আইপিএলের ইতিহাসেই এমন কিছু দেখা যায়নি কখনো। খেলোয়াড় অদলবদলের নিয়ম চালু আছে ঠিক। তাই বলে নিলাম হওয়ার আগে দলের অধিনায়ক এবং মূল তারকা, যিনি আবার ভারত দলের গুরুত্বপূর্ণ এমন কোনো ক্রিকেটারকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে ছেড়ে দেওয়া?
এমনই অবিশ্বাস্য কাণ্ড দেখিয়েছে গুজরাট টাইটানস। তৃতীয় আইপিএল খেলতে নামা দলটি অধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়াকে ছেড়ে দিয়েছে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের কাছে। এর কারণ কী হতে পারে, এ নিয়ে অনেক কৌতূহল ছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, গুজরাটকে ১০০ কোটি রুপি দিয়ে তবেই রাজি করিয়েছে মুম্বাই।
পান্ডিয়ার দলবদল এমনিতেই ভ্রুকুঞ্চন করেছে অনেক। আইপিএলে পেস বোলিং অলরাউন্ডার নিয়ে টানাটানি কম না। এ কারণেই ক্যামেরন গ্রিন বা স্যাম কারেনদের জন্য গত আইপিএলে রেকর্ড ভাঙা দর হাঁকানো হয়েছিল। শার্দূল ঠাকুরও তাই প্রতিবার অন্তত ১০ কোটি রূপি বাগিয়ে নেন।
গুণে-মানে এঁদের সবার চেয়ে এগিয়ে হার্দিক পান্ডিয়া। সে সঙ্গে আরও কয়েকটি গুণ আছে তাঁর- তিনি ভারতীয়, ফলে বিদেশি কোটা ব্যবহার করতে হচ্ছে না, অধিনায়ক হিসেবে গুজরাটকে আইপিএল এনে দিয়েছেন, এবং ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন সম্প্রীতি। এমন এক ব্র্যান্ডকে মাত্র ১৫ কোটি রুপিতে ধরে রাখার সুযোগ কে হাতছাড়া করে।
এর মধ্যেই খবর আসে, বিশ্বকাপের আগেই গোপনে পাণ্ডিয়ার সঙ্গে কথা বলে রেখেছিল মুম্বাই। এবং পান্ডিয়া শর্ত দেন, তাঁকে অধিনায়ক বানানো হলেই শুধু দল পরিবর্তন করবেন। অথচ নিয়মানুযায়ী অন্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে এমন চুক্তি করাটাই বেআইনি। এমন পরিস্থিতিতে চাইলেই কঠোর হতে পারত গুজরাট। কিন্তু উল্টো তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে বিনা বাক্যব্যয়ে।
আইপিএলে ফুটবলের মতো দলবদল হয় না। ফুটবলে যেমনটা হয়, এক দল কোনো খেলোয়াড়কে কিনে, তাকে চাইলে বেশি দামে বিক্রি করতে পারে অন্য দলের কাছে। আইপিএল ট্রেডের ক্ষেত্রে যা হয়, পান্ডিয়ার মূল্য যেহেতু ১৫ কোটি রুপি, তাঁকে যদি ছেড়ে দেয়, তবে গুজরাট তার বেতন সীমায় অন্য খেলোয়াড়দের জন্য ১৫ কোটি রুপি ফেরত পায়। ফলে নিলাম আবার নতুন করে ১৫ কোটি রুপি ব্যয়ের সুযোগ পায়। ওদিকে পান্ডিয়াকে জায়গা করে দিতে নিজেদের অন্য এক বা একাধিক খেলোয়াড় (গ্রিন) ছেড়ে দিয়ে সেই ১৫ কোটি রুপি বেতনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে মুম্বাইকে। তাহলে গুজরাট কেন এত সহজে রাজি হয়ে গেল?
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এক বিশ্লেষণী কলামে সন্দীপ দিভেদি এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মুম্বাইয়ে খেলা পান্ডিয়াকে ফেরাতে মরিয়া ছিল ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। রোহিত শর্মার বয়স মধ্য ত্রিশ পেরিয়েছে, পান্ডিয়া এখনো ক্যারিয়ারের তুঙ্গে এবং ভারত দলের ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবে তাঁকে ভাবছেন সবাই। আর অধিনায়ক পাণ্ডিয়ার অধীনে দুই মৌসুমেই ফাইনাল খেলেছে গুজরাট।
তাই পুরো বিশ্ব ১৫ কোটির হিসাব জানলেও আড়ালে নাকি আরও বড় অঙ্কের খেলা চলেছে। যে অঙ্কটা আইপিএল কর্তৃপক্ষ জানে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের দাবি, গুজরাটকে এই দলবদলে রাজি করতে মুম্বাইয়ের খরচ ১০০ কোটির রুপিরও বেশি!
কিন্তু আইপিএলে তো দলগুলো টাকা আয় করতে আসে না। ভালো খেলোয়াড় ধরে রেখে, মাঠের পারফরম্যান্সে ব্র্যান্ড মূল্য বাড়িয়ে নেয় তারা। আর এই ব্র্যান্ড মূল্যই আরও শতগুণে আয়ের পথ খুলে দেয়। এ কারণেই মুম্বাই যেকোনো মূল্যে নিজেদের লক্ষ্যের খেলোয়ারকে দলে টানে। প্রথম দুই আইপিএলে বুদ্ধির পরিচয় দেওয়া গুজরাট কেন রাজি হলো নিজেদের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডকে ছাড়তে?
কারণ, কলকাতা, পাঞ্জাব, বেঙ্গালুরু বা মুম্বাই-এর ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো এক বা একাধিক ব্যক্তি মালিকানাধীন। কিন্তু গুজরাটের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০২২ সালে ১০ বছরের জন্য গুজরাটের ফ্র্যাঞ্চাইজি সত্ত্ব কিনে নিয়েছে সিভিসি ক্যাপিটাল। এই ইনভেস্টমেন্ট ফার্মে ৪০ জনের ভাগ আছে। মুম্বাই বা চেন্নাই সুপার কিংসের জন্য আইপিএলে ভালো করাটা আত্মগরিমার ব্যাপার।
ওদিকে গুজরাটের মালিকদের জন্য ব্যাপারটা পুরোটাই আর্থিক লাভের ব্যাপার। পান্ডিয়াকে ছেড়ে দিয়ে তারা বেতন সীমায় শুধু ১৫ কোটি রুপির জায়গা বের করতে পেরেছে তা নয়, সে সঙ্গে ১০০ কোটি রুপিরও বেশি অঙ্ক কোম্পানির আয়ের খাতে দেখাতে পারছে।
এই অর্থ বছর শেষে ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের ব্যালান্স শিটে আয়ের ঘরে যখন ১০০ কোটি রুপি যোগ হবে এবং এতে স্টক মার্কেটে তাদের শেয়ারের মূল্যে যে অতিবাচক প্রভাব পড়বে, সে তুলনায় হার্দিক পান্ডিয়ার ক্রিকেটীয় মূল্য অনেকটাই গৌণ একটি বিষয়।