সৌম্য-সাইফ স্পোর্টস কারে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে, বাকিরা চালালেন ঠেলাগাড়ি

এ বছরে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে আজকের আগে একটা ৫০+ উদ্বোধনী জুটিও দেখেনি। আজ সৌম্য সরকার আর সাইফ হাসানের উদ্বোধনী জুটি হলো ১৭৬ রানের।

মিরপুরে ২০১৫ সালের নভেম্বরের পর ওয়ানডেতে কোনো দলের উদ্বোধনী জুটিতেই সেঞ্চুরি হয়নি। এক দশকে গড়াতে যাওয়া সে আক্ষেপ ঘুচিয়েছেন সৌম্য-সাইফ।

তামিম ইকবাল আর লিটন দাস ২০২০ সালে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে উদ্বোধনী জুটিতে ২৯২ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েছিলেন, সে রেকর্ড বাংলাদেশের কোনো উদ্বোধনী জুটি আবার কবে ভাঙতে পারবে – আদৌ পারবে কি না – সেটাই বড় আলোচনা। তবে সৌম্য আর সাইফের জুটি আজ এর পরের জায়গাটা দখল করে নিয়েছেন, তাঁদের জুটিটা ওয়ানডেতে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

প্রসঙ্গত, এটা কিন্তু মিরপুরে আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে আগে ব্যাট করা বাংলাদেশের ইনিংস প্রতিবেদন। কিন্তু এখানে এখন পর্যন্ত শুধু সৌম্য আর সাইফের উদ্বোধনী জুটি নিয়েই যত কথা হচ্ছে। বাকিদের কথা কোথায় – খেলা দেখে না থাকলে এমন প্রশ্ন আপনার মনে আসতে পারে এবং মনে আসাও স্বাভাবিক।

সে ক্ষেত্রে আপনার জন্য উত্তর, বাকি অংশে আর তেমন কিছু বলার নেই! বাংলাদেশের ইনিংসটার যা কিছু বলার মতো, সেটা ওই উদ্বোধনী জুটিতেই। সৌম্য-সাইফের ব্যাটিংকে যদি স্পোর্টস কারের সঙ্গে তুলনা করেন, বাকিরা তাহলে ঠেলাগাড়ি চালিয়েছেন। ৭-এর কাছাকাছি রানরেটে উদ্বোধনী জুটিতে ১৭৬ রান দেখা বাংলাদেশ যেখানে অন্তত ৩৫০ রান করবে বলে মনে হচ্ছিল, এরপর পথ হারানো বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোনোরকমে ৩০০-র কাছাকাছি যেতে পেরেছে। ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে তুলতে পেরেছে ২৯৬ রান।

অথচ শুরুটা কী দারুণ স্বপ্নই না দেখাচ্ছিল! ৮ ওভারের মধ্যেই ফিফটি পেরিয়ে যায় উদ্বোধনী জুটি – এই বছরে ওয়ানডেতে প্রথমবার বাংলাদেশের কোনো উদ্বোধনী জুটির ৫০ পেরোনোর ঘটনা এটি। ১০০ হয়ে গেল ১৬তম ওভারে। এর আগেই সৌম্যর ফিফটি হয়ে গিয়েছিল (৪৮ বলে), দলের ১০০ হওয়ার পর ফিফটি পূরণ হলো সাইফেরও (৪৪ বলে)।

এরপর ইনিংসের গতি আরেকটু বাড়ালেন দুজন। ২২তম ওভারে ১৫০ পেরিয়ে গেল বাংলাদেশ। ইনিংসের ঠিক মাঝপথে, অর্থাৎ ২৫তম ওভারের শেষে বাংলাদেশের রান বিনা উইকেটে ১৭৬! স্বপ্নের মতো!

কিন্তু স্বপ্নে বুঁদ করে রাখা ঘুমটা ভাঙতেও সময় লাগল না। ২৬তম ওভারে সাইফ আউট হয়ে গেলেন, রোস্টন চেইজের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরার সময়ে সাইফের নামের পাশে ৭২ বলে ৬ চার ৬ ছক্কায় ৮০ রান। এরপর থেকেই বাংলাদেশের ইনিংসের গতি হারানোর শুরু। তিনে নামা তাওহীদ হৃদয় ২৭তম ওভারটাই দিয়ে দিলেন মেডেন!

সৌম্যও বেশিক্ষণ টিকলেন না। সাইফের বিদায়ের ১৭ বল পর প্যাভিলিয়নে তিনিও। সেঞ্চুরিটা তাঁরও পাওয়া হলো না। ৮৬ বলে ৯১ রান (৭ চার, ৪ ছক্কা) করে ২৯তম ওভারে আকিল হোসেনের বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন সৌম্য। দলীয় ১৮১ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

দ্রুত দুই ওপেনারের বিদায়ে ক্রিজে দুই নতুন ব্যাটসম্যানকে আবার নতুন করে শুরু করতে হলো, তার প্রভাব পড়েছে রানরেটে। ৩২তম ওভারেই অবশ্য ২০০ পেরিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু হৃদয়ের ব্যাট আজ যেন তাঁর কথা না শোনার পণ করেই নেমেছে! একের পর এক বল নষ্ট করলেন তিনি। অন্য প্রান্তে নাজমুল হোসেন শান্ত দু-তিনটি ছক্কা মেরেছেন। দুবার ক্যাচ দিয়ে জীবনও পেয়েছেন, একটা ক্যাচ তো বাউন্ডারিতে আকিল হোসেন ধরতে ধরতেও পারলেন না, বল নিয়েই বাউন্ডারির বাইরে চলে গেলেন!

শেষ পর্যন্ত ৪০তম ওভারে তাওহীদ হৃদয় (৪৪ বলে ২৮ রান) আউট হলেন। কিন্তু তাঁর আর শান্তর ৭০ বলে ৫০ রানের জুটির সময়েই মোমেন্টাম হারানো বাংলাদেশ ২৫০ করতে করতেই পার হয়ে গেল প্রায় ৪৩তম ওভার! শান্তও ৪৪তম ওভারে আউট হয়েছেন ৪৪ রান (৫৫ বলে) করে।

এরপর একদিকে হঠাৎ করে ‘আরে, রান তো কম হয়ে গেল’ চাপ, অন্যদিকে ‘ওভার আর কয়েকটিই বাকি, এখনই যা করার করতে হবে’ তাগিদ। ওতে আর ব্যাটিং কী হবে! তখন সময় যার যেমন ইচ্ছা মারতে চাওয়ার – মারতে পারুক কি না পারুক! বাংলাদেশের শেষদিকে নুরুল হাসান (৮ বলে ১৭) ছাড়া আর কোনো ব্যাটসম্যানই পারেননি!

দলের রান বাড়ানোর প্রয়োজনে নিজের পরিসংখ্যানের চিন্তা বাদ দিয়েই হার্ড-হিটারদের আগে সুযোগ দিলেন অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ। কিন্তু হার্ড হিটারদের কেউই কিছু করতে পারলেন না। মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন (৬), রিশাদ হোসেন (৩), নাসুম আহমেদ (১) এলেন আর গেলেন। নুরুল তবু একটা ছক্কা আর একটা চার মেরেছেন। মিরাজকে নয় নম্বরে নামতেই হলো। কিন্তু নেমে তিনিও কিছুই করতে পারলেন না। ১৭ বলে কোনো চার-ছক্কা মারতে না পেরে ১৭ রান করে আউট হয়ে যাওয়াকে ওই অবস্থায় ‘কিছু করা’ বলা তো যায় না!