একদিক থেকে দেখলে শ্রীলঙ্কা দল একই জায়গায় আটকে আছে, বাংলাদেশ দল করেছে উন্নতি। টেস্ট সিরিজে তাহলে ভালো করল কে?
ভাবনার বিষয় বটে! শ্রীলঙ্কা পরপর দুই টেস্টে বাংলাদেশকে ৫১১ রানেরই লক্ষ্য দিল – একই জায়গায় আটকে নয়তো কী! আর বাংলাদেশ দলের ‘উন্নতি’ কী? প্রথম টেস্টে ৩২৮ রানে হারলেও দ্বিতীয় টেস্টে সাকিব-লিটন-মুমিনুল-মিরাজরা ‘দৃঢ় প্রত্যয়ে’ নিশ্চিত করলেন, বাংলাদেশ বারেবারে হারলেও একই ব্যবধানে হারে না!
চট্টগ্রামে দ্বিতীয় টেস্টে যে বাংলাদেশ হারছে – এটা লেখার ক্ষেত্রে বাধা দিতে ক্রিকেটের অনিশ্চয়তারও হয়তো বাধো বাধো লাগবে! আজ চতুর্থ দিনের খেলা শেষ যখন হলো, ৫১১ রানের লক্ষ্যে নামা বাংলাদেশ দিন শেষ করেছে ৭ উইকেটে ২৬৮ রান নিয়ে।
কিন্তু হতাশাবাদের চর্চা না করে ‘গ্লাস আধা পূর্ণ’ দেখতে চাইলে এভাবে দেখতে পারেন, বাংলাদেশ টেস্টটা পঞ্চম দিনে তো নিয়েছে!
আর যদি আপনার পছন্দের বিষয় হয় অতিআশাবাদের চর্চা, তাহলে আপনার জন্য দুটি তথ্য তো থাকছেই। মেহেদি হাসান মিরাজ ৪৪ রান নিয়ে দিন শেষ করেছেন, তাইজুল ইসলাম অপরাজিত ১০ রানে। বাংলাদেশের জয়ের জন্য আর ‘মাত্র’ ২৪৩ রান দরকার। অর্থাৎ, ৭ উইকেটে বাংলাদেশ যা রান করেছে, বাকি তিন উইকেট নিয়ে তার কাছাকাছি যেতে পারলেই তো হয়ে গেল!
যা রান করেছে বাংলাদেশ, চাইলে সেখানেও তো উন্নতির ছাপ খুঁজে নিতে পারেন! প্রথম টেস্টে দুই ইনিংসে একবারও ২০০ পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ, চট্টগ্রামে প্রথম ইনিংসেও ১৭৮ রানে গুটিয়ে গেল। সে তুলনায় দ্বিতীয় ইনিংসে এরই মধ্যে আড়াই শ পার!
ছেলে ভোলানো গল্প মনে হচ্ছে? বাংলাদেশ যেভাবে খেলছে, শ্রীলঙ্কা টানা দুই ম্যাচে যে লক্ষ্য দিয়েছে, তাতে ব্যাটিং-বোলিং নিয়ে আর কী-ই বা নতুন বলার থাকতে পারে! ৫১১ রানের লক্ষ্য তো টেস্ট ইতিহাসেই কোনো দল কখনো পেরোতে পারেনি, বাংলাদেশ নিজেদের ২৪ বছরে গড়ানো টেস্ট ইতিহাসে কখনো ২১৭ রানের বেশি তাড়া করে জিততে পারেনি। দেশের মাটিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়ের ‘রেকর্ড’ ১৩৮ রানের। বাংলাদেশ জিততে পারবে কি না – শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসের পর সে আলোচনায়ই যাওয়ার সাহস দেয়নি রেকর্ডগুলো।
এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখার পর আলোচনাটা ওঠার তো প্রশ্নই আসে না। নিজেদের তুলনায় বাংলাদেশ আজ ভালো ব্যাটিং করেছে বটে, কিন্তু ঝামেলা হলো, খেলাটা তো আর নিজের সঙ্গে নিজের নয়, সেখানে প্রতিপক্ষ থাকে। তাদের বিচারে বাংলাদেশের ব্যাটিংটাকে ভালো বলার সুযোগ থাকছে কই! প্রায় প্রত্যেক ব্যাটসম্যানের গল্পটাই ভালো একটা শুরু পেয়ে আউট হওয়ার। কেউ ভালো বলে আউট হলেন, কেউ স্রেফ উইকেট বিলিয়ে দিলেন – এ-ই যা পার্থক্য!
মাহমুদুল হাসান জয়কে দিয়ে শুরু। ৩২ বলে ২৪ রান তুলে ফেলেছিলেন, কিন্তু প্রভাত জয়াসুরিয়াকে কাট করতে গিয়ে জয়াসুরিয়ার বলের সাধারণ ‘ভ্যারিয়েন্স’-এর শিকার হয়ে হলেন বোল্ড। ৩৭ রানে উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর দলকে ফিফটি পার করিয়ে আউট হয়ে গেলেন জাকির হাসানও (১৯)। আউটের ধরন? অফ স্টাম্পের বাইরের বল ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপে। বাংলাদেশের মতো শ্রীলঙ্কা তো আর অত ক্যাচ মিস করছে না! জাকিরকে ফিরতেই হলো।
এরপর নাজমুল হোসেন শান্তর পালা। আজ বাংলাদেশ অধিনায়ক আউট হওয়ার আগে করলেন ২০ রান, টেস্ট সিরিজে চার ইনিংসে তাঁর সর্বোচ্চ! আউটটা অবশ্য লাহিরু কুমারার দারুণ এক ডেলিভারিতে হয়েছেন, আউটের ধরন নিয়ে তাই প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম। কিন্তু শান্তর বিদায়ে ১০০ রানের আগেই তিন উইকেটের পতন দেখল বাংলাদেশ।
অন্য প্রান্তে মুমিনুল ভালোই খেলছিলেন। সাকিব এসে পাল্টা আক্রমণের ইঙ্গিত দিলেন। স্কোরবোর্ডে তাদের রানের অভাব নেই দেখে শ্রীলঙ্কা ফিল্ডিং সাজাচ্ছিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের চারপাশে ফিল্ডার রেখে, সাকিব টানা কিছু চারে গলার কাছে ফাঁস হয়ে থাকা ফিল্ডিং সরাতে চাইলেন। তাতে রানও আসছিল। কিন্তু ছন্দপতন হলো অন্যদিকে সুইপ করতে গিয়ে মুমিনুল আউট হয়ে যাওয়ায়।
আউট হওয়ার আগে মুমিনুল ফিফটি করেছেন বটে, কিন্তু খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে ফিফটিতে তো বাংলাদেশের প্রয়োজনের ছিটেফোঁটাও পূরণ হওয়ার কথা নয়। এই উইকেটে লঙ্কান পেসাররা পিচের ওপর জোরে ফেলে বাড়তি বাউন্স আদায়ের চেষ্টা করলেন স্পিনাররা বল করেছেন ঝুলিয়ে। জয়াসুরিয়ার তেমনই এক ডেলিভারিতে সুইপ করতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফিরে তাই মুমিনুল হতাশা বাড়ালেন। তাঁর ৫৬ বলে ৫০ রানের ইনিংস যে আরও অনেক বড় হতে পারত!
একই আফসোস লিটন দাস আর সাকিব আল হাসানের ইনিংস নিয়েও। দলীয় ১৩২ রানে মুমিনুলের বিদায়ের পর সাকিব-লিটনের জুটিতে ফিফটি পায় বাংলাদেশ। সাকিব আগ্রাসী, লিটনও দারুণ কিছু শটে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। একটু নার্ভাসনেস টের পাওয়া গেলেও লিটনের পায়ের মুভমেন্ট, হাতের নমনীয়তা আর প্রতিজ্ঞায় বাঁধা চোয়াল ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু এরপর ঘুরেফিরে সেই একই গল্প।
বোলিংয়ে বদল এনে কামিন্দু মেন্ডিসকে নিয়ে আসে শ্রীলঙ্কা। তাঁর বারেবারে ঝুলিয়ে দেওয়া বলগুলো বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের লোভ যেমন বাড়াচ্ছিল, তেমনি ঝুঁকিও তো ছিল সেসব ডেলিভারিতে। সাকিব টোপ গিলে ফেললেন! অফ স্টাম্পের বাইরে পড়ে ঘুরে বেরিয়ে যাওয়া বলে ব্যাটের ‘ফেইস’ খুলে দিয়ে পয়েন্টে চার মারতে চেয়েছিলেন সাকিব, কিন্তু একটু ঝুলিয়ে দেওয়া বলটা সাকিবের অনুমানের চেয়ে ঘুরল বেশি। শেষ মুহুর্তে তাই খেলবেন কি খেলবেন না ধন্দে পড়ে গেলেন সাকিব, ততক্ষণ বল ব্যাটে লাগল কিন্তু শটে জোর ছিল না। গালিতে দারুণ ক্যাচ নিলেন ফার্নান্দো। সাকিব আউট হয়ে গেলেন ৩৬ রান করে। ১৯৩ রানে পঞ্চম উইকেট হারানো বাংলাদেশের তখন আর এই টেস্ট নিয়ে আশারও কিছু নেই।
লিটন দাস ছিলেন, কিন্তু তিনিও একই ঢংয়ে বিদায় নিলেন। ঢং বলতে আশা জাগিয়ে হতাশা বাড়িয়ে বিদায় আর কী! লাহিরু কুমারার অফ স্টাম্পের বাইরের শর্ট বলে পুল করতে গিয়েছিলেন লিটন, ব্যাটটাকে বলের ওপরে রেখে মাটি গড়ানো শট খেলারই চেষ্টা ছিল তাঁর। কিন্তু বল লিটনের অনুমানের চেয়ে নিচু হলো, ব্যাটের নিচের কানায় লেগে ক্যাচ উইকেটকিপারের হাতে। লিটন বিদায় নিলেন ৩৮ রান করে, বাংলাদেশের তখনো ২০০ পেরোনো হয়নি।
মিরাজ এরপর ওয়ানডে ঢংয়ে ব্যাটিং করেছেন। দিন শেষে ৭ চারে ৪৪ রানে অপরাজিত তিনি। কিন্তু অন্যদিকে বাংলাদেশের হতাশা আরও বাড়িয়ে শাহাদাত হোসেন দীপু এলবিডাব্লিউ হয়ে গেলেন। কামিন্দু মেন্ডিসের বলটা সামনের পায়ে খেলার কথা ছিল, দীপু খেললেন ব্যাক ফুটে। বল একটু বেশি ঘুরে তাঁর পায়ে লাগল। এলবিডাব্লিউ! রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি দীপু।