চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দল সাজানো

তামিম তো নেই, সাকিব থাকবেন? বাংলাদেশের মাথাব্যথা তো আরও আছে

সব গুঞ্জন উড়িয়ে গতকাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে চূড়ান্ত অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন তামিম ইকবাল। আসন্ন চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সাকিব আল হাসানের থাকার সম্ভাবনাটাও ক্ষীণ। দুই সিনিয়র ক্রিকেটার দলে নেই, এদিকে নির্বাচকদের দল সাজাতে বাড়তি চিন্তার কারণ একাধিক ক্রিকেটারের অফ ফর্ম।

১৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দল ঘোষণার শেষ সময় আগামীকাল। আইসিসির দেয়া এই ডেডলাইনের পরও দলে পরিবর্তন আনার সুযোগ আছে। তবে ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোর প্রতিবেদন, সেই দলে সাকিব ফিরবেন কি না - তা নির্ভর করছে তাঁর বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষার ফলাফলের ওপর।

গত ২১ ডিসেম্বর চেন্নাইয়ে দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায়ও সাকিবের অ্যাকশন বৈধতার ছাড়পত্র পায়নি। আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদলের পর থেকে আর বাংলাদেশে না ঢোকা সাকিব চেন্নাইয়ে ফের বোলিং অ্যাকশনের পরীক্ষা দিয়েছেন সাকিব। সেটির ফলাফল এখনো আসেনি। সেই ফলাফলের ভিত্তিতেই সাকিবের বাংলাদেশ দলে খেলা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যেতে পারে। তবে শুধু ব্যাটসম্যান সাকিবকে নির্বাচকেরা বিবেচেনা করছেন না, তা এক প্রকার নিশ্চিত।

সাকিবকে নিয়ে ক্ষীণ আশা থাকলেও নির্বাচকদের চ্যালেঞ্জ থাকছে দল সাজানোর ক্ষেত্রে। যেখানে অফ ফর্মে থাকা ক্রিকেটারদের নিয়েই ভাবতে হতে পারে নির্বাচক প্যানেলকে।

লম্বা সময় ধরে ছন্দে নেই লিটন দাস। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত চোট কাটিয়ে ফিরে আসায় লিটনের একাদশে জায়গা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এমনকি ১৫ সদস্যের স্কোয়াডেও জায়গা হারাতে পারেন এই উইকেটকিপার। কারণটা অবশ্য তাঁর সর্বশেষ ৭টি ওয়ানডে ইনিংসের পরিসংখ্যান- (৬, ১, ০, ০, ২, ৪, ০)। সাত ইনিংসে একবারের জন্যও দুই অঙ্কের ঘরে যেতে পারেননি লিটন।

অফ ফর্মে থাকা লিটন বাদ পড়তে পারেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দল থেকে। ফাইল ছবি

গত বছর ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অফ ফর্মের কারণে গাজী আশরাফ লিপুর নির্বাচক প্যানেল লিটনকে সিরিজের মাঝপথেই বাদ দিয়েছিলেন। ফলে ডানহাতি এই উইকেটকিপারকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দল থেকে বাদ দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

লিটনের অফ ফর্মের সঙ্গে নির্বাচকদের বাড়তি মাথাব্যথ্যা জাতীয় দলের টপ অর্ডারদের অধারাবাহিক পারফরম্যান্স। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ দিয়ে দলে সুযোগ পাওয়া তানজিদ হাসান তামিম এখনো নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। মাঝেমধ্যে ভালো কয়েকটি ইনিংস উপহার দিলেও বড় রান করতে পারছেন না এই বাঁহাতি ওপেনার। ২১ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ৮ বারই এক অঙ্কের ঘরে আউট হয়েছেন তামিম, যার মধ্যে তিনটি ‘ডাক’ রয়েছে।

তবে কিছুটা আশার বাণী হয়ে এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজে এই ওপেনারের ছন্দে ফিরে আসা। ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে তামিমের ৬০ ও ৪৬ রানের দুটি ইনিংস নির্বাচকদের স্বস্তির কারণ।

আরেক ওপেনার সৌম্য সরকার ওয়ানডেতে ছন্দে রয়েছেন। যদিও এই বাঁহাতি ওপেনারের চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরাটা নির্বাচকদের অন্যতম চিন্তার কারণ। হাতের আঙুলের চোটের কারণে চলতি বিপিএলেও খেলতে পারছেন না সৌম্য। নির্বাচকরা হয়তো আশায় থাকবেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আগে সুস্থ হয়ে ফিরবেন তিনি।

মিডল অর্ডারে বাংলাদেশের অন্যতম ভরসা মুশফিকুর রহিম। চোটের কারণে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজও খেলেননি মুশফিক। ওয়ানডেতে ছন্দে থাকা মুশফিকের জন্য নির্বাচকদের বড় চিন্তা তাঁর আঙুলের চোট। বিপিএলে নিয়মিত খেললেও উইকেটকিপিং করছেন না মুশফিক।

এদিকে নির্বাচকদের আরেক চিন্তা তাওহীদ হৃদয়ের অফ ফর্ম। চোটের কারণে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজও খেলেননি হৃদয়। আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলা নিজের সর্বশেষ সিরিজেও ছিলেন অফ ফর্মে। তিন ম্যাচে করেছেন মাত্র ২৯ রান।

হৃদয়-লিটনদের ফর্ম চিন্তার কারণ হলেও নির্বাচকরা কিছুটা নির্ভার থাকতে পারছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও জাকের আলী অনিককে নিয়ে। ওয়ানডেতে দলের ফিনিশার রোলটাতেই খেলা এই দুই ক্রিকেটার দারুণ ছন্দে রয়েছেন।  

ওয়ানডেতে দারুণ ছন্দে আছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ফাইল ছবি

৯৮, ৫০*, ৬২, ৮৪* - মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের খেলা সর্বশেষ ৪টি ওয়ানডে ম্যাচের রানও নির্বাচকদের স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। অপরদিকে জাকের আলী অনিকের পরিসংখ্যানও আশাজাগানিয়া। সদ্য অভিষিক্ত এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের ৫ ম্যাচে গড় ৫০.৩৩।

ব্যাটসম্যানদের পর নির্বাচকদের দল সাজাতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বোলারদের নিয়ে। তবে সেটা ‘মধুর সমস্যা!’ বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটে এখন একাধিক অপশন। তাসকিন-তানজিম সাকিব-নাহিদ রানা-মোস্তাফিজুরদের সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্কোয়াডে থাকার দৌড়ে আছেন শরীফুল ইসলাম, হাসান মাহমুদ ও চোট কাটিয়ে ফেরা ইবাদত হোসেন। কাকে বাদ দিয়ে কাকে দলে রাখবেন তা নিয়ে গাজী আশরাফ লিপুর নির্বাচক প্যানেলকে বাড়তি চিন্তা করতেই হচ্ছে।  

পেসাররা স্বস্তি দিলেও স্পিন বোলারদের নিয়ে চিন্তার কারণ তাঁদের অফ ফর্ম। মেহেদী হাসান মিরাজ ওয়ানডেতে এখন টপ অর্ডারে খেললেও ডানহাতি এই স্পিনারের বোলিংটা স্বস্তি দিচ্ছে না, পরিসংখ্যান অন্তত তা-ই বলছে। ওয়ানডেতে মিরাজ সর্বশেষবার ৩ উইকেট পেয়েছিলেন ২০২৩ বিশ্বকাপে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩ উইকেট পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত মিরাজ ১৪টি ওয়ানডে ম্যাচে বল করেছেন। যেখানে এই স্পিনার মাত্র ১০টি উইকেট পেয়েছেন। ৬টি ইনিংসে ছিলেন উইকেটশূন্য। দুটি ম্যাচে সর্বোচ্চ ২টি করে উইকেট পেয়েছেন।

সাকিব শেষ পর্যন্ত স্কোয়াডে জায়গা না পেলে মিরাজের সঙ্গে স্পিন ইউনিটে নাসুম আহমেদই নির্বাচকদের প্রথম পছন্দ হবেন। সর্বশেষ দুটি ওয়ানডে সিরিজে নাসুম দলে জায়গা পাওয়ায় তাইজুল ইসলামের থাকার সম্ভাবনা তেমন নেই।  

অপরদিকে সাকিব না থাকায় দলের তৃতীয় স্পিনার হিসেবে রিশাদ হোসেনকেই বেছে নিতে পারেন নির্বাচকরা। যদিও ৭ ওয়ানডে ম্যাচের ক্যারিয়ারে বেশি আলো ছড়াতে পারেননি এই লেগ স্পিনার। ৬.০৫ ইকোনমিতে নিয়েছেন মাত্র ৫টি উইকেট, তিনটি ইনিংসে ছিলেন উইকেটশূন্য।

তবে টি-টোয়েন্টিতে দারুণ ছন্দে থাকা আরেক স্পিনার শেখ মেহেদী নির্বাচকদের কাছে বাড়তি অপশন হিসেবে থাকছেন। ওয়ানডেতে এই অফ স্পিনারের পরিসংখ্যানটাও মন্দ না, ১১টি ওয়ানডেতে ৪.৯৫ ইকোনমিতে নিয়েছেন ১৪ উইকেট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ সেরা হওয়া এই স্পিনার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্কোয়াডে চমক হিসেবে জায়গা করে নিলে অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত, নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি। যেখানে দুবাইয়ে প্রতিপক্ষ ভারত। পরের দুই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে।