বাংলাদেশ পুকুর চেয়েছিল, শ্রীলঙ্কা সাগর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে

আজকের পর আরও দুই দিন বাকি, ম্যাচে ইনিংস বাকি শুধু বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। বৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে প্রশ্রয়ের হাত বাড়িয়ে না দিলে এই ম্যাচে ফল হচ্ছে, এটা নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়। ফলটা কী হবে, ক্রিকেটের অনিশ্চয়তার নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেটাও সম্ভবত নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়।  

বাংলাদেশ যে এক পুকুর সমান লক্ষ্যের আশা নিয়ে নেমে শ্রীলঙ্কার দেওয়া সাগরসম লক্ষ্যের সামনে দাঁড়িয়ে। তৃতীয় দিনে আজ প্রথম ইনিংসেরই দুই সেঞ্চুরিয়ান - অধিনায়ক ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা ও কামিন্দু মেন্ডিসের আরেকবার জোড়া সেঞ্চুরিতে শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট হওয়ার আগে ৪১৮ রান। প্রথম ইনিংসের ৯২ রানের লিড যোগ করে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়াল ৫১১ রানের!

একে পুকুরের বিপরীতে সাগর কেন বলা হচ্ছে? বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ ডেভিড হেম্প গতকাল দ্বিতীয় দিন শেষে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ লক্ষ্যটাকে ২৫০-এর মধ্যে রাখতে পারলেই খুশি। তখন শ্রীলঙ্কার স্কোরবোর্ডে ১১৯/৫ ছিল কিনা!

রেকর্ড-টেকর্ড নিয়ে আলোচনায় এরপর আর বাংলাদেশের কারও ইচ্ছা আছে বলে মনে হয় না। অনিচ্ছায় হলেও রেকর্ডের পাতা থেকে দুটি তথ্য শুনে নিন, রেকর্ডগুলো আপনার জানা থাকার সম্ভাবনাই বেশি। টেস্ট ইতিহাসে রানতাড়ায় জয়ের রেকর্ড যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪১৮ রান, সে তো ক্রিকেট অনুসারীমাত্রই জানেন। ওই রেকর্ড আপাতত সিকেয় তুলে রেখে বাংলাদেশের রেকর্ডবই নিয়ে টানাটানি করা যাক।

বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের সেটাও সম্ভবত অজানা নয় যে, বাংলাদেশের টেস্টে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটা ২১৭ রানের – ২০০৯ সালে দ্বিতীয় (মতান্তরে তৃতীয়) সারির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেন্ট জর্জে। অর্থাৎ, আজ শ্রীলঙ্কার দেওয়া লক্ষ্যের অর্ধেকেরও কম! সে রেকর্ড তো বিদেশের মাটিতে, দেশের মাটিতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে টেস্ট জিতেছে মিরপুরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে, গত বছর এপ্রিলে ১৩৮ রান করে!

ওহ, আরেকটি প্রাসঙ্গিক তথ্য – বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর এই প্রায় ২৪ বছর পেরোনো পথচলায় রান তাড়া করে জিতেছেই মাত্র ৫টি টেস্ট!

বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আপাত-বৃথা আলোচনা বাদ দিয়ে বরং শ্রীলঙ্কার ইনিংসে চোখ ফেরানো যাক। এক কথায় বললে, আজ দিনের প্রায় শুরু থেকেই মেন্ডিস আর ডি সিলভা ব্যাট করেছেন, বাংলাদেশের ফিল্ডার-বোলাররা খেটে মরেছেন।

৫ উইকেটে ১১৯ রানে দিন শুরু করা শ্রীলঙ্কা আজ দিনের শুরুতে নাইটওয়াচম্যান বিশ্ব ফার্নান্দোকে হারিয়েছে। কিন্তু ওই উইকেট নিয়ে যেন বাংলাদেশ খাল কেটে কুমির ডেকে এনেছে। কুমির মানে আগের দিন ২৩ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করা ডি সিলভার সঙ্গে মেন্ডিসের জুটি! প্রথম ইনিংসের কপি-পেস্টই যেন আজ দ্বিতীয় ইনিংসে করেছেন দুজন।

দলীয় ১২৬ রানে বিশ্বর উইকেট হারানো শ্রীলঙ্কা ৪ উইকেট হাতে রেখেই লাঞ্চে গেছে স্কোরবোর্ডে ২৩৩ রান নিয়ে। এই উইকেটে ৩০০ পেরোনো লক্ষ্যই কোনো দলের জন্য ভীষণ চাপের হয়ে যাবে বলে মানা হচ্ছিল, লাঞ্চেই শ্রীলঙ্কার লিড হয়ে গেল ৩২৫ রান! ডি সিলভা তো ফিফটি আরও আগেই পেরিয়ে ততক্ষণে ৮৫ রানে ব্যাটিং করছিলেন, মেন্ডিসও লাঞ্চে গেলেন ঠিক ৫০ পূর্ণ করে। শান্ত-লিটনদের কপালে তখন চিকন ঘাম।

লাঞ্চ থেকে ফিরেই ডি সিলভার সেঞ্চুরি হলো, ১৬৪ বল লাগল তাতে। শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসের স্কোর ততক্ষণে ৩০০-র পথে। তবে বাংলাদেশের ‘সাফল্য’ – ওই জুটিতেই স্কোরটা ৩০০ হতে দেয়নি! মিরাজের বলে ক্যাচ দিয়ে ডি সিলভা আউট হলেন দলকে ২৯৯ রানে রেখে, তাঁর নামের পাশে তখন ১০৮ রান।

কিন্তু মেন্ডিস তো ছিলেন! প্রভাত জয়াসুরিয়াকে (২৫) নিয়ে অষ্টম উইকেটে গড়লেন ৬৭ রানের জুটি। সে পথে তাঁর সেঞ্চুরি পূর্ণ হলো ১৭১ বলে, শ্রীলঙ্কা চা খেতে গেল তৃপ্তচিত্তে ৪৩০ রানের লিড নিয়ে। বাংলাদেশের ঘাম তখন ঝরছে দরদরিয়ে।

চা খেয়ে এসে মিরাজ পরপর দুই বলে প্রভাতের পর লাহিরুকেও ফেরালেন। মনে হলো, যাক, বুঝি বাংলাদেশ এই ‘অত্যাচার’ থেকে মুক্তি পাচ্ছে! আর তো একটাই উইকেট! কিন্তু মেন্ডিসের তখনো মনের সাধ মেটেনি। শেষ উইকেটে কাসুন রাজিথাকে (২০ বলে ৪ রান) মূলত অন্য প্রান্তে রেখে পেটানো শুরু করলেন। সেঞ্চুরি পর্যন্ত তাঁর বাউন্ডারি বলতে শুধু ১৩টি চার ছিল, রাজিথাকে অন্য পাশে রেখে যে পেটানো শুরু করলেন, শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে তাইজুলের বলে আউট হওয়ার সময়ে তাঁর ইনিংসে চার হলো ১৬টি, ছক্কা ৬টি! নামের পাশে রান ১৬৪!

কে বলে সাগর খননে হয় না!

ওহ, এতটুকু যদি ধৈর্য্য নিয়ে পড়ে থাকেন, আরেকটু ধৈর্য ধরে রেখে বাংলাদেশের অবস্থাটাও শুনে যান। সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে বালিতেই পিছলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। স্কোরবোর্ডে ৯ রান উঠতে উঠতেই ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়ের (০) পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত (৫) রান করার দায়িত্বে যতি টেনেছেন। এই প্রতিবেদন লেখার সময়ে বাংলাদেশের রান ২ উইকেটে ২৯, ক্রিজে জাকির (১৭*) ও মুমিনুল (২*)।