সেদিন যদি মেহেদি হাসান মিরাজ আর আফিফ হোসেন দাঁড়িয়ে না যেতেন!
যে দিনটার কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে দারুণ সুখস্মৃতির। ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রামে সেদিন সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মুখোমুখি বাংলাদেশ আর আফগানিস্তান। ২১৫ রানের লক্ষ্যে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা এমনই বীভৎস হলো যে, বড় ব্যবধানে হারের রেকর্ড নিয়েই খোঁজ পড়ে গিয়েছিল। ৪৫ রানেই যে ৬ উইকেট চলে যায় বাংলাদেশের!
চরম দুঃস্বপ্নের হয়ে ওঠার আশঙ্কা জাগানো সে দিনকেই সুখস্মৃতির বানিয়ে রাখে সপ্তম উইকেটে মিরাজ আর আফিফের ১৭৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি। আফিফ করলেন ৯৩, মিরাজ ৮১ – কোনো উইকেট আর পড়তে না দিয়ে বাংলাদেশ ম্যাচটা জিতেই গেল!
সেদিন না জিতলে খুব যে বড় ক্ষতি হয়ে যেত, এমন নয়। স্রেফ একটা দ্বিপাক্ষিক সিরিজের ম্যাচই তো ছিল সেটা! শেষ পর্যন্ত ওই সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছে বাংলাদেশ।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বশেষ সিরিজ জয় সেটি। এরপর আরও দুটি সিরিজ এর মধ্যে হয়ে গেছে। গত বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রামেই তিন ওয়ানডের একটা সিরিজ হলো, প্রথম দুই ম্যাচেই জিতে সেখানে সিরিজ নিশ্চিত করে ফেলল আফগানিস্তান। আর একটা সিরিজ শেষ হলো গতকাল, শারজাতে তৃতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ২৪৪ রান ৫ উইকেট হাতে রেখে অনায়াসেই টপকে ম্যাচ আর সিরিজ জিতে নিয়েছে আফগানিস্তান।
সর্বশেষ তিন সিরিজের দুটিতে জয়, একটিতে জেতা হয়নি অবিশ্বাস্য এক জুটির কারণে…সব মিলিয়ে তাই গতকাল থেকে আলোচনাটা বেশ জোর পেয়েছে – বাংলাদেশের পছন্দের সংস্করণ বলে পরিচিত ওয়ানডেতেও কি বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে আফগানিস্তান?
দ্বিপাক্ষিক সিরিজের ফল তো সেটাই বলছে। গতকাল ম্যাচের পর ওয়ানডে র্যাঙ্কিংও বলছে, বাংলাদেশকে ৯-এ নামিয়ে ৮ নম্বরে উঠে গেছে আফগানিস্তান। অবশ্য সেখানে রেটিং পয়েন্টে দুই দলের ব্যবধানটা ভগ্নাংশের। আর র্যাঙ্কিং তো হরহামেশাই ওঠা-নামা করে।
তা এর বাইরে ওয়ানডেতে দুই দলের অবস্থা কী বলে? তুলনায় সর্বশেষ দুই বছরের ওয়ানডে পরিসংখ্যানে একটু চোখ বোলানো যাক।
সর্বশেষ দুই বছরে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেছে ৯টি, আফগানিস্তান ৮টি। জয়-হারের সোজাসাপটা হিসাব বলছে, সেখানেও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আফগানিস্তান। বাংলাদেশ ৯ সিরিজের মধ্যে জিতেছে ৪টি, হেরেছে বাকি ৫টিতে। আফগানিস্তান ৮ সিরিজের ৪টিতে জিতেছে, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি সিরিজ শেষ হয়েছে ১-১ সমতায়।
কিন্তু সিরিজগুলো ছিল কোন মানের দলের বিপক্ষে? এখানে অবশ্য একটা মোটা দাগের পার্থক্য চোখে পড়বে। বাংলাদেশের চার সিরিজ জয়ের মধ্যে দুটি গলা উঁচু করে বলার মতো – ২০২২ সালে দেশের মাটিতে ভারতকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, আর গত মার্চে দেশের মাটিতেই একই ব্যবধানে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কাকে। এর বাইরে দুটি সিরিজ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে, গত বছরে মাস দুয়েকের ব্যবধানে সে দুই সিরিজের একটি ছিল বাংলাদেশে, অন্যটি ইংল্যান্ডে।
আর এ সময়ে বাংলাদেশ হেরেছে কোন কোন দলের সঙ্গে? আফগানিস্তানের সঙ্গে দেশে ও দেশের বাইরে দুটি সিরিজ তো আছেই, এর বাইরে দেশে ও দেশের বাইরে দুটি সিরিজ ছিল নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে, অন্যটি দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
আর আফগানিস্তানের তুলনামূলক চিত্রটা কেমন? বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই সিরিজের বাইরে আফগানিস্তানের ৪ সিরিজ জয়ের মধ্যে গলা বড় করে বলার মতো জয়ও সাম্প্রতিক – দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। সে সিরিজও ছিল আফগানিস্তানের ‘নিজেদের মাঠ’ হয়ে যাওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এর বাইরে বাংলাদেশের ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’ আয়ারল্যান্ডকে আফগানিস্তানও হারিয়েছে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি সিরিজ সমতায় শেষ করাকেও চাইলে আফগানিস্তানের সাফল্য হিসেবে দেখা যায়।
এর বিপরীতে আফগানিস্তান সিরিজ হেরেছে এশিয়ার দুই দলের কাছেই – গত দুই বছরে ‘চেনা প্রতিপক্ষ’ হয়ে ওঠা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই সিরিজে, আরেকটি পাকিস্তানের বিপক্ষে। তিনটি সিরিজই হয়েছে শ্রীলঙ্কার মাটিতে।
দুই দলের মধ্যকার সিরিজের হিসাব গেল, দ্বিপাক্ষিক সিরিজের হিসেব হলো, এর বাইরে আর বাকি থাকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ আর আফগানিস্তানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ। সেখানে বাংলাদেশ এক টুর্নামেন্টে এগিয়ে, অন্যটিতে আফগানিস্তান বড় ব্যবধানেই এগিয়ে!
গত দুই বছরে বড় টুর্নামেন্ট বলতে ওয়ানডে সংস্করণে তো দুটিই হয়েছে – ২০২৩ সালে এশিয়া কাপ আর ওয়ানডে বিশ্বকাপ। তুলনা যখন বাংলাদেশ আর আফগানিস্তানের, সেখানে দুই টুর্নামেন্টেই একটা ‘দাদাগিরি’তে এগিয়ে বাংলাদেশ – দুটিতেই আফগানিস্তানকে হারিয়েছেন সাকিব-শান্তরা।
এশিয়া কাপে আফগানিস্তানকে হারিয়েই সুপার ফোরে খেলেছিল বাংলাদেশ, আফগানিস্তান বাদ পড়েছে গ্রুপ পর্বে শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই ম্যাচেই হেরে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি তো আফগানিস্তানের টিম ম্যানেজমেন্টের অবিশ্বাস্য ভুলের খতিয়ানই হয়ে থাকবে।
কোন ভুল মনে নেই? রানরেটের হিসাবে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলার সুযোগ ছিল না কারওই, শ্রীলঙ্কার ২৯১ রান ৩৭.১ ওভারের মধ্যে তাড়া করতে পারলে শ্রীলঙ্কাকে টপকে আফগানিস্তানই যেত সুপার ফোরে। এরপরও আরও কিছু হিসাব ছিল, ২৯২ রানের লক্ষ্য হলেও আফগানিস্তান যদি ৩৭.২ ওভারে ২৯৩ রান, ৩৭.৩ ওভারে ২৯৪ রান, ৩৭.৫ ওভারে ২৯৫ রান, ৩৮ ওভারে ২৯৬ রান অথবা ৩৮.১ ওভারে ২৯৭ রান করতে পারত তাহলে সুপার ফোরে যেত। কিন্তু আফগানিস্তান দলের পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট মহসিন শেখ হিসেবটা ঠিকঠাক করতে পারেননি, পাকেচক্রে সেই মহসিন এখন বাংলাদেশ দলেরই পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট। ওহ, সেই ম্যাচে এত হিসাবের অবশ্য পরে আর দরকারই পড়েনি। ৩৭ ওভারে ২৮৯ করে ফেলা আফগানিস্তান আরও চার বল খেলেছে, দুই উইকেট হারিয়ে ২৮৯ রানেই অলআউট হয়ে গেছে!
তা সেই এশিয়া কাপের বাংলাদেশ সুপার ফোরে পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার কাছে প্রথম দুই ম্যাচেই হেরে শেষ ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে জিতেছে।
এরপর ওয়ানডে বিশ্বকাপে অবশ্য বাংলাদেশ আর আফগানিস্তানের পারফরম্যান্সে মেরু-ব্যবধান। প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারালেও বাংলাদেশ এরপর ৭ ম্যাচেই টানা হেরেছে, এর মধ্যে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও হেরেছে। শেষ ম্যাচে শুধু শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জায়গাটা নিশ্চিত করতে পেরেছে, এই যা!
অন্যদিকে আফগানিস্তান? বাংলাদেশের কাছে হারলেও বাকি ৮ ম্যাচের ৪টিতেই জিতেছে। এর একটি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে, বাকি তিনটিতে হারিয়েছে ইংল্যান্ড, পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার মতো দলকে।
আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এর মধ্যে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ সুপার এইটে উঠলেও সেখানে আফগানিস্তান, ভারত আর অস্ট্রেলিয়া – সবার কাছেই হেরেছে। আর আফগানিস্তান ওদিকে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকেও হারিয়ে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল খেলেছে। তবে এখানে আলোচনাটা শুধু ওয়ানডের হচ্ছে বলে টি-টোয়েন্টির তুলনাটা হিসাবে আসছে না।
এলে আফগানিস্তানকে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে না রেখে উপায় থাকত না!
এক নজরে গত দুই বছরে ওয়ানডেতে
দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতেছে হেরেছে টাই
বাংলাদেশ ৯ ৪ ৫ ০
আফগানিস্তান ৮ ৪ ৩ ১
আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ
- ২০২৩ এশিয়া কাপে সুপার ফোরে খেলেছে, গ্রুপ পর্বে আফগানিস্তান আর সুপার ফোরে ভারতকে হারিয়েছে
- ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ৯ ম্যাচে ২ জয়, ৭ হার। জয় দুটি আফগানিস্তান আর শ্রীলঙ্কার সঙ্গে, হেরেছে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গেও।
আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে আফগানিস্তান
- ২০২৩ এশিয়া কাপে গ্রুপ পর্বে বাদ, দুই ম্যাচে হেরেছে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার কাছে
- ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ৯ ম্যাচে ৪ জয়, ৫ হার। জিতেছে ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে।
দুই বছরে বাংলাদেশ যাদের সঙ্গে সিরিজ জিতেছে -
ভারত (২০২২, ২-১ ব্যবধানে), আয়ারল্যান্ড (২০২৩ মার্চ, ২-০), আয়ারল্যান্ড (২০২৩ মে, ২-০), শ্রীলঙ্কা (২০২৪ মার্চ, ২-১)।
দুই বছরে আফগানিস্তান যাদের সঙ্গে সিরিজ জিতেছে -
বাংলাদেশ (২০২৩ জুলাই, ২-১), আয়ারল্যান্ড (২০২৪ মার্চ, ২-১), দক্ষিণ আফ্রিকা (২০২৪ সেপ্টেম্বর, ২-১), বাংলাদেশ (২০২৪ নভেম্বর, ২-১)। এর বাইরে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ।