বৃষ্টি ম্যাচ হতে দেবে কিনা সে দুশ্চিন্তা আছে। তবে সে আলোচনা একটু সরিয়ে রেখে আপাতত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আইপিএল নিয়ে মাতছেন সবাই। প্রথম দিন ইডেন গার্ডেনসে মুখোমুখি বর্তমান চ্যাম্পিয়ন কলকাতা নাইট রাইডার্স ও কখনো এই টুর্নামেন্ট জিততে না পারা রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
এই ম্যাচে ফেবারিট কোন দল? আলো ছড়াবেনই-বা কারা? চলুন দেখে নেওয়া যাক অতীত কী বলে এই ম্যাচ নিয়ে।
ইডেনে কাদের দাপট
আইপিএল নিয়ে আলোচনায় এখন দুটি ভাগ করে ফেলা যায়। ২০২৩ পর্যন্ত ও ২০২৪ থেকে। গত আইপিএলে প্রতিটি ভেন্যুতে রানবন্যা হয়েছে। উইকেটের বড় রদবদল গত মৌসুমে ২০০ রান একদম সাধারণ ঘটনা বানিয়ে দিয়েছে। এমনকি ২৬১ রান করেও হারতে হয়েছে কলকাতাকে।
২০২৩ সাল পর্যন্ত ইডেন গার্ডেনসে প্রথমে ব্যাট করে গড়ে ১৬৬ রান তুলত দলগুলো। আর পরে পরে ব্যাট করার ক্ষেত্রে তা ছিল ১৫৪। মজার ব্যাপার, আগে ব্যাট করে রান বেশি হলেও ৬০ ভাগ ম্যাচেই জিতত প্রথমে ফিল্ডিং করা দলটি।
২০২৪ আইপিএলে এর অনেক কিছুই বদলে গেছে। প্রথমে ব্যাট করে গড়ে ১৯৮ রা তুলেছে দলগুলো। পরে ব্যাট করা দলও কম যায়নি, ১৯৬ রান করেছে তারা। এত রানবন্যায়ও ইডেনে পরে ব্যাট করা দলেরই জয়জয়কার। ৭ ম্যাচের চারটি জিতেছে প্রথমে ফিল্ডিং করা দল। কারণ, প্রথমে ব্যাট করে ১০.১৮ রানরেটে রান তোলা হয়েছে, পরে ব্যাট করার ক্ষেত্রে যা ১০.৭৯।
ঘরের মাঠে কলকাতা কেমন?
ইডেন গার্ডেনসে কলকাতার পারফরম্যান্স আগ থেকেই ভালো। ২০২৩ পর্যন্ত ১৬টি টুর্নামেন্টে ৯০টি ম্যাচ খেলেছে কলকাতা। এর মধ্যে ৫২টি ম্যাচ জিতেছিল কলকাতা। অর্থাৎ ৫৮% সাফল্য। আর ২০২৪ মৌসুমে সেটা ৭১%। ৭ ম্যাচের ৫টিই জিতেছে কলকাতা।
ব্যাটিংয়ে দাপট কাদের
ভারতের অধিকাংশ মাঠের মতো ইডেনের আকার প্রায় গোল, অর্থাৎ সবদিকের সীমানা প্রায় সমান। এবং তা ৬৫ মিটারের কাছাকাছি। ফলে এ মাঠে আলাদা করে কোনো ব্যাটিং স্টাইলের গুরুত্ব নেই। তবে এই মাঠে বড় ইনিংস খেলার ক্ষেত্রে ওপেনাররাই এগিয়ে থাকেন। ঝড় তোলার কাজটাও ওপেনাররাই করেন।
তবে গত মৌসুমে উইকেটকে কাজে লাগিয়ে লেট অর্ডারেও ঝড় তুলতে দেখা গেছে। অধিকাংশ ম্যাচেই আন্দ্রে রাসেল বা এই ধরনের ব্যাটসম্যানদের আড়াই শ ছাড়ানো স্ট্রাইকরেটে রান নিতে দেখা গেছে। তবে সর্বোচ্চ ইনিংসগুলো ওপেনাররাই পেয়েছেন। আজ তাই সুনীল নারিন, বিরাট কোহলি, ফিল সল্ট বা কুইন্টন ডি ককদের ওপরই নজর রাখতে হবে।
উইকেট পান কারা?
ইডেন গার্ডেনস মানেই পেসারদের পোয়াবারো। এই ভেন্যুতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৫৭.৫৪ ভাগ উইকেট পেসারদের পেতে দেখা গেছে। গত মৌসুমে সে দাপট আরও বেড়েছে। ২০২৪ সালে ৭ ম্যাচে মাত্র ৮১টি উইকেট পেয়েছেন বোলাররা। এর ৫৪টি গেছে পেসারদের কাছে, অর্থাৎ ৬৬.৬৭%!
প্রথম ইনিংসে তবু স্পিনাররা একটু ভালো করেন (৪১.৬৬% উইকেট), দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেট নেওয়ার দায়িত্ব বলতে গেলে পেসাররাই নিয়ে নেন (৭৩.৩৩% উইকেট)।
তবে ম্যাচ জেতায় তো শুধু উইকেট নয়, রান আটকে রাখাটাও গুরুত্ব পায়। আর সে কাজটায় কারা সবচেয়ে ভালো সেটার ব্যাখ্যা কলকাতার লাইনআপই দেয়। এখানে রহস্য স্পিনাররাই সবচেয়ে ভালো করেন- নারাইন ও বরুণ চক্রবর্তী। এমন রহস্য স্পিনার না থাকলে দ্বিতীয় সেরা অস্ত্র লেগ স্পিনার। এটাও ভান্ডারে না থাকলে বাঁহাতে ভরসা করতে হবে। উইকেট পেতে বাঁহাতি পেসার, আর রান আটকাতে বাঁহাতি স্পিনার।
বেঙ্গালুরু ও কলকাতা- কে এগিয়ে আজ
মুখোমুখি লড়াইয়ে নিঃসন্দেহে কলকাতা এগিয়ে। ৩৪ বারের দেখায় ২০বারই জয়ী তারা। সর্বশেষ ৫ আইপিএলে দেখে অবশ্য লড়াইটা সমানে-সমান মনে হতে পারে। ৯ ম্যাচের চারটিতে জিতেছে বেঙ্গালুরু। তবে এতে একটা ‘কিন্তু’ আছে। সে ম্যাচগুলোর অধিকাংশই এবি ডি ভিলিয়ার্স নামের এক অতিমানবের সুবাদে বেঙ্গালুরুর দিকে ঘুরেছে।
আর গত দুই আইপিএলে চার ম্যাচেই হেরেছে বেঙ্গালুরু। এর বড় কারণ স্পিনের বিপক্ষে দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা নেই কারও। গত মৌসুমে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান নিলেও স্পিনের বিপক্ষে কোহলির দ্রুত রান নিতে না পারার সমস্যাটা এখন সবার জানা।
আর অন্যদল গুলোর বিপক্ষে যেখানে কলকাতার পেসাররাই উইকেট নেন, সেখানে গত পাঁচ আইপিএলে বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে স্পিনাররা প্রায় সমানে-সমান। গত আইপিএলের আগপর্যন্ত তো স্পিনাররাই এগিয়ে ছিলেন।
বোলিংয়ে নজর থাকবে কাদের ওপর
অবশ্যই নারাইন ও বরুণ। এই দুই রহস্য স্পিনারের বল বেঙ্গালুরু কীভাবে সামলায়, এর ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে ম্যাচের ভাগ্য। ২০২৪-এ একটা মজার ব্যাপার দেখা গেছে। টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে তাজা উইকেটে সাফল্য পাচ্ছিলেন না বরুণ বরং মার খাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ দিকে তিনিই ত্রাস ছড়িয়েছেন। আজ একদম নতুন উইকেটে তিনি কেমন করেন সেটা নিয়ে আগ্রহ আছে। মিচেল স্টার্ককে ছেড়ে দিলেও তাঁর স্বদেশি স্পেন্সার জনসনকে নিয়ে বাঁহাতি পেসারের কোটাটা পূরণ করে রেখেছে কলকাতা।
বেঙ্গালুরু এদিক থেকে অনেক পিছিয়ে। জশ হ্যাজলউড ও ভুবনেশ্বর কুমার তাদের মূল পেসার। কুইন্টন ডি ককের বিপক্ষে নতুন বলে ভুবনেশ্বরের ভালো করার কথা। তবে উইকেট কতটা বোলিং সহায়ক, সেটাও দেখার বিষয়। আর স্পিনে সুয়াশ শর্মার লেগ স্পিনই ভরসা। কিন্তু চোট তাঁকে খেলতে দিবে না, সে শঙ্কা আছে।
ব্যাটিংয়ে কারা?
এবারের আইপিএলেও রানবন্যা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ইন্টার স্কোয়াড ম্যাচগুলোও সে পূর্বাভাস দিচ্ছে। যদি সে পূর্বাভাস ঠিক হয়, অর্থাৎ উইকেট ও বাউন্ডারিতে গত বছরের ধারা বজায় থাকে তবে নারাইন-ডি কক উদ্বোধনী জুটি দেখার মতো কিছু উপহার দিতে যাচ্ছে। এরপর ভেংকটেশ আইয়ার তো আছেনই। অবশ্য প্রথম ম্যাচ বলে নারাইনের বদলে একটু প্রথাগত স্টাইলে আজিঙ্কা রাহানেকে নামানো হলে ভিন্ন কথা। শেষ দিকে আন্দ্রে রাসেল বা রিংকু সিং তো থাকছেনই।
অন্যদিকে বেঙ্গালুরুর হয়ে খেলবেন গতবার কলকাতার হয়ে ঝড় তোলা সল্ট। অন্যপ্রান্তে কোহলি একদিকে যেমন ভরসা অন্যদিকে দুশ্চিন্তাও। সম্প্রতি তাঁর রান তোলার গতটা যে ‘নতুন’ আইপিএলের ঠিক মানানসই নয়। দেবদূত পাড়িক্কাল, রজত পাতিদাররা আছেন। ঝড় তলার দায়িত্ব লিভিংস্টোন বা টিম ডেভিডের থাকবে। তবে দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো, এই দুজনই স্পিনের বিপক্ষে সড়গড় নন।