলেন, তার পরের ওভারে সিরাজকে বিশাল ছক্কা! ২৫০ রান তখন হয়েই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, বরং বাংলাদেশ আরও ১০-১৫ রান বেশি করতে পারে কি না, তা-ই তখন স্বপ্ন। আবার স্বপ্নে বাঁধ পড়ল শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে! বুমরার চোখধাঁধানো এক ইয়র্কারে বোল্ড মাহমুদউল্লাহ, এ বল ঠেকাতে দুনিয়ার সেরা কোনো ব্যাটসম্যানকেও নিশ্চিত খাবি খেতে হতো। দলকে ২৪৮ রানে রেখে ফিরলেন মাহমুদউল্লাহ। এরপর শরীফুল ও মোস্তাফিজ পরপর দুটি সিঙ্গেল নিয়ে ২৫০ পার করালেন। শেষ বলে শরীফুল মারলেন এক ছক্কা!
কিন্তু এই রান যথেষ্ট হবে তো?