প্রতিভাবানরা নাকি সহজেই সবকিছু পেয়ে যান। সাফল্যের স্পর্শ পান অনায়াসে। সাধারণের মধ্যে তাঁরা অসাধারণ। হতভাগাদের মধ্যে ভাগ্যবান। যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগ সময়ে এমন ইতিবাচক কথাই শোনা যাবে।
জোনাথন ট্রট হয়তো কথাগুলো শুনে আপত্তি করবেন না। সাফল্যের স্পর্শ পাননি, সাধারণের মধ্যে থেকেও অসাধারণ ছিলেন না - বলে বসবেন না হয়তো। অবশ্য আপত্তি করতে পারেন অন্য ক্ষেত্রে। আর আপত্তি করলে করবেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই। জীবনে প্রতিভা নামের আশীর্বাদের উপস্থিতির সুফল পেয়েছেন। আবার সে আশীর্বাদ অজান্তেই যখন ধীরে ধীরে অভিশাপে রূপ নিয়েছে - সে কষ্টও সহ্য করেছেন।
প্রতিভাবান হওয়া মানেই কি আজীবন সাফল্যের চূড়ায় বসে থাকার লাইসেন্স পেয়ে যাওয়া? অবশ্যই নয়। প্রতিভার উপজাত হয়ে চব্বিশ ঘন্টা পিছু পিছু ঘুরে বেড়ায় প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা ঠিকঠাক মেটানো গেল কি না, প্রতিভার প্রতি সুবিচার করা হলো কি না - অদৃশ্য চাপ হয়ে জেঁকে বসে প্রতিভাবানদের ওপর। কেউ সে চাপকে সাফল্যের চূড়া থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে আজীবন সেখানে থেকে যান, তবে অধিকাংশই কাঁধের ওপর সওয়ার সেই চাপ সামলাতে না পেরে চূড়া থেকে পড়ে যান ব্যর্থতার গিরিখাদে।
ট্রট সবকিছুই জানেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই। ওয়ারউইকশায়ারের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ছিলেন। রানের বন্যা বইয়ে যখন জাতীয় দলে সুযোগ পেলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্তহীন চাপ এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে অভিষেকেই সেঞ্চুরি করেছিলেন। নিশ্চিত করলেন ইংল্যান্ডের অ্যাশেজ জয়। এক সময় ইংল্যান্ড যে অ্যাশেজ শুধু স্বপ্নেই জিতত, ট্রটদের হাত ধরে তিনবার সে স্বপ্ন বাস্তব হলো। সাফল্যের পাল্লা ভারী হচ্ছিল। দলগত, ব্যক্তিগত - দুই দিক দিয়েই।
পাল্লা ভারী হচ্ছিল আরও এক জিনিসের। ওই যে, প্রতিভাবান হওয়ার যন্ত্রণা - প্রত্যাশার চাপ!
ব্রিটিশ মিডিয়া ততদিনে তাঁকে ব্র্যাডম্যানের সমান মর্যাদা দেওয়া শুরু করেছে। উঠিয়ে দিয়েছে সাফল্যের চূড়ায়। এমনিতেই ‘পারফেকশনিস্ট’ ছিলেন, ব্যর্থতা সহ্য করতে পারতেন না মোটেও। সব মিলিয়ে প্রতি ম্যাচে ব্র্যাডম্যানীয় পারফরম্যান্স দেখানোর অবিশ্বাস্য প্রত্যাশা ভর করল কাঁধে। যতক্ষণ নিজের মধ্যে ডুবে থাকতেন, পরিবারের সঙ্গে থাকতেন, হোটেলে থাকতেন - ঠিক থাকতেন। হোটেল থেকে মাঠের পথে পা বাড়ালেই অন্তহীন সেই চাপে ন্যুব্জ হয়ে যেতেন। অবাস্তব সাফল্যক্ষুধায় নিজের সবচেয়ে পছন্দের কাজটাকে ঘেন্না করা শুরু করলেন। নিজেই স্কাই স্পোর্টসের এক পডকাস্টে স্বীকার করেছিলেন, ‘আই বিগ্যান টু ড্রেড দ্য গেইম আই লাভড অল মাই লাইফ।’
কী নিদারুণ অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স, তাই না? পছন্দের কাজটাকে এতটাই ভালোবাসতেন, পরে সে ভালোবাসা রূপ নেয় অপছন্দে। অপছন্দ থেকে অবসাদ, বিষণ্ণতা, উৎকণ্ঠা, ভয়, দুর্ভাবনা, আশঙ্কা - আরও কত কী!
অতঃপর অবসর।
অনেক প্রতিভাবানের জীবন কাহিনি হয়তো এখানেই থেমে যেত। তবে ট্রট থামেননি। অবসাদ তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনকে থামিয়ে দিলেও, খেলার প্রতি আগ্রহ দমাতে পারেনি। কোমায় চলে যাওয়া সেই ভালোবাসা আস্তে আস্তে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বিষণ্ণতার বিষবাষ্প থেকে আবারও ফুটেছে সম্ভাবনার ফুল।
সে সম্ভাবনা সাফল্যের, আবারও কিছু করে দেখানোর। সবাইকে জানানোর, প্রতিভাবান মানুষটির আজও ক্রিকেটকে অনেক কিছুই দেওয়ার আছে।
আফগানিস্তান হয়তো দিনশেষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠতে পারবে না। কিন্তু তাতে কি? জয়-পরাজয় ছাড়াও প্রাপ্তির খাতায় আরও অনেক কিছু সোনার হরফে লেখা যায় বলেই তো ক্রিকেট এত সুন্দর!
অবসাদের কাছে হার না মানা ট্রট যে আফগানিস্তানকে জয়ের মন্ত্র পড়িয়ে আবারও ক্রিকেটকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন, এটাই বা কম কীসে? ক্রিকেটের এই মনোযোগী ছাত্রকে অবসাদের হাত থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আফগানিস্তান একটা ধন্যবাদ পেতেই পারে!