বাংলাদেশের চতুর্থ শিকার পাকিস্তান, সবচেয়ে দামিও

সিরিজের আগে বাংলাদেশকে দলকে ঘিরে এমন প্রত্যাশার ছিঁটেফোঁটাও কারও ছিল?

বাংলাদেশ কিছুটা লড়াই করবে, একটা টেস্ট অন্তত ড্র করুক…এ-ই তো ছিল বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর চাওয়া। খুব বেশি ভালো করলে ‘যদি’ ‘কিন্তু’ দিয়ে একটা টেস্টে জয়ের আশাবাদের উচ্চারণও ছিল ম্রিয়মাণ। সেই বাংলাদেশই কী অবিশ্বাস্য এক সিরিজ কাটিয়ে দিল পাকিস্তানে!

রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথম টেস্ট ১০ উইকেটে জিতেই একটা অচলায়তন ভাঙা হয়ে গেল – মুখোমুখি ১৪তম টেস্টে এসে পাকিস্তানকে প্রথমবার টেস্টে হারানো। আজ রাওয়ালপিন্ডিতে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট শেষে রেকর্ডটা হয়ে গেল ১৫-তে ২!

দুই টেস্টের দুটিই জিতে গেল বাংলাদেশ! অভাবনীয়! যে বাংলাদেশকে নিয়ে একটা টেস্টে জয়ের উচ্চারণই তেমন আওয়াজ পায়নি সিরিজের আগে, সব প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশই করে দিল নাজমুল হোসেন শান্তর দল!

হোয়াইটওয়াশ – শব্দটা টেস্টে বাংলাদেশের ২৪ বছরের পথচলায় শোনা গেছে অনেকবারই। তবে এর বেশিরভাগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছিল শিকার। সিরিজে অন্তত দুটি টেস্ট ছিল – এমন দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাংলাদেশ এ পর্যন্ত খেলেছে ৬৪টি, এর মধ্যে ৩৮টি সিরিজেই বাংলাদেশ হোয়াইটওয়াশের শিকার। হার ৫৯.৩৮ শতাংশ! প্রতিপক্ষের মাঠে রেকর্ড তো আরও হতশ্রী – দুইয়ের বেশি টেস্ট দেখা ২৯টি সিরিজের ২০টিতেই হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশ! হার ৬৮.৯৭%!

সেই বাংলাদেশই এবার শিকারি! হোয়াইটওয়াশ করল প্রতিপক্ষকে, শিকার পাকিস্তান, এবং সেটা পাকিস্তানেরই মাটিতে!  

অবশ্য বাংলাদেশের হোয়াইটওয়াশ করার উদাহরণ এটিই প্রথম নয়। প্রতিপক্ষের মাঠেও সিরিজের সবগুলো টেস্ট জেতার ঘটনা এর আগেও দেখেছে বাংলাদেশ। হোয়াইটওয়াশের দিক থেকে পাকিস্তান তো বাংলাদেশের চতুর্থ শিকার, আর প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে বাংলাদেশের হোয়াইটওয়াশের রেকর্ড বিবেচনা করলে দ্বিতীয়।

এর আগে তিনটি সিরিজে প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। প্রথমটিই দেশের বাইরে, তবে সেটি নিয়ে অবশ্য নানামূখী অনেক আলোচনা আছে। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজে যে উইন্ডিজ দলকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ, সেটিকে সে সময়ে চুক্তি নিয়ে বোর্ড-খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্ব দেখা উইন্ডিজের তৃতীয় সারির দল বলেই মনে করেন অনেকে। তবে খেলার মাঠে তো শুধু সামনে থাকা প্রতিপক্ষকেই হারানো যায়, সে হিসেবে বাংলাদেশের অর্জনের মর্যাদা রেকর্ডবইতে খাটো হয় না একটুও।

সেই উইন্ডিজকেই আবার ২০১৮/১৯ সালে দেশের মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। সে বেলায় অবশ্য উইন্ডিজের দলের মান নিয়ে আর প্রশ্ন ছিল না, তবে প্রশ্ন থেকে গেছে মিরপুর আর চট্টগ্রামের উইকেট নিয়ে।

এই দুই সিরিজের ফাঁকে ২০১৪-১৫ সালে দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়েকে ধবলধোলাই করে বাংলাদেশ। একদিক থেকে এটি শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে, কারণ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত যে চারটি সিরিজে প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করেছে, এর মধ্যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজটিই ছিল সবচেয়ে বড় দৈর্ঘ্যের – ৩ ম্যাচের। তবে প্রতিপক্ষ যখন ভেঙেচুরে যাওয়া জিম্বাবুয়ে, তিন টেস্টের সিরিজে সব ম্যাচ জিতেও বাংলাদেশ বিশ্বের নজর কাড়তে পারেনি ততটা।

সেদিক থেকে মাহাত্ম্যের বিচারে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করে জেতা সিরিজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজই। বাবর-রিজওয়ানদের পাকিস্তান তাদের সেরা দল নিয়েই নেমেছে, সিরিজটা হয়েছে পাকিস্তানেরই মাটিতে।

শুধু তা-ই নয়, দুই টেস্টেই বৃষ্টি টেস্টের কিছু অংশ খেয়ে নিয়েছে, দ্বিতীয় টেস্টে প্রথম দিনের পুরোটাই গেছে বৃষ্টির পেটে। সাধারণত এসব পরিস্থিতিকে ছোট দলের জন্যই সুবিধাজনক ভাবা হয়। কিন্তু দুই টেস্টেই ব্যাটিং – এবং তার চেয়েও বেশি বোলিংয়ে – দাপট দেখিয়ে যেভাবে পঞ্চম দিনে সম্ভাবনায় এগিয়ে থেকেই মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ, তাতে বৃষ্টি আরও বেশি হলে শুধু পাকিস্তানেরই লাভ হতো বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক।