একের পর এক যখন থাইল্যান্ডের খেলোয়াড়দের শটগুলো আটকে দিচ্ছিলেন, এমন কিছু হয়তো কস্মিনকালেও কল্পনা করেননি হাসান সানি। ৪০ বছর বয়সী ভদ্রলোক সিঙ্গাপুরের গোলকিপার। গত মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ৩-১ গোলে হেরেছে সিঙ্গাপুর, সে ম্যাচে ১১টি সেইভ করেছেন সানি।
কিন্তু এরপরই ঘটেছে অদ্ভুত এক ঘটনা। চীনের লোকজন দল বেঁধে টাকা পাঠানো শুরু করেছেন হাসান সানির একাউন্টে!
ঘটনা কী? চীনের লোকজন কেন টাকা পাঠাচ্ছেন সিঙ্গাপুরের গোলকিপারকে, টাকা পাঠানোর জন্য তাঁর একাউন্টের বিবরণই বা কীভাবে পেলেন? প্রথম উত্তরটা জড়িয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের সমীকরণে, দ্বিতীয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদান্যতা।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডে গ্রুপ সি-তে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চীন, সিঙ্গাপুর আর থাইল্যান্ড পড়েছে। গ্রুপের শেষ দিনে চীন ১-০ গোলে হেরে যায় দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে। তাতে চীনের জন্য সমীকরণটা অনেক প্যাঁচানো হয়ে যায়। তখন সমীকরণ দাঁড়ায় – থাইল্যান্ড যদি কোনো গোল না খেয়ে সিঙ্গাপুরকে ৩ গোলের ব্যবধানে হারায়, অথবা গোল খেলে অন্তত চার গোল করে এবং অন্তত দুই গোলের ব্যবধানে জেতে, তাহলে চীন বাদ পড়বে, থাইল্যান্ড যাবে পরের রাউন্ডে।
থাইল্যান্ড ৫৭ মিনিটে একটি গোল খেয়ে যাওয়ায় নিশ্চিত হয়, তাদের অন্তত চার গোল করতে হবে তাদের। সেখানেই হাসান সানির প্রতি চীনাদের প্রেমে পড়ার শুরু। থাইল্যান্ড ৫৭ মিনিটে গোল করে সমতায় ফেরে ম্যাচে, এরপর সিঙ্গাপুর আরও দুটি গোল করে। কিন্তু হাসান সানির ১১টি সেইভ নিশ্চিত করে, মহাগুরুত্বপূর্ণ চতুর্থ গোলটি আর পাচ্ছে না সিঙ্গাপুর। ফলে সিঙ্গাপুর বাদ পড়ে, চীন চলে যায় তৃতীয় রাউন্ডে।
ব্যস, এরপরই হাসান সানিকে প্রশংসায় ভাসানো শুরু করেন চীনারা। কিন্তু শুধু প্রশংসায় থামলেও কথা ছিল। অতিউৎসাহী কেউ একজন হাসানের প্রোফাইল ঘেঁটে তাঁর স্ত্রীর শেয়ার করা পুরোনো এক ভিডিও বের করেন, যেখানে হাসান ও তাঁর স্ত্রীর খাবারের দোকানের কিউআর কোডের ছবি ভাইরাল হয়ে পড়ে।
আর যায় কোথায়! চীনারা ওই কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠাতে শুরু করেন হাসানকে। সিঙ্গাপুরের সম্প্রচারক প্রতিষ্ঠান সিএনএ-তে এ নিয়ে হাসান বলছিলেন, ‘শুরুর দিকে ভালোই লাগছিল! ভাবছিলাম, যাক, কিছু অর্থ আসছে! কিন্তু এরপর মনে হতে লাগল, এটা বন্ধ হবে কখন! এটা কি বৈধ?’ এরপর বললেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের থামা উচিত।’
তাঁর দোকানের কিউআর কোডের জায়গায় কেউ একজন এডিটিং ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এরই মধ্যে ভুয়া কিউআর কোডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে দিয়েছেন জানিয়ে হাসান সানি বললেন, এভাবে চলতে থাকলে অনেকে প্রতারণারও শিকার হতে পারেন। সে কারণে তাঁর অনুরোধ, ‘আপনার অনুরোধ করি, আপনারা সমর্থনের বেলায় যুক্তি দিয়ে চিন্তা করুন, এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমাকে টাকা পাঠানো বন্ধ করুন।’
তবে শুধু টাকা পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি চীনারা। হাসান ও তাঁর স্ত্রী আইডা রাহিমের খাবারের দোকানের রেটিং বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁরা। প্রতিদিন চীনের অনেক ইনফ্লুয়েন্সার-ইউটিউবার ভিড় করছেন হাসানের দোকানে। চীনের রেস্তোরাঁ রিভিউয়ের অ্যাপ ডিয়ানপিং-এ ‘সিঙ্গাপুরিয়ান স্ন্যাক এন্ড ফুড’ বিভাগে হাসানের দোকান ‘দাপুর হাসান’কে এমনই ভালো রিভিউ দিয়েছেন চীনারা যে, দাপুর হাসান এখন ওই বিভাগের শীর্ষেই আছে!
এর প্রভাব পড়েছে দোকানের বিক্রিবাট্টায়। ইংলিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এ নিয়ে প্রতিবেদনে লিখেছে, দোকানটির সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ ‘নাসি লেমাক’ – যা কিনা ডাবের দুধে ভাত দিয়ে তৈরি একটি খাবার এবং ফ্রায়েড চিকেন দিয়ে যেটিকে পরিবেশন করা হয়, সে পদটি হু হু করে বিক্রি হচ্ছে। ম্যাচের পরের দিন দুপুর দেড়টার মধ্যেই সব খাবার বিক্রি হয়ে যায় দোকানের!
জনবহুল চীন সেই ২০০২ বিশ্বকাপে একবার খেলার আগে-পরে কখনো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে চীনের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগে তাতে ভাটা পড়েনি।